September 24, 2018

৬৮ হাজার পুলিশ দণ্ডিত হলেন ৫ বছরে

অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে পুলিশ। একদিকে বছরের চাকা ঘুরছে। অন্যদিকে বাড়ছে অপরাধে জড়ানো পুলিশের সংখ্যা। সাজা দিলেও অপরাধ করার সংখ্যা কমিয়ে আনা যাচ্ছে না। পুলিশ বাহিনীতে প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার সদস্য রয়েছে। অপরাধ ছাড়াও বিভিন্ন অভিযোগে গত পাঁচ বছরে ৬৮ হাজার সদস্যকে সাজা দেয়া হয়েছে।

মাত্র দু’দিনে সোনার বার ও অলঙ্কার ছিনতাইয়ের ঘটনায় তিন পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত ও গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের দুইজনই হচ্ছেন মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তা। একটি ঘটনা চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে (সিএমপি) এবং অপরটি যশোরের স্থল বন্দর থানা বেনাপোলে।

পুলিশ সদর দফতরের হিসেবে বাহিনীতে কর্মকর্তার সংখ্যা দুই হাজারের কিছু বেশি। এর মধ্যে বিসিএস ক্যাডারে সরাসরি এএসপি হিসেবে এবং বিভাগীয় পদোন্নতির মাধ্যমে এসআই থেকে দুই ধাপে এএসপি রয়েছেন। আবার অনেকে তৃতীয় ধাপে পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হয়েছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, পুলিশের সদস্য কিংবা কর্মকর্তা ফৌজদারি অপরাধ করলে বাহিনী থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। মামলা দায়ের করে বিচারে সাজা নিশ্চিত করা হয়। ফৌজদারি অপরাধের বাইরে বাহিনীর নিয়ম-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করাসহ বিভিন্ন অনিয়মের কারণে বিভাগীয় মামলা দায়ের করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

সূত্র আরও জানায়, সংখ্যার বিচারে ৬৮ হাজার পুলিশ সদস্য সাজা পেয়েছে। আর এ সাজা দেয়া হয়েছে বাহিনীর নিজস্ব আইনে। সাজাপ্রাপ্তদের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে নিয়ম-শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে। কনস্টেবল থেকে উপ-পরিদর্শক (এসআই) পদের সদস্যরা ফৌজদারি অপরাধসহ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ নিয়মনীতি লঙ্ঘনে সবচেয়ে বেশি জড়াচ্ছেন। তবে সহকারি পুলিশ সুপার (এএসপি) থেকে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বেলায় এই হার একেবারেই নগন্য।

পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল এই ৫ বছরে কনস্টেবল থেকে এসআই পদে ৬৩ হাজার ৩৪৯ জনকে লঘুদণ্ড, তিন হাজার ৫৯০ জনকে গুরুদণ্ড, ৪৬১ জনকে বরখাস্ত বা চাকরিচ্যুত ও ১২৩ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। সব মিলিয়ে ৬৭ হাজার ৫২৩ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

একই সময়ে ২৩৪ জন পুলিশ পরিদর্শকের (ইন্সপেক্টর) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। এদের মধ্যে ২০৭ জনকে লঘুদণ্ড ও ২৭ জনকে গুরুদণ্ড দেয়া হয়েছে। এএসপি থেকে উপরের দিকে কর্মকর্তা পর্যায়ে ৪৭ জনকে লঘুদণ্ড, ১২ জনকে গুরুদণ্ড, একজনকে বরখাস্ত ও পরে চাকরিচ্যুত ও তিনজনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ সদর দফতরের হিসেবে ২০১০ সালে কনস্টেবল থেকে এসআই পদ মর্যাদার ১১ হাজার ৩৩ জনকে লঘুদণ্ড, ৫৩৮ জনকে গুরুদণ্ড, ৪৯ জনকে চাকরিচ্যুত ও ৬৪ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়। ২০১১ সালে ১২ হাজার ৯৭২ জনকে লঘুদণ্ড, ৬১২ জনকে গুরুদণ্ড, ৯০ জনকে চাকরিচ্যুত ও ৩৭ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয় হয়। ২০১২ সালে ১১ হাজার ৭৭০ জনকে লঘুদণ্ড, ৯২১ জনকে গুরুদণ্ড, ১৭৪ জনকে চাকরিচ্যুত ও ১৪ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়েছে। ২০১৩ সালে ১৩ হাজার ১৭৪ জনকে লঘুদণ্ড, ৭৫৭ জনকে গুরুদণ্ড, ৭৫ জনকে চাকরিচ্যুত ও একজনকে বাধ্যতামূলক অবসর এবং ২০১৪ সালে ১৪ হাজার ৪০০ জনকে লঘুদণ্ড, ৭৬২ জনকে গুরুদণ্ড, ৭৩ জনকে চাকরিচ্যুত ও সাতজনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।

