November 15, 2018

৪ বছরের বাংলাদেশীর বিস্ময়ঃ অবাক করেছে আমেরিকাকে

ডেস্ক রিপোর্টঃ ২০১৩ সাল। এক বছর বয়সী সুবর্ণ আইজ্যাক বারী নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালের বেডে জ্বরে কাতরাচ্ছিল। তার বাবা রাশীদুল বারী বললেন, ‘আই লাভ ইউ মোর দ্যান এনিথিং ইন দ্য ইউনিভার্স’। সুবর্ণ বলল, ‘ইউনিভার্স অর মাল্টিভার্স?’ কলেজ শিক্ষক রাশীদুল বারী চমকে গেলেন। কিন্তু তখনো তিনি জানতেন না এই সুবর্ণ ৩ বছর বয়সে অংক, পদার্থ বিজ্ঞান এবং রসায়নে দক্ষতা দেখিয়ে সারা পৃথিবীকে নাড়িয়ে দিবে।

নিউইয়র্ক:  মেডগার এভার্স কলেজের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড পোজম্যান অভিভূত হলেন সুবর্ণ’র মেধা যাচাই শেষে 

ইতিমধ্যেই সুবর্ণ যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হইচই ফেলে দিয়েছে। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত সুবর্ণর মেধা বিস্ময় সৃষ্টি করেছে সর্বত্র। যে এখনও স্কুলেই যায়নি, সে কীভাবে জ্যামিতি, এ্যালজাবরাসহ রসায়নের জটিল বিষয়ের সহজ সমাধান দিচ্ছে। অক্ষর জ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো প্রক্রিয়া অবলম্বন করা ছাড়াই কীভাবে সে ইংরেজি বই অবলিলায় পাঠ করছে?

কৌতুহলের পাশাপাশি জিজ্ঞাসার অন্ত নেই বিস্ময় শিশু সুবর্ণকে ঘিরে। এর ৫টি প্রধান কারণ হচ্ছে- (১) দেড় বছর বয়সে সে রসায়নের পর্যায় সারণী তথা ক্যামিস্ট্রি পিরিয়ডিক টেবল মুখস্ত করে ফেলেছে, (২) দুই বছর বয়সে সে যুক্তরাষ্ট্রের কলেজে ইন্টারভিউ দিয়েছে, (৩) ভয়েস অব আমেরিকায় সাক্ষাৎকার প্রদান, (৪) ৩ বছর বয়সে সে লেবুর সাহায্যে ব্যাটারি এক্সপেরিমেন্ট করে এবং (৫) সাড়ে তিন বছর বয়সে খ্যাতনামা একটি কলেজের প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎকারের আমন্ত্রণ পেয়েছে।

ওয়াশিংটন ডিসি : সাক্ষাৎকার গ্রহণের পর সুবর্ণের সাথে ভয়েজ অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের প্রধানসহ সকল সাংবাদিক
মাত্র দেড় বছর বয়সে রসায়নের পর্যায় সারণী সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা এবং তা মুখস্ত করে সুবর্ণ। যথারীতি ওর মা ওকে অংক শিখাচ্ছিলেন। হঠাৎ সুবর্ণ বলল, ‘ইফ ওয়ান প্লাস ওয়ান ইক্যুয়াল্টো টু, দ্যান ২ প্লাস ২=৪ এবং এন+এন=২ এন, তাই না?’

রাশীদুল বারী তখন পাশের রুমে তার ছাত্রদের পেপার দেখছিলেন। এমন বিস্ময়কর কথা শুনে তিনি দৌড়ে সুবর্ণ’র কাছে চলে গেলেন। তার চোখে আনন্দের জল। স্ত্রী জানতে চাইলেন, কাঁদছ কেন? সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বারি বললেন, ‘জানো আমাদের সমনে কে বসে আছে? কার্ল ফাইডরিচ গোস (জার্মানের অঙ্কশাস্ত্র বিশেষজ্ঞ)। দেড় বছর বয়সী পুত্রের অংকশাস্ত্র প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে রাশীদুল বারী তাকে অ্যাডভান্সড ম্যাথ অ্যান্ড সায়েন্সের লেসন দেয়া শুরু করলেন। আর এভাবেই মাত্র ২ বছর বয়সে সে রসায়নের পিরিয়ডিক টেবিল মুখস্ত করে ফেলল।

নিউইয়র্ক : সিটি ইউনিভার্সিটিতে লেবু দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরীর কলাকৌশল দেখায় সুবর্ণ
এ অবিশ্বাস্য কথাটি সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের ছাত্র-শিক্ষকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে ‘বারী সায়েন্স ল্যাব’ এবং সোস্যাল মিডিয়াতেও ছড়িয়ে পড়ে এ বিস্ময়কর প্রতিভার কথা। এমনি অবস্থায় মেডগার এভার্স কলেজের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড পোজম্যান সুবর্ণের মেধা যাচাই করতে চান। সুবর্ণ পর্যায় সারণীর সবগুলো এলিমেন্ট বলে পোজম্যানকে অবাক করে দেয়। সেদিন তিনি এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, এক বছর পর অর্থাৎ গত ২৫ নভেম্বর আবার তাকে ডেকে পাঠালেন পোজম্যান।

