November 14, 2018

২০৫০ সালের মধ্যে সবাই মিথ্যা বলবে

337

উইন্সটন লিখছেন আর লিখছেন। তবে নিয়ম হলো লেখার আগে তা উচ্চারণ করতে হবে। এর নাম হলো স্পিকরাইট। প্রথমে যা বলা হবে তা-ই পরে লেখা হবে। তাই সৃষ্টি করা হয়েছে মেমোরি হোল বা স্মৃতি গহ্বর। এই গহ্বর থেকে ইতিহাসের সপক্ষে যা কিছু আছে তা ছুড়ে ফেলতে হবে। কেউ তা রেকর্ড করতে পারবে না। অরওয়েল এমনভাবে ওসেনিয়ার সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে চিত্রিত করেছেন যাতে নাগরিকরা বুঝতে পারেন যে, কি একটা ভয়ার্ত পরিবেশের মধ্যে উইন্সটন, যদিও তিনি ক্ষমতাসীন দলের আউটার পার্টির সদস্য, তার দিনরাত যাপন করছিলেন। অরওয়েল নিশ্চিত করেছেন যে, একটি স্বৈরশাসনের মধ্যে উপরে উপরে যতোই ক্ষমতাসীন দলীয় লোকেরা ঠাটবাট দেখিয়ে চলেন না কেন, সেটাই আসলে সবটা নয়। এর পেছনে সত্য লুকিয়ে থাকে। যা কোনো বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীর ত্রস্ত জীবেনর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

১৯৮৪ উপন্যাসের প্রথম খণ্ডের চতুর্থ পরিচ্ছেদে পাঠক ওসেনিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিবরণ পাবেন। উইন্সটন নতুন ইতিহাস তৈরি করছেন যে, বিগব্রাদার কখনও ভুল করতে পারেন না। যারা দলের জন্য আত্মাহুতি দেয় তারাই কেবল জাতীয় বীর। যা কিছু ভালো তা রাষ্ট্রে এত বেশি পরিমাণে উৎপাদন করা হয় যা ধারণার ঊর্ধ্বে। কিন্তু উইন্সটন জানতেন যে, তিনি এসব চাকরি রক্ষার্থে লিখছেন কিন্তু তিনি ভালোই জানেন যে, এর কোনো কথাই সত্য নয়। যদি কোনো সত্য তা যত বড় সত্যই হোক, সেটা যদি কেবল আপনার স্মৃতিতে বিরাজ করে, কোনো রেকর্ড তার পক্ষে না থাকে, তাহলে সেই সত্য কি করে চ্যালেঞ্জের মুখে টিকে থাকবে?

এই চ্যাপ্টারে ‘পেলিম্পচেস্ট’ নামে একটি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর অর্থ হলো এমন একটি বস্তুর উপরে দুই বা তিনবারের মতো কোনো বিষয় লেখা হয়েছে। প্রতিবারই মুছে ফেলতে গিয়ে কাঁচা কাজ করা হয়েছে। কোনোবারই সবটা ভালোভাবে মুছে ফেলা হয়নি। সুতরাং কোনো না কোনো অংশ অস্পষ্ট হলেও টিকে গেছে।

এক মধ্যাহ্নভোজে উইন্সটনের বন্ধু সাইম একটা লেকচার দিলেন। তাকে বোঝানো হল যে, নিউজপিক হলো একটি ভাষা। এটা এমন এক ভাষা যা প্রতিনিয়ত শব্দ হারায়, কখনও তার শব্দ ভাণ্ডার স্ফিত হয়ে ওঠে না। এর ফলে চিন্তা করার যে প্রবাহ সেটা মরা নদীর মতোই শুকিয়ে আসে। সাইম তাকে বললেন, ২০৫০ সালের মধ্যে নাগরিককূলের সবাই এই ‘নিউজপিকে’ ভাবের আদান-প্রদান করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। সোজা কথায় ২০৫০ সালের মধ্যে সবাই অনর্গল মিথ্যা বলায় অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। এটা উপলব্ধি করে ক্ষমতাসীন দলের একজন সদস্য হয়েও উইন্সটন বিব্রত বোধ করলেন। তিনি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কি গতি হবে তাই ভেবে পেরেশান হলেন। কিন্তু সেটা প্রকাশ করতে তিনি সাহসী হলেন না। এ সময় তার প্রতিবেশী মিসেস পার্সন এসে তাদের টেবিলে যোগ দিলেন। বললেন, তাঁর সন্তানরা ক্রমাগতভাবে অপ্রচলিত ধরনের আচারণ করে চলছে। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও মিসেস পার্সন তার বাচ্চাদের মধ্যকার অদ্ভুত পরিবর্তন সম্পর্কে বাহ্যত বিস্ময় প্রকাশ করলেন। কিন্তু সেজন্য তিনি তাকে প্রচ্ছন্নভাবে বরং সমর্থন করলেন। এই নেতিবাচক পরিবর্তনের তিনি আক্ষেপ না করে বরং প্রশংসাই করলেন। আর ঠিক তখনই টেলিস্ক্রিনে উচ্চ স্বরে আওয়াজ ভেসে এল, ওহে নগরবাসী, তোমাদের জন্য সুখবর, রেশনে চকোলেট সরবরাহের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের এই ঘোষণা শুনে উইন্সটন হতবাক হলেন। কারণ তিনি এখনও পরিষ্কার স্মরণ করতে পারছেন যে, মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগেই চকোলেটের পরিমাণ হ্রাসের ঘোষণা কার্যকর করা হয়েছিল। এখন তিনি ভাবতে বসেছেন যে, ব্যাপারটা কি। এতো অদ্ভুত কাণ্ড। ক্রেতারা বাস্তবে দোকানে গিয়ে চকোলেট কম পরিমাণে কিনতে পারবে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার ঘোষণা অনুযায়ী তাদেরকে মানতে হবে যে, আসলে চকোলেটের সরবরাহ আগের তুলনায় আরও বাড়ানো হয়েছে! চলবে-।মানবজমিন

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি

Related posts