অপরদিকে ২০১০ সালে পুলিশ পরিদর্শক পদে ৩৪ জনকে লঘুদণ্ড ও ১০ জনকে গুরুদণ্ড, ২০১১ সালে ৩৭ জনকে লঘুদণ্ড ও আটজনকে গুরুদণ্ড, ২০১২ সালে ৪৫ জনকে লঘুদণ্ড ও একজনকে গুরুদণ্ড, ২০১৩ সালে ৩৬ জনকে লঘুদণ্ড ও তিনজনকে গুরুদণ্ড এবং ২০১৪ সালে ৫৫ জনকে লঘুদণ্ড ও পাঁচজনকে গুরুদণ্ড দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে পাঁচ বছরে এএসপি থেকে উর্ধ্বতন কর্মকর্তা পদে ৪৭ জনকে লঘুদণ্ড, ১২ জনকে গুরুদণ্ড, একজনকে চাকরিচ্যুত এবং তিনজনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়।

পুলিশ বাহিনীর নিজস্ব আইনে তদন্ত পরবর্তী অভিযোগ প্রামন সাপেক্ষে সাজা প্রদান করে পুলিশ সদর দফতরের ডিসিপ্লিন অ্যান্ড প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ড শাখা। গুরুদণ্ড সাজার মধ্যে রয়েছে বেতন কর্তন ও এক পদ নিচে নামিয়ে দেয়া। লঘুদণ্ড হচ্ছে ভবিষ্যতের জন্য তিরস্কার ও সতর্ক করা। আর তদন্তে অভিযোগ প্রমাণ না হলে অব্যাহতি দেয়া হয়। তবে দণ্ডপ্রাপ্তদের অনেকেই উচ্চ আদালতে রিট করে চাকরিতে বহাল রয়েছেন।
অপরাধে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ফৌজদারিসহ বিভাগীয় মামলায় বিচারে সাজা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু অপরাধে জড়ানোর হার কমছে না। মাঠ পর্যায়ে কতিপয় পুলিশ সদস্য ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ধর্ষণের মতো অপরাধ করছে। তাছাড়া অপরাধী গ্রেফতারে সোর্স হিসেবে যাদের রাখা হয় তাদেরকে ব্যবহার করে পুলিশ সদস্য অপরাধ ঘটাচ্ছে।

ডিসেম্বরের ১৫ তারিখে সিএমপির কোতয়ালি থানার এনায়েত বাজার পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই মিজানুর রহমান ও কনস্টেবল খান-এ-আলমকে আটটি সোনার বারসহ ১০৩ ভরি সোনার অলঙ্কার ছিনতাইয়ের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদেরকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরের ২১ তারিখ নিউমার্কেট সংলগ্ন মিউনিসিপ্যাল মডেল হাইস্কুলের সামনে ব্যবসায়ী দোলন বিশ্বাসের কাছ থেকে তারা বারসহ অলঙ্কার ছিনতাই করেছিল।

সিএমপির একটি সূত্র জানায়, ঘটনার সঙ্গে তিনজন জড়িত ছিল। তদন্তে দুই পুলিশের নাম বেরিয়ে আসে। তৃতীয়জন হচ্ছে তাদের সোর্স। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সোর্সকে গ্রেফতার করা যায়নি।

সিএমপিতে দুই পুলিশ গ্রেফতারের মাত্র ২৪ ঘন্টা আগে ১৪ ডিসেম্বর বেনাপোল থানার এএসআই রফিকুল ইসলাম এক কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের ১৩টি সোনার বার নিয়ে লাপাত্তা হয়। রঘুনাথপুর থেকে চোরাচালানী রেজাউল ইসলামকে গ্রেফতারের পর সোনার বার উদ্ধার করে ওই পুলিশ সদস্য। সঙ্গে থাকা কনস্টেবলকে দিয়ে থানার গেইটের ভিতরে রেজাউলকে পাঠিয়ে এএসআই রফিকুল পালিয়ে যায়। বেনাপোল থানা জানায়, সোনার বারসহ পালিয়ে যাওয়া এএসআইকে গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ডট কম/মেহেদি/ডেরি

Related posts