November 20, 2018

৫২’র একুশঃবর্তমানে তার হালহকিকত

677
আবু জাফর মাহমুদ

মহান ২১শে ফেব্রুয়ারী মানবজাতির মাতৃভাষা দিবস বা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।এই দিবসের জন্মদাতা বাংলাদেশী বাঙালি সমাজ।পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও বাঙলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় না পেয়ে আন্দোলনে নেমেছিলো ছাত্রসমাজ।এতে বিরক্ত হয় ক্ষমতাসীন মুসলিমলীগ সরকার।সরকারের পুলিশ অস্ত্র চালায় নিরস্ত্র ছাত্রদের মিছিলে।পুলিশের অভিযানে মিছিলকারীদের মধ্যে প্রাণ হারায় কয়েকজন।এতে জনরোষ প্রতিরোধের পর্যায়ে পৌঁছে যায়।ভাষা শহীদরা সবাই ছিলেন মুসলমান বাঙালি।আন্দোলনে ছিলেন জাত ধর্ম নির্বিশেষে সবাই।পূর্ব পাকিস্তানী  বাঙালি ছাত্রসমাজ পাকিস্তানী সরকারের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনে নেতৃত্ব করে একুশকে অমর করেছে।

এই ছাত্রসমাজের পরবর্তী বংশধর বিপ্লবীছাত্রসমাজই ’৭১এ রাজনীতিকদেরকে স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরুর জন্যে চাপের মুখে রেখে নিজেদের আরাধ্য স্বাধীনতার লক্ষ্যে সমর্থনে থাকতে বাধ্য করেছিলো।পাকিস্তান সরকারের অনৈতিক  সিদ্ধান্তের সাথে আপোষ করার আলোচনার পথে বাধা সৃষ্টিকারী এই বাঙালিবীর ছাত্রসমাজকেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের পিতার সম্মান দেয়া হয়।তাদের অনুসারী প্রজন্ম বীর ছাত্রসমাজই স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরুর আগে স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষের একমাত্র সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি বলেই দলিল প্রমাণ পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে ২১শে ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠানের খবর দেখতে পত্রিকায় চোখ দিতেই নজরে পড়লো পঞ্চগড়ের ট্র্যাজিক ঘটনা।এক হিন্দু পুরোহিতকে ভোর ৭টার সময় হত্যা করে পালিয়ে গেছে মোটর সাইকেলে আরোহী আগন্তুকরা।এই নিষ্ঠুরতা অনাকাঙ্ক্ষিত।নিন্দনীয়।মানুষের মৃত্যু অনিবার্য্য,এনিয়ে কোন সংশয় নেই।কিন্তু অনাহুত হত্যাকান্ড অসহনীয়।ইসলামিক ষ্টেট বা আই এস স্বীকার করেছে এই অপারেশান তাদের।কি তাদের লক্ষ্য একমাত্র তারাই বলতে পারে।আই এস মধ্যপ্রাচ্যে গড়া হয়েছে অমুসলিম একটি জাতির স্বার্থে বলে আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমে দাবি করা হয়ে থাকে।এও বলা হয়,অনেক বড় শক্তি রয়েছে আই এস সংঠিত করার পেছনে। বাংলাদেশের শান্তিকামী সমাজ এই কাপুরোষোচিত নির্মমতার নিন্দা করে।

বাঙালির জীবনে বাংলাভাষা আন্দোলন এবং একুশের গৌরবদীপ্ত অমিত তেজের ঐতিহ্যের স্মরণে বাংলাদেশে মহান একুশ উদযাপন করা হয়ে আসছে।একুশ বাঙালির জাতীয় দিবস।বাংলাদেশের জাতীয় দিবস।উর্দুর সাথে বাংলা ভাষার বিরোধ ছিলোনা,ছিলো উর্দুভাষী রাজনীতিকদের সাথে বাংলাভাষী রাজনীতিক এবং বাঙ্গালি জাতির বিরোধ। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সংখ্যাগুরু নাগরিকদের ভাষা বাংলার পরিবর্তে উর্দু করার জন্য পাকিস্তানে সরকারের তোড়জোড়ের মুখে ছাত্রসমাজের প্রতিরোধের ফলাফলেই মহান একুশের আবির্ভাব।

