November 22, 2018

৫ জানুয়ারি ছিল ‘ব্যর্থ নির্বাচন’

৫ জানুয়ারি ছিল ‘ব্যর্থ নির্বাচন’

FB_IMG_1503967616284

ফরিদুল ইসলাম :

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী ।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনকে ‘ব্যর্থ নির্বাচন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে নির্বাচনী সততা প্রকল্প (ইলেক্টোরাল ইন্টিগ্রিটি প্রজেক্ট-ইআইপি) নামের একটি বৈশ্বিক প্রকল্প। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ও অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটি পরিচালিত হয়।
২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে অনুষ্ঠিত বিশ্বের ১০৭টি দেশের ১২৭টি নির্বাচনের ওপর করা জরিপের ভিত্তিতে তারা নির্বাচনী সততার ধারণা সূচকও (পারসেপশন অব ইলেক্টোরাল ইন্টেগ্রিটি-পিইআই) প্রকাশ করেছে। ওই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিক থেকে ১৪তম। কোনো কোনো দেশে সংসদ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আলাদা হিসাব করায় একাধিক নির্বাচন জরিপে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিএনপিসহ প্রধান দলগুলো নিরপেক্ষ নির্বাচনী সরকারব্যবস্থার দাবিতে ওই নির্বাচন বর্জন করেছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেক পর্যবেক্ষকই বলেছেন, সমকালীন নির্বাচনগুলোতে আন্তর্জাতিক মান পূরণের ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল। তাঁদের মতে, সবচেয়ে বেশি সমস্যা দেখা গেছে নির্বাচিত স্বৈরশাসনগুলোতে (ইলেক্টেড অটোক্রেসি)। দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার খোলস থাকলেও ওই সব নির্বাচনে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। এতে বলা হয়, ব্যর্থ এসব নির্বাচনের ফলে নির্বাচিত কর্তৃপক্ষের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসে ক্ষয় ধরে, ভোটার উপস্থিতি কমে যায় এবং সরকারের স্থিতিশীলতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
জরিপের ফল অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ পাঁচটি নির্বাচন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে মিসর, মোজাম্বিক, আফগানিস্তান, সিরিয়া এবং বাহরাইনের নির্বাচন। সবচেয়ে ভালো পাঁচটি নির্বাচন হয়েছে লিথুয়ানিয়া, কোস্টারিকা, সুইডেন, স্লোভেনিয়া ও উরুগুয়েতে। সূচকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সততার (ইন্টেগ্রিটি) বিচারে ৪২তম এবং কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ৪৫তম অবস্থানে দেখানো হয়েছে।

প্রকাশিত এই জরিপের গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল অংশে অনেকগুলো ব্যর্থ নির্বাচন বড় ধরনের বিপদ তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করা হয়। যেসব দেশের ব্যর্থ নির্বাচন ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে, তার মধ্যে বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করা হয়েছে সবার আগে। বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা বাতিলের প্রতিবাদে বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা উল্লেখ করে এতে বলা হয়, ‘ফল হিসাবে ১৫৩টি আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, প্রধানত আওয়ামী লীগের দখলে চলে যায়।’ ওই নির্বাচনে কমপক্ষে ২১ জনের মৃত্যু এবং শতাধিক ভোটকেন্দ্র জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এই জরিপ প্রতিবেদনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচন আন্তর্জাতিক মান পূরণে কতটা সক্ষম হয়েছে, তা যাচাইয়ের জন্য নির্বাচনী বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে ত্রুটিপূর্ণ ও ব্যর্থ নির্বাচনগুলোর ঝুঁকিসমূহ চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়, নির্বাচনে ত্রুটি পুরো প্রক্রিয়াটির যেকোনো পর্যায়ে ঘটতে পারে এবং তা বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট সৃষ্টি করতে পারে। বিভিন্ন দেশের নির্বাচন পর্যালোচনার ভিত্তিতে বলা হয়, প্রায়ই দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে খারাপ সমস্যাগুলো দেখা দিচ্ছে প্রচারণার পর্যায়ে। এগুলো মূলত ঘটছে রাজনৈতিক অর্থায়ন ও সংবাদমাধ্যমে প্রচারণার ক্ষেত্রে। আর ভোটের দিনে অনিয়ম এবং ভোটের পর অনিয়ম ও অসাধুতা কমে আসছে।

