November 22, 2018

৯ লাখ মানুষ প্রতি বছরে দগ্ধ হয়

প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৯ লাখ মানুষ দগ্ধ হচ্ছে। এর মধ্যে অধিকাংশই নারী ও শিশু। প্রায় ৮৫ শতাংশ।স্বামী কিংবা শ্বশুর বাড়ির দ্বারা আক্রান্ত হয়ে, প্রেমে প্রত্যাখাত হয়ে কিংবা কোনও পারিবারিক কলহে এখন নারী ও শিশুরা বলি হচ্ছে আগুনের লেলিহান শিখায়। আর এই দগ্ধদের অধিকাংশের ঠাঁই হচ্ছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে।

পুড়ে যাওয়া রোগীদের যন্ত্রণা বুঝতে হলে আপনাকে একরাত এখানে থাকতে হবে নয়তো বুঝবেন না আমাদের যন্ত্রণা, এভাবে বলে যন্ত্রণা বোঝানো সম্ভব নয়। রাত যতো বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে যন্ত্রণা, মাঝে মাঝে মনে হয় এর চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভালো। কথাগুলো বলছিলেন নাহিদ। ১৭ বছরের নাহিদের হাতে ইলেকট্রিক তার লেগে পুড়ে গেছে ডান হাত, দুপা, পুরো পিঠ। গত ৬ নভেম্বর থেকে ঠাঁই হয়েছে এই বারান্দায়। ডান হাতে অপারেশন করে কবজি কেটে ফেলতে হয়েছে, পায়েও অপারেশন হবে ধাপে ধাপে।

শূন্য দৃষ্টিতে হাতের না থাকা কবজির দিকে তাকিয়ে বলেন, নিজের চেয়েও বেশি কষ্ট পাই যখন দেখি, ছোট বোনটা হাতটার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের বারান্দায় শুয়ে থাকা নাহিদের সঙ্গে কথোপকথন ছিল এমনই।

ঢাকার বাইরেও কয়েকটি হাসপাতালে বার্ন ইউনিট থাকলেও সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে স্থানান্তর করা হচ্ছে ঢাকা মেডিক্যাল বার্ন ইউনিটে। যার কারণে স্থান সংকুলান হচ্ছে না এখানে।

বুধবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে সরেজমিন ঘুরে জানা গেল, ঢাকাতো বটেই, ঢাকার বাইরেও অগ্নিদগ্ধের ঘটনা ঘটলে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হয় এই হাসপাতালে। যার কারণে হাসপাতালের ধারণক্ষমতার বাইরেও রোগীরা চিকিৎসা নিচ্ছেন করিডোরের বিছানায়।এখানেই কথা হয় কুমিল্লার সুরাইয়ার সঙ্গে। জানালেন,স্বামীর দেওয়া আগুনে ঝলছে গেছে তার দুপা। বিয়ের পর থেকে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন করতেন স্বামী। দিনকে দিন তার সঙ্গে যোগ হয় বাড়ির অন্যরাও। এরই সূত্র ধরে সুরাইয়া এখন এখানে। কেরোসিন ঢেলে স্বামী পালিয়ে যায়, ভাইয়েরা খবর পেয়ে এখানে নিয়ে আসে। ১৩ ডিসেম্বর থেকে এখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি। অবস্থা মারাত্মক নয় বলে চিকিৎসকেরা জানালেও বিহবল দৃষ্টি নিয়ে সুরাইয়া বলেন,পায়ের ক্ষত শুকিয়ে যাবে একদিন। কিন্তু মনের ক্ষত কি কোনদিন শুকাবে?

মহিলা পরিষদের হিসাব মতে, ২০১৫ সালে অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন ৫৯ নারী, আর অগ্নিদগ্ধের কারণে মৃত্যু হয়েছে ২৪ জনের। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০০৪ সালে বার্ন ইউনিটে ভর্তি ছিল ১ হাজার ২৮৫ জন, পরের বছর ৬ হাজার ৫৭৩ জন, ২০০৬ সালে ৯ হাজার ৫৭৬ জন, ২০০৭ সালে ১৬ হাজার ১৫০ জন, ২০০৮ সালে ১৮ হাজার ৭৫০ জন, ২০০৯ সালে ১৯ হাজার ৬৭ জন, ২০১০ সালে ২০ হাজার ২ জন, ২০১১ সালে ২৪ হাজার ১৫৬ জন, ২০১২ সালে ৩৩ হাজার ৬৫৫জন।২০১৩ সালে ছিল ৩৮ হাজার ৩১৩ জন, ২০১৪ সালে চিকিৎসা নেয় ৪৩ হাজার ১০০ জন, ভর্তি ছিল ৬ হাজার ২১৩ জন এবং ২০১৫ সালে চিকিৎসা নেবা নিয়েছে ৪৫ হাজারের বেশি এবং ভর্তি ছিল ৬ হাজার ৪০০ জন।