মহান একুশের এই স্ফুলিঙ্গ পরবর্তীতে দাবানল সৃষ্টি করে ৬দফা ভিত্তিক স্বায়ত্বশাসন আন্দোলনকে সফল করে ১৯৭০সনের পাকিস্তান জাতীয় সংসদ এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা উপহার দিতে সক্ষম হয়েছিলো।

পাকিস্তানের শাসক হবার অনিবার্য্য দাবীদার করে দিয়েছিলো বাঙ্গালিদের।যে বাস্তবতার শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করতে যাওয়ার পরিণতিতে আমরা স্বাধীনতাযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১এ বাংগালীর জাতীয় রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করলাম। দুনিয়ার মানচিত্রে বাঙালির একমাত্র রাষ্ট্র বাংলাদেশ গড়লাম।

তার ফলে পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করে আমরা হয়েছি ভারতের মিত্র দেশ।সীমান্তে কাঁটাতারে ঘেরাও এবং অবরুদ্ধ করে রাখা ভারতের কাছে বাংলাদেশ হচ্ছে সাহসী জাতির রাষ্ট্র,মানব-স্ফুলিঙ্গের এক বিশাল আগ্নেয়গিরি।ইতিমধ্যে বাঙলাদেশের জনসংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৯কোটি ৪৮লক্ষ।

প্রচুর বিদেশী সহ এতো লোকের ভারে লোকারণ্য এই রাষ্ট্র পরিচালনা বড় জটিল কাজ।৫৬হাজার বর্গমাইলের ঘনবসতির এই দেশে নিরাপত্তাহীনতার প্রশ্ন শুরু থেকেই।আগ্রাসনের মুখে আক্রান্ত এই দেশ জন্ম পাবার সময় থেকেই।এই আগ্রাসনের বাস্তবতা মেনে নেয়া বাংলাদেশ রাজনীতির মুখ্য বিষয়।আগ্রাসনের মুখে আমরা আছি নিরাপত্তাহীন।

শক্তির নিজস্ব প্রবণতা থাকে।নিজেকে প্রকাশ করা তার অন্যতম স্বভাব।এই স্বভাব চর্চা হয় দূর্বলের উপর,দূর্বলকে আঘাত না করে সবলের নিজের পরিচয় অপূর্ণ থাকে।সবল এজন্যে চুপচাপ থাকেনা,থাকতে পারেনা।থাবা মেলে,সক্রিয় থাকে।ভারত বাংলাদেশে হিন্দি চাপিয়ে দিতে শুরু করেছে।তারা চাইছে পশ্চিম বঙ্গের মতো হিন্দির পেটে বাঙলা গিলিয়ে দিতে।ধীরে ধীরে কৌশলে করছে তারা।বন্ধুর পরিচয়েই আসছে এই থাবা।

হিন্দি-বাংলা মিশিয়ে এক ধরণের ‘হিংলা ভাষা’য় চলছে ভারতীয় অঙ্গরাজ্য পশ্চিম বাংলা।ওখানে বাংলা হচ্ছে দরিদ্রের ভাষা।বিত্তবান পশ্চিমবঙ্গীয়রা কথা বলে হিন্দি ভাষায়।মজুর এবং দারিদ্র পীড়িত বাঙালিদের ভাষারূপে বাংলাকে দেখা হয় ভারতে।জাতীয়ভাবে ধনীদের ভাষা হিন্দি।তবে ভারতের সংখ্যাগুরু নাগরিকের ভাষা হিন্দি নয়।তবু হিন্দি ভারতের রাষ্ট্র ভাষা।কেননা শক্তিশালীদের ভাষা হিন্দি।পাকিস্তানে যেমন উর্দু।