নির্বাচন ও রাজনীতি বিষয়ে অন্তত ১০টি বইয়ের লেখক ও বিশেষজ্ঞ নরিস পিপার নেতৃত্বে পরিচালিত এ প্রকল্পের অধীনে প্রতিটি নির্বাচনের বিষয়ে গড়ে ৪০ জন নির্বাচন পর্যবেক্ষক, বিশেষজ্ঞ বা নির্বাচনী কর্মকর্তার মতামতের ভিত্তিতে এই জরিপটি পরিচালিত হয়েছে।
৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে একতরফা মূল্যায়ন হলে তা দেশের গণতন্ত্র ও সুশাসনের জন্য আরও অমঙ্গলজনক হবে। কারণ, এই নির্বাচন সরকারের গণপ্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্নই শুধু জন্ম দেয়নি, দেশের নির্বাচনব্যবস্থা সম্পর্কেও মানুষের মনে প্রবল অবিশ্বাস ও অনাস্থার সৃষ্টি করেছে। এর সঠিক বিশ্লেষণ হলেই কেবল আমরা ভবিষ্যতের করণীয় সম্পর্কে ধারণা পেতে পারি।

৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশে দুটি প্রধান দৃষ্টিকোণ রয়েছে। একটি দৃষ্টিকোণ তুমুল সমালোচনামূলক। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয় যে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ ও অপ্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচনের একটি। এই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি, সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে প্রার্থীকে কোনো ভোটই চাইতে হয়নি, সংখ্যাগরিষ্ঠ দল এতে অংশ নেয়নি, এমনকি যে কয়টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেখানেও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হয়নি। বলা হয় যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার মাধ্যমে এবং পরে প্রধানমন্ত্রী পদে শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব না মেনে নিয়ে আওয়ামী লীগ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। অনেকে এ-ও মনে করেন যে নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ের জনমত জরিপ, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর ফলাফল এবং বাংলাদেশের চিরন্তন রাজনৈতিক সংস্কৃতি (ক্ষমতাসীন দলের পরাজয়) অনুসারে ৫ জানুয়ারি একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে এতে ফলাফল সম্পূর্ণ অন্য রকম হতে পারত।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনের অন্য পক্ষের লোকজনের প্রায় কেউই এই নির্বাচনের গুণগত মান নিয়ে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য করেন না, বলেন না যে এটি একটি ভালো নির্বাচন ছিল। তবে তাঁদের মতে, এই নির্বাচন মন্দ দিকের পুরো দায়দায়িত্ব বিএনপির। তঁাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয় যে এই নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণ অবাধ করার জন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিএনপির সঙ্গে আন্তরিকতাপূর্ণ আলোচনা করেছিল, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন সরকারে অংশ নেওয়ার জন্য বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, এমনকি নির্বাচনের সময় অতি গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিএনপিকে দেওয়ার প্রস্তাবও করেছিলেন। বলা হয় যে বিএনপি সরকারের আন্তরিকতায় সাড়া না দিয়ে সহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে এই নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিয়েছিল বলেই নির্বাচন এমন একতরফাভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

এই দুই বয়ানের কোনোটি কি পুরোপুরি অসত্য? আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমরা মনে করি, একটি বয়ান সত্যি হলে অন্যটি পুরোপুরি মিথ্যা। কিন্তু আমাদের এখন সময় এসেছে উপলব্ধি করার যে উপরিউক্ত দুই বয়ানই সত্যি, অন্তত অনেকাংশে সত্যি। এই নির্বাচনে অংশ না নেওয়াও ভুল হয়েছিল, এই নির্বাচন একতরফাভাবে অনুষ্ঠিত করাও ভুল হয়েছিল।