সরেজমিনে দেখা যায়, বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ভবনের ৬ তলার তৃতীয় তলার প্রশাসনিক ফ্লোর ছাড়া প্রতিটি ফ্লোরেই রোগীর উপচেপড়া ভিড়।এতো ভিড়ের কারণ সর্ম্পকে বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. তানভীর আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,হাসপাতালে আসনসংখ্যা ১০০ হলেও বর্তমানে প্রায় ৫০০ রোগী ভর্তি রয়েছেন। বছরজুড়ে নানা সহিংসতার শিকার হয়ে এখানে রোগীরা সারাদেশ থেকে আসলেও শীতের সময়টাতে গরম পানি ও ইলেক্ট্রিক ক্যাবলে পোড়ারোগীর সংখ্যা বেশি। তিনি জানান, প্রতিদিন বহির্বিভাগে ১২০ থেকে ১৪০ রোগী আসছে চিকিৎসা নিতে।এদের মধ্যে ভর্তি হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ জন।

বার্ন ইউনিটের করিডোরেই কথা হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা স্কুল শিক্ষিকা রোকেয়া বেগমের সঙ্গে। ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে গত রবিবার থেকে থাকছেন এই করিডোরে। জানালেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র ইয়াসিন।গত রবিবার সকাল সাড়ে দশটার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে শীতের সকালে খড়কুটো পোড়াতে গেয়ে কেরোসিন ভেবে তাতে পেট্রোল ঢেলে ম্যাচের কাঠি দিতেই জ্বলে ওঠে আগুনের লেলিহান শিখা। বন্ধুরা সবাই দৌড়ে গেলেও ইয়াসিন রয়ে যায় দেয়ালের সাথে। পরিণামে তার নাভির ওপর থেকে চোখের নিচ পর্যন্ত পুড়ে গেছে মারাত্মকভাবে। দ্রুত তাকে নিয়ে আসা হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। ১৫ শতাংশ পুড়ে গেছে শরীরের।

বিভিন্নভাবে দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সংলগ্ন এই নতুন ভবনে ২০০৩ সালে ৫০ শয্যার এই বার্ন ইউনিটটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর ২০১২ সালে ১০০ শয্যা করা হলেও রোগীর চাপ অনেক বেশি। বর্তমানে এতে আরও রয়েছে ছয়টি অপারেশন থিয়েটার, চারটি সাধারণ ওটি এবং একটি ইমার্জেন্সি ওটি রয়েছে। আরও রয়েছে আইসিইউ, এইচডিইউ এবং একটি অবজারভেশন ওয়ার্ড।

জানা গেল, সারা দেশ থেকে রোগী আসায় এখানে রোগীর সংখ্যা যতো বেশি সেই অনুপাতে চিকিৎসক নেই। এখন এখানে দুশ নার্সের চাহিদা থাকলেও রয়েছে ৩২ থেকে ৩৫ জন। ৩ জন অধ্যাপক, ২ জন সহযোগী অধ্যাপক এবং ৫ জন সহকারী অধ্যাপক দিয়ে চলছে দেশের সবচেয়ে বড় এই বার্ন ইউনিট। রয়েছে, ২৫ থেকে ৩০ জন পোস্ট গ্রাজুয়েট চিকিৎসক।

ঢাকা মেডিক্যালের এই বার্ন ইউনিট ছাড়াও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ), মিটফোর্ড হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং গাজীপুরের দুটি হাসপাতালে, সিলেট, চট্রগ্রাম, কুমিল্লা, বরিশাল, ফরিদপুর, রংপুর, দিনাজপুর, খুলনা, রাজশাহী এবং ময়মনসিংহে বার্ন ইউনিট রয়েছে। তবে জনবল সঙ্কটের কারণে কয়েকদিন পর এর কোনোটি বন্ধ হয়ে যায়।আবার ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের কথা জানেন না অনেকেই।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রতিষ্ঠা পরিচালক ডা. সামন্ত লাল সেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রচারের অভাবে ঢাকায় অবস্থিত অন্যান্য হাসপাতালের বার্ন ইউনিটগুলোতে রোগী যায় না, বার্ন ইউনিট বলতে তারা ঢাকা মেডিক্যালেরটা বোঝে। এজন্য হাসপাতালগুলোর প্রচার জরুরি।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/মেহেদি/ডেরি

Related posts