ভারতীয় আধিপত্য বাংলাদেশ কেনো,প্রতিবেশী সকল দেশের উপর বিস্তৃত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।এটা শক্তির বৈশিষ্ট্য আগেই উল্লেখ করেছি।আমাদের তা হচ্ছে,আমরা তাকে স্বাগতঃ করেছি,তাই।প্রতিবেশী আরো দেশ আছে,যারা ভারতের আধিপত্য গ্রহন করেনি।পাকিস্তান ভারতীয় নাক দেখলেই নাক বরাবর গুলি করে দেয়। নেপাল এতোদিন যাবত ভারতীয় কলোনী ছিলো, একমাত্র হিন্দু রাষ্ট্র ছিলো কাগজে-দলিলে।

এই একক সংখ্যাগরিষ্ট হিন্দু জনগোষ্ঠী নেপালিরাও এখন আর ভারতীয় আধিপত্যে থাকতে চাইছেনা।শাসনতন্ত্র পরিবর্তন করেছে হিন্দু রাষ্ট্র থেকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে।নেপালে নেপালি ভাষার পাশাপাশি হিন্দি চালু আছে।নিজেরা দেখেছি অনেক ব্যবসায়ী নেপালি মুদ্রা নয়,এমনকি মার্কিন ডলার সহ বিদেশী আর কারো মুদ্রা গ্রহন করেনা, কেবলমাত্র ভারতীয় রুপী গ্রহন করছে।এই রুপী ব্যাতীত অপর কোন মুদ্রায় তারা ব্যবসা করেনা।

বাংলাদেশে ভাষা-সংস্কৃতিকে বাঙলা থেকে সরানো জরুরী ভারতীয়দের স্বার্থে।এই স্বার্থ পাকিস্তান আমলে ছিলো পাকিস্তানী ধনীক গোষ্ঠী এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর।বাঙলাদেশ হবার পর ভারতীয় ধনিক গোষ্ঠী এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর স্বার্থ রক্ষার জন্যে চলছে একই ধারা।

পাকিস্তান আমলে মুসলিম লীগ পাকিস্তানী শাসকদের জন্যে বাঙলা বলি দিয়ে তাদের রাজনৈতিক,আর্থিক এবং সামাজিক মর্যাদার স্বার্থ খুঁজে বেড়াতো।বাংলাদেশ হবার পর আওয়ামীলীগ একই ধরনের সুযোগ নিচ্ছে ভারত থেকে,বলির বিষয় একই থাকছে।তবে বাংলাদেশে অন্যান্য দল বিএনপি,জাতীয় পার্টিও একই ধারার যাত্রী।ছোট খাট দলগুলো এই বিষয়ে আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে।

ভাষা আন্দোলনকে রাজনীতিকরা সব সময় ভাষা সংস্কৃতি এবং বাঙ্গালীর ঐতিহ্য রক্ষার মৌলিক উপাদান থেকে সরিয়ে রাজনৈতিক পণ্যরূপে ব্যবহার করে চলেছেন।এটি কোন অভিযোগ নয়। তা হচ্ছে,তারা প্রয়োজনেই তা করছে।এটা হচ্ছে চোখে দেখা বাস্তবতা।রাজনীতির বক্তৃতায় পাবলিকের সামনে আমাদের নেতা নেত্রীদের কথার অর্থ একরকম এবং জনতার আড়ালে অন্যস্থানে তাদের একই কথার অর্থ তারা ব্যাখ্যা দেন আলাদা করে।

ভাষা শিক্ষার কথার বিতর্কে আমরা অনেক যুক্তি শোনি।শুধু বাংলা শিখে কি হবে?আন্তর্জাতিক জগতে বিচরণের ভাষা শিখতে হবেনা?তাতো বটে,যত বেশী ভাষা শিখবো,ততো বেশী জাতিকে জানার পথ খুলে যাবে,ওপথে যত সুযোগ তা নিতে হাত বাড়াতে পারবো।

কিন্তু শিশুবেলায় আমাদের সন্তানদেরকে বাংলা শিখতে না দিয়ে উচ্চ জাতে তোলার নামে শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করার উপদেশ বাংলাদেশে কার স্বার্থে দেয়া হয়? এতে কি আমাদের প্রজন্মকে বাংলাদেশ এবং বাংলা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া নয়? এই ধারায় কি শেষ পর্যন্ত তার বাবা মা,দাদা দাদী,নানা নানীকে আর যোগাযোগ রাখতে পারে?পূর্ব পুরুষের সমাজ বা নিজের সমাজের সাথে পরিচয় রাখতে পারে?