এসব ভুল মোচনের সুযোগ তখন ছিল। সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ মোতাবেক সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ নিয়ে নির্বাচনটি পিছিয়ে দিয়ে সবার অংশগ্রহণের শেষ একটি চেষ্টা করার সুযোগ ছিল। এমন প্রস্তাব তখন নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশের পক্ষ থেকে নির্বাচনের কিছুদিন আগে করাও হয়েছিল।
এটি সম্ভব না হলে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা পালন করে অল্প সময়ের মধ্যে আরেকটি নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া সম্ভব ছিল। প্রধানমন্ত্রী নিজে এমন সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সে রকম কিছু করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি, সে রকম উদ্যোগ নিতে আওয়ামী লীগকে প্রভাবিত করার নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিও বিএনপি করতে পারেনি। বরং ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে জনসভা করার সুযোগ না পাওয়ার পর বিএনপি ও তার সঙ্গীরা অধৈর্য হয়ে যে সহিংস আন্দোলন শুরু করে তা মধ্যবর্তী নির্বাচনের দায় থেকে আওয়ামী লীগকে অনেকাংশে অবমুক্ত করে দেয়।

৫ জানুয়ারি এবং এর পরের ঘটনাপ্রবাহে তাই সবার ভুল ছিল। কারও বেশি কারও কম। ভুল পরিমাপের চেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে এটি উপলব্ধি করা যে ৫ জানুয়ারিকেন্দ্রিক ভুলের মাশুল দিচ্ছে কোনো না কোনোভাবে সবাই। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ ভোটাধিকারের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে, দেশে নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি আস্থা মারাত্মকভাবে
বিনষ্ট হয়েছে,জনমতের গুরুত্বের প্রতি সরকারের অবজ্ঞা বৃদ্ধি পেয়েছে, শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, নাগরিক সমাজ বিভক্ত হয়েছে, গণমাধ্যমের ওপর সরকারের খবরদারি বেড়েছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ের প্রতি রুষ্ট মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বহু অন্যায্য আবদার মেনে নিতে হয়েছে, সুস্থ রাজনীতির অভাবে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সবচেয়ে যা ভয়াবহ এর মধ্য দিয়ে মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিনষ্ট হয়েছে।

গণতন্ত্র বলতে মানুষের রাজনৈতিক অধিকারসহ অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অধিকারকেও বোঝায়। বিশ্বায়নের বাজারে অর্থনীতির যে দাপট তার ঢেউ আমাদের দেশেও লেগেছে, ধনী-দরিদ্রের অর্থনৈতিক বৈষম্য লাগামহীনভাবে বেড়েই চলেছে, যা নিয়ে আমাদের রাজনীতিবিদ ও এলিট শ্রেণির মধ্যে বির্তক নেই। একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে সব সম্পদ পুঞ্জিভূত হচ্ছে। অপরদিকে বেড়ে চলছে ন্যূনতম আয়ের মানুষের বঞ্চনা। জনগণকে এখন থেকে অধিকার সচেতন করা না হলে বাংলাদেশ যখন মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হবে, তখন ধনী-দরিদ্রের এই বৈষম্য আরও বেড়ে যাবে।

গণতন্ত্রের জন্য এখন অবাধ ভোটের সংকট, তখন নতুন সংকট সৃষ্টি হবে। গণতন্ত্র যদি অংশগ্রহণমূলক না হয়, তাহলে একটার পর একটা সংকট বা সমস্যার জন্ম হবেই। কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্য তথাকথিত গণতন্ত্রকে ব্যবহার না করে গণতন্ত্রকে কত বেশি অংশগ্রহণমূলক করা যায়, আমাদের রাজনীতিবিদদের দৃষ্টি সেদিকেই ফেরাতে হবে।

এখন আমরা যা করছি, তা তার উল্টোটা। ‘ভোট ছাড়াই’ আমরা নির্বাচন করেছি এবং সরকার গঠন করে বহাল তবিয়তে রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকেছি। ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচন যে নজির স্থাপন করেছে, ভবিষ্যতের জন্য তা হুমকি হয়ে থাকবে এ কারণে যে, এর পুনরাবৃত্তির আশংকা থেকেই যাবে। অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র, যার পূর্ব শর্ত সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন, তা ছাড়া সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়, আর সুশাসন তখনই সম্ভব যদি তা অংশগ্রহণমূলক (Participatory governance) হয়।

গণতন্ত্রের স্বার্থেই নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করতে হবে যাতে সব দল নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে এবং সব ভোটার নির্বাচনে অবাধে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়।

Related posts