September 20, 2018

৬৩ জেলায় বোমা বিস্ফোরণঃ জরিত তিন জঙ্গি পশ্চিমবঙ্গের

ঢাকাঃ  কেঁচো নয়, গর্তটা যে কেউটের, সেটা জানা গিয়েছিল গোড়াতেই। কিন্তু কেউটে খুঁড়তে গিয়ে যে একেবারে অজগর বেরিয়ে পড়বে, গোয়েন্দারা তা ভাবতে পারেননি।

বর্ধমান জেলার খাগড়াগড়ে জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর একটি আস্তানায় বিস্ফোরণ ঘটেছিল ২০১৪ সালের অক্টোবরে। সেই বিস্ফোরণের তদন্তে নেমে গোয়েন্দারা সন্ধান পান পশ্চিমবঙ্গের অনেকটা এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা জেএমবির নেটওয়ার্কের। কোনও রাখঢাক না করে ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) জানায়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাত করার জন্য বড়সড় নাশকতার পরিকল্পনা করেছিলেন সন্ত্রাসীরা, আর সেই পরিকল্পনা কার্যকর করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের মাটিকে। এখানেই তৈরি করা হয়েছিল দেশি গ্রেনেড ও ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস বা আইইডি, নিয়োগ করা হয়েছিল পুরুষ ও মহিলা ক্যাডারদের।

কিন্তু এই রাজ্যে ওই জঙ্গি সংগঠনের তিন পুরনো সদস্য যে বাংলাদেশে প্রায় এক যুগ আগে গিয়ে নাশকতায় সামিল হয়েছেন, সেটা গোয়েন্দাদের জানা ছিল না। আর যে সে নাশকতা নয়, ২০০৫ সালের আগস্টের সেই ধারাবাহিক, মুহুর্মুহু বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নাশকতা। যাতে কেঁপে গিয়েছিল গোটা বাংলাদেশ।

সে বছর ১৭ আগস্ট বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬৩ জেলার ৩০০ জায়গায় প্রায় ৫০০ বোমা বিস্ফোরণ হয়েছিল। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে শুরু হয়ে মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যে হয় অতগুলো বোমা বিস্ফোরণ। ওই ঘটনায় নিহত হন দু’জন, জখম হন আরও ১১৫ জন। তদন্তে বেরোয়, জেএমবি-ই ছিল ওই ধারাবাহিক নাশকতার মূলে। আর সেই ঘটনায় জড়িত হিসেবে নাম উঠে এলো জেএমবির পশ্চিমবঙ্গের তিন সদস্যের, খাগড়াগড় বিস্ফোরণের তদন্তের সূত্রে।

মাস দেড়-দুয়েকের মধ্যে খাগড়াগড় বিস্ফোরণ মামলার বিচার শুরু হওয়ার কথা।

এনআইএ’র একটি সূত্রের খবর, খাগড়াগড় বিস্ফোরণ মামলার দুই অভিযুক্ত ইউসুফ গাজী ও লাল মোহাম্মদ ওরফে ইব্রাহিম এবং পশ্চিমবঙ্গে জেএমবির একেবারে গোড়ার দিককার সদস্য শেখ বিলাল ওরফে নূর ইসলামকে জেএমবির জঙ্গিরা ওই নাশকতার জন্য বাংলাদেশে নিয়ে গিয়েছিলেন। মুর্শিদাবাদের লালগোলা সীমান্ত পেরিয়ে তারা চোরাপথে বাংলাদেশে ঢোকেন। প্রথমে ঢাকার মিরপুরে জেএমবির একটি আস্তানায় তাদের সপ্তাহ দুয়েক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তার পর তাদের কোথায় কী দায়িত্ব নিতে হবে, সেটা বুঝিয়ে দেন জেএমবির শীর্ষ জঙ্গিরা।

এদের মধ্যে ইউসুফ আর লাল মোহাম্মদ ওরফে ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে খাগড়াগড় বিস্ফোরণ মামলায় চার্জশিট দিয়েছে এনআইএ। তবে লাল মোহাম্মদকে গত বছর এপ্রিলে পশ্চিমবঙ্গের পাশের রাজ্য ঝাড়খণ্ডের পাকুড় থেকে গ্রেফতার করা হলেও ইউসুফ এখনও পলাতক। ইউসুফের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয় গত বছর মার্চে, আর লাল মোহাম্মদের বিরুদ্ধে জুলাইয়ে। ইউসুফ বর্ধমানের মঙ্গলকোটের কৃষ্ণবাটী গ্রামের বাসিন্দা। আর লাল মোহাম্মদের বাড়ি মুর্শিদাবাদের নবগ্রামের পাঁচগ্রামে।

নবগ্রামেরই মোমিনাবাদ গ্রামে বাড়ি শেখ বিলাল ওরফে নূর ইসলামের। খাগড়াগড় বিস্ফোরণ মামলার তদন্তে নেমে এনআইএ জানতে পারে, একবিংশ শতকের গোড়ার দিকেই জেএমবি মুর্শিদাবাদ জেলাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে জাল বিছাতে শুরু করেছিল। আর সেই সময়কার সদস্য এই বিলাল, ইউসুফ, ইব্রাহিমরা। ২০০৭-এর এপ্রিলে বিলাল ও আরও কয়েকজন লালগোলায় গ্রেফতারও হয়েছিলেন সন্দেহজনক সন্ত্রাসী কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে। কিন্তু কোনও অজ্ঞাত কারণে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়।

বিলালকে কিন্তু এনআইএ দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তবে গোয়েন্দাদের মনে হয়েছে, বিলাল এক সময়ে জেএমবির সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকলেও পরে তিনি সব সংশ্রব অনেকটাই ত্যাগ করেন। অন্তত খাগড়াগড় বিস্ফোরণকে ঘিরে জেএমবির যে নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে, তাতে বিলাল নেই। বিলাল আরও পুরনো সন্ত্রাসী। কিন্তু তিনি সাবেক কিনা, গোয়েন্দাদের তাতে দ্বিমত রয়েছে। তদন্তকারীদের একাংশের মত, বিলালকে গ্রেফতার না করে বাইরে রেখে নজরদারি করাই ভাল।

কিন্তু এই তিন জন ঠিক কীভাবে নাশকতায় জড়িত ছিলেন, সেই ব্যাপারে গোয়েন্দারা কিছু তথ্য পেলেও এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নন। তাদের বক্তব্য, ইউসুফকে গ্রেফতার না করা গেলে স্পষ্ট করে কিছু বোঝা যাবে না।

Related posts