এই শিশুরা কি আত্নীয় স্বজনের সাথে সম্পর্ক রাখতে পারে?নিজের শেকড়ের থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্যেই শিশুকে শিকড়ের ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার কাজটি বড় নিষ্ঠুরতা শিশুদের প্রতি।অনেকে ভালবেসে নিজের অজান্তেই এই নিষ্ঠুর কাজ করেন, প্রিয় জনের প্রতি।এটি অপরাধ।ভয়ংকর অপরাধ।

এই অপরাধকে কোন কোন পরিস্থিতিতে মনে করা হয় প্রগতিশীল কাজ।এই প্রগতিবাদীরা হারায় শেকড়ের অবস্থান,উঠতে পারেনা আকাশেও।সবদিক হারিয়ে হয়ে যায় পরিচয়হীন।শেকড়হীন বা পরিচয়হীন জীবনের কষ্ট মৃত্যুর চেয়েও বেশী আফসোসের।ভালবেসে নিজের আপনজনকে এভাবেই ফতুর করে দেন এই ধরনের প্রগতিশীলরা।

পৃথিবীটাকে জানতে আমরা অনেক ভাষা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা দৃঢ়ভাবে বলি।শিক্ষা হচ্ছে মানুষের নিজেকে চেনার প্রধান শক্তি।নিজের আদি পরিচয় জানার একমাত্র হাতিয়ার।এই হাতিয়ার-বঞ্চিত মানব তাদের জীবনে জ্ঞানের জগতে হয়ে যান সব চেয়ে অসহায়।এই অসহায়ত্বের জন্যে নিজে দায়ী যতটুকু তার চেয়ে দায়ী অন্যেরা,যাদের উপর ছিলো তার শক্ষার দায় ভার।

বাংলাদেশকে একুশের গৌরব থেকে বঞ্চিত করতে একটি শক্তি অনেক দিন ধরে ব্যায়াম চর্চা করে চলেছে। তারা বাংলাকে হিন্দু ধর্মীয় মূর্তি পূজার অংশরূপে দেখাতে তৎপর।এটি নতুন ঘটনা নয়,নিউইয়র্কে এমন ঘটনা ২০১৬সনের ২১শে একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে টেলিভিশন এবং পত্রিকায়।যে যার বিশ্বাসের প্রতিফলন করবে,দোষের কিছু নয়।বাঙালী জাতির এই অহংকারকে কেউ তার ধর্মীয় বিশ্বাসের দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থাপন করায় অপরাধ দেখিনা আমি। এতে প্রতারণার বিষয় চোখে এসে গেলে মানুষ তার প্রতিবাদ করতেই পারে।এই প্রতিবাদও তাৎপর্য্যপূর্ণ।

বাংলাদেশে এবং বিদেশে অন্যান্যভাবে আসছে একুশকে খেলো করার হীনমন্যতা। শহীদ মিনারে একুশে অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দলবাজি এবং অশ্লীলতাকে উস্কিয়েছেন রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরা।এখানে তাদের রাজনৈতিক দলীয় প্রভাব দেখাতে গিয়ে যে ধাক্কাধাক্কি করেনা এমন দলের নাম করা কঠিন। শহীদ মিনারে অশোভন পরিস্থিতি করাকে রাজনৈতিক কৃতিত্বের সাথে এক নজরে ধারণা করা বর্তমানে বাংলাদেশ রাজনৈতিক কালচারে।সভ্যতার দাবীদার রাজনীতিকদের এব্যাপারে সতর্ক হয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধন জরুরী।আমরাও জানি,নিশ্চয়ই সম্মানিত রাজনীতিকরাও জানে,কারো কৃতিত্ব রক্ষার জন্যে জোর করা দরকার হয়না,আর যা কৃতিত্বরূপে চাপিয়ে দেয়া হয়,তা জোর করে টিকিয়ে রাখাও সম্ভব নয়।

(আবু জাফর মাহমুদঃরাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং চেয়ারম্যান,বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল)

Related posts