November 18, 2018

‘ওদের কারনে আমি স্বামীহারা, মেয়েরা পিতৃহারা, ওদের বিচার চাই’

রফিকুল ইসলাম রফিক, নারায়ণগঞ্জঃ  নারায়ণগঞ্জে ৭ খুনের ঘটনায় দায়ের করা দুই মামলায় নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের বন্ধু নিহত মনিরুজ্জামান স্বপনের স্ত্রী মোর্শেদা বেগম-পুলিশসহ ৭ জন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। সোমবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত দুই ঘন্টা একটানা জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে মামলার প্রধান আসামী নুর হোসেন র‌্যাবের চাকুরিচ্যুত তিন কর্মকতা লেফটেনেন্ট কর্ণেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন ও লেফটেনেন্ট কমান্ডার এম এম রানাসহ ২৩ আসামীর  উপস্থিতিতে স্বাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়।

পরবর্তীতে মামলার আসামীপক্ষের আইনজীবীরা সাক্ষীদের জেরা করেন। এদিকে সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে নূর হোসেন ও র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তাকে আদালতের কাঠগড়া থেকে বের করার সময় নিহত মনিরুজ্জামান স্বপনের স্ত্রী মোর্শেদা বেগম আসামীদের দেখে ক্ষোভ ও আবেগ প্রকাশ করে বলেন, ওদের কারণে আমি স্বামী হারা হয়েছি, ওদের কারণে আমার মেয়ে পিতৃ হারা হয়েছে, তারা এখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে।  আমি ওদের বিচার চাই।

আদালতের সাক্ষ্যে নিহত মনিরুজ্জামান স্বপনের স্ত্রী মোর্শেদা বেগম বলেন, ৭ খুনের এক মাস আগেই তার স্বামী তাকে বলতো নূর হোসেন তাকেসহ কাউন্সিলর নজরুলকে মারার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করছে। মিথ্যা অভিযোগে মামলা দিয়ে তাদেরকে নানাভাবে হয়রানি করছে। নূর হোসেন তাদেরকে যে কোন সময় মেরে ফেলতে পারে। তিনি আরো বলেন, নূর হোসেনই ৭ খুনের মুল পরিকল্পনাকারী। নূর হোসেনের পরিকল্পনা ও অর্থায়নে র‌্যাব সদস্যরা ৭ জনকে অপহরণ খুন ও লাশ গুম করেছে।

বন্ধু স্বপনের গাড়িতে চড়ে যাওয়ার পথেই অপহৃত হন কাউন্সিলর নজরুলসহ ৫জন। ঘটনার সময় স্বপনের ছোট মেয়ে তাবাসসুম মাহীর বয়স ছিল মাত্র ৬ মাস।

পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন  সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, নিহত প্যানেল মেয়র নজরুলের বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপনের স্ত্রী মোর্শেদা বেগম, জয়দেবপুর থানার তৎকালীন এএসআই রিয়াজুল হক, স্বপনের গাড়ির জব্দ তালিকার সাক্ষী আনোয়ার হোসেন ও মোক্তার হোসেন, কনস্টেবল বদরুল আলম, ফতুল্লা মডেল থানার তৎকালীন এসআই ওয়াহিদুজ্জামান ও  কনস্টেবল সেলিম মিয়া আদালতে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য প্রদান করেন। যা মামলার বিচার কার্র্যে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে অপর ৩ সাক্ষী মাধব কুমার দে, এনায়েত হোসেন ও সবুর মোল্লা সাক্ষ্য দিতে না আসায় তাদের সাক্ষ গ্রহণ সম্পন্ন হয়নি। আদালত সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা শেষে আগামী ৯ মে পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ধার্য্য করে আসামীদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এই নিয়ে ৭ খুনের দুটি মামলায় মোট দুটি মামলার বাদী ও দু’জন বিচারিক হাকিমসহ ৩৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হলো।

দুটি মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নিহত মনিরুজ্জামান স্বপনের স্ত্রী মোর্শেদা বেগম আদালতে তার স্বামীসহ ৭ জনকে অপহরণের পর হত্যার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী দিয়েছে। মোর্শেদা বেগম আদালতে জানান, নূর হোসেন দীর্ঘ দিন যাবত তার স্বামী স্বপন ও নজরুলকে হত্যার হুমকি ধামকি দিয়ে আসছিল। সেসব বিষয়ে তিনি আদালতে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য প্রদান করেন। তিনি আদালতে তার স্বামী হত্যার বিচার চান।

তবে আসামী র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তা তারেক সাঈদ মোহাম্মদের আইনজীবী এডভোকেট সুলতানুজ্জামান জানান, আদালতে সাক্ষীরা প্রমাণ করতে পারেনি আমাদের আসামী এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত। আমরা সাক্ষীদের জেরা করেছি।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংকরোডের ফতুল্লার লামাপাড়া এলাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাসহ ৭ জনকে অপহরণের তিন দিন পর তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও তার ৪ সহযোগী হত্যার ঘটনায় তার স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বাদী হয়ে একটি এবং সিনিয়র আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়ির চালক ইব্রাহিম হত্যার ঘটনায় জামাতা বিজয় কুমার পাল বাদী হয়ে একটি মোট ফতুল্লা মডেল থানায় দুটি মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ প্রায় এক বছর তদন্ত শেষে মামলার তদন্তকারী সংস্থা নূর হোসেন, র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।

তবে একটি মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি তার দায়েরকৃত মামলায় এজাহারভুক্ত ৫ আসামীকে বাদ দেয়ায় এবং প্রধান আসামী নূর হোসেনের জবানবন্দী ছাড়া অভিযোগপত্র দেয়ায় তা প্রত্যাক্ষাণ করে না রাজী পিটিশন দাখিল করলে প্রথমে বিচারিক হাকিম আদালত ও পরে জেলা ও দায়রা জজ আদালত তা খারিজ করে দেন। পরে সেলিনা ইসলাম বিউটি অধিকতর তদন্ত চেয়ে উচ্চ আদালতে আবেদন করলে আদালত শুনানী শেষে আদেশে বলেন, পুলিশ চাইলে মামলাটি অধিকতর তদন্ত করতে পারে। তবে মামলাটিতে হত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনার ধারা যুক্ত করে বিচার করার জন্য জেলা ও দায়রা জজকে নির্দেশ দেন। গত  ৮ ফেব্রুয়ারী ৭ খুনের দুটি মামলায় নূর হোসেন ও র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ২৩ আসামীর উপস্থিতিতে আদালত অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্য গ্রহণের দিন নির্ধারন করেন।

তবে র‌্যাবের ৮ সদস্যসহ পলাতক ১২ আসামীর অনুপস্থিতিতেই বিচার কার্য শুরু  হয়েছে। পলাতক ১২ আসামীর পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষের খরচে ৫ আইনজীবীকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর আগে গত বছরের ৮ এপ্রিল মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নূর হোসেন ও র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। ওই মামলায় নূর হোসেন ও র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ মোট ২৩ জন কারাগারে আটক রয়েছে।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন ডেরি/২ মে ২০১৬

Related posts