এরপর ডাক পড়ে ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগ থেকে। বাবা বারী তাকে নিয়ে যান ওয়াশিংটন ডিসিতে ভয়েস অব আমেরিকা স্টুডিওতে। সেখানে সাবরিনা চোধুরী ডোনা তার ইন্টারভিউ নেন এবং বছরের সেরা কনিষ্ঠ ইন্টারভিউ হিসাবে তারা এটা বাছাই করে ইংরেজী নববর্ষে পুনঃপ্রচার করেছে। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘঠনাটি ঘঠে যখন আড়াই বছরের এই শিশুটি পর্যায় সারণীর সব এলিমেন্টগুলোর নাম বলে যাচ্ছিল অবলিলায়। বাংলা বিভাগের প্রধান রোকেয়া হায়দারসহ সকল সাংবাদিক অবাক বিস্ময়ে তার এই প্রতিভা অবলোকন করেন।

ছোট্টমনি সুবর্ণ এরই মধ্যে অনেকগুলো সায়েন্টিফিক এক্সপেরিমেন্ট করে ফেলেছে। যার একটি ইলেকট্রিক ব্যাটারি। সে জন্য সে আবার পদার্থবিদ্যা এবং রসায়ন অধ্যয়ন করছে। বিভিন্ন রকম ব্যাটারি সে বানাচ্ছে। তার একটি হচ্ছে লেবু ব্যাটারি। যেটা বানাতে তার দরকার হয় ৪টি লেবু, ৪টি পেরেক, ৪টি পেনি এবং ৫টি এলিগেটর ক্লিপ। এগুলো দিয়ে সে ইলেকট্রিক সার্কিট বানিয়ে পোটেনশিয়াল ডিফারেন্স সৃষ্টি করে লাইট জ্বালাতে পারে। ২০১৫ সালের ১২ জুন ড. ড্যানিয়েল কাবাট, যিনি বর্তমানে লিমন কলেজে ফিজিক্স চেয়্যারম্যান, সুবর্ণর এই প্রতিভা দেখার জন্য তাকে লিমন কলেজে আমত্রণ জানান এবং সুবর্ণ ব্যাটারি বানিয়ে তাকে মুগ্ধ করে।

সর্বশেষ আমন্ত্রণ এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল থেকে। সিটি কলেজ অব নিউইয়র্কের প্রেসিডেন্ট ড. লিসা কৈকো ২১ মার্চ অপরাহ্ণ ৩টায় সুবর্ণকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সুবর্ণর অংক, পদার্থবিদ্যা এবং রসায়নের মেধা আরো ভালোভাবে যাচাই করে দেখতে চান ড. লিসা।

চট্টগ্রামের সন্তান রাশেদুল বারী উচ্চ শিক্ষার জন্যে নিউইয়র্কে আসার পর ব্রঙ্কসের লিমন কলেজে অধ্যয়ন করেছেন। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্ক সিটি ইউনিভার্সিটির বারুখ কলেজে অংকের অ্যাডজাঙ্ক অধ্যাপক এবং একইসাথে নিউ ভিশন চার্টার হাই স্কুল ফর অ্যাডভান্সড ম্যাথ অ্যান্ড সায়েন্সে পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক। জেরুজালেম পোস্টে তিনি নিয়মিতভাবে কলাম লিখছেন। সুবর্ণর মা রেমন বারী ব্রঙ্কস কম্যুনিটি কলেজ থেকে অ্যাকাউন্টিংয়ে ডিগ্রি নিয়েছেন। সুবর্ণর একমাত্র বড় ভাই রিফাত এলবার্ট বারীর বয়স ১২। সেও অসাধারণ মেধার অধিকারী। সপ্তম গ্রেডে পড়ছে এবং ৭ ভাষায় কম্প্যুটার প্রোগ্রামিংয়ে অভ্যস্ত। সে হাই স্কুলে না গিয়েই বিশ্ববিখ্যাত হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে চায়। এজন্যে সে ইতিমধ্যেই ৩ বার এসএটি প্রদান করেছে।

সুবর্ণের জন্ম ২০১২ সালের ৯ এপ্রিল অর্থাৎ আসছে এপ্রিলে তার বয়স হবে ৪ বছর। সুবর্ণ তার বাবার ল্যাবরেটরিতে যাচ্ছে এবং অঙ্ক শাস্ত্র ছাড়াও রসায়নের বিভিন্ন বিভাগ সম্পর্কে ধারণা নিচ্ছে। এখনও সে স্কুলে ভর্তি হয়নি। আর এরইমধ্যে সে তার মেধার বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। ছোট্ট শিশু সুবর্ণ’র এই অসাধারণ মেধার ওপর অনুসন্ধানী একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘সাপ্তাহিক ঠিকানা’ পত্রিকা। বুধবার বাজারে আসার পর ‘বিস্ময় শিশু সুবর্ণ’ সংবাদটি টক অব দ্য আমেরিকায় পরিণত হয়েছে।

Related posts