September 26, 2018

‘হেডস্যার বলেন, তোরা নাপাক তোদের আল্লাহও নাপাক’

ঢাকাঃ  ধর্মের নামে কটূক্তির ঘটনায় মিডিয়া সত্য প্রকাশ করছে না বলে অভিযোগ করেছে মো. রিফাত হাসান। নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার কল্যান্দি এলাকার পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তের বিরুদ্ধে ইসলাম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগকারীদের মধ্যে অন্যতম রিফাত হাসান।

রবিবার (২২ মে) বিকেলে বন্দর উপজেলার কলাগাছি ইউনিয়নের নয়ানগর গ্রামের বাসিন্দা রিফাত হাসান নিজের বাড়িতে একান্ত সাক্ষাৎকারে সেদিনের ঘটনা জানায়। রিফাত হাসান সেই স্কুলের দশম শ্রেণির বাণিজ্য বিভাগের ছাত্র।

রিফাতের দাবি অনুযায়ী ঘটনাস্থলে উপস্থিত তার দুই সহপাঠী মো. আসিফ এবং মো. রূপনের সঙ্গেও কথা হয়। এদের দুজনও ধর্ম নিয়ে অবমাননার বিষয়ে রিফাতের আনা অভিযোগ সত্য বলে জানায়।

গণমাধ্যমে কল্যান্দি এলাকার মানুষের কথা ঠিকমতো তুলে ধরে হচ্ছে না বলে দাবি বিদ্যালয়ের পেছনের দিকে বসবাসকারী আবদুল হাইয়ের। স্কুলের সামনে থাকা একটি টঙ দোকানে কথা হয় আবদুল হাইয়ের সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘মিডিয়া ছেলের (রিফাত হাসান) সঠিক বক্তব্য দেখায়নি। আপনারা শুধু মাস্টারের (শ্যামল কান্তি) কথা প্রচার করেন।’

রিফাত হাসানের বিস্তারিত সাক্ষাৎকার …

ঘটনার সূত্রপাত কীভাবে হয়েছিল?

৮ তারিখ (৮ মে) রবিবার ছিল। (দশম শ্রেণির) চতুর্থ পিরিয়ডে (ইংরেজি শিক্ষক) উত্তম স্যারের ক্লাস চলছিল। অনেক ছাত্রছাত্রী থাকায় হইচই হচ্ছিল। এ সময় (আনুমানিক দুপুর সাড়ে ১২টা) হেডস্যার (শ্যামল কান্তি ভক্ত) উত্তেজিত হয়ে রুমে ঢুকলেন। প্রথমে মেয়েদের পাশে গিয়ে বললেন, ‘তোরা অমানুষ, শিক্ষার যোগ্যতা অর্জন করবি কীভাবে?’ ছেলেদের পাশে গিয়ে বলেন, ‘তোরা অমানুষ, মানুষ হবি কীভাবে? তোরা নাপাক, তোদের আল্লাহও নাপাক।’

ক্লাসের ভেতরে গিয়ে একজন প্রধান শিক্ষক হঠাৎ এমন কথা বলবেন, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য?

এ সময় উত্তম স্যার ক্লাসে ছিলেন। ‘হেডস্যার আমাদের ধর্মের বিষয়ে এভাবে কথা বলেন কেন?’ ছাত্ররা এমন প্রশ্ন করলে উত্তম স্যার (হেডস্যারকে) বলেছেন, ‘স্যার, ওদের ধর্ম ওরা পালন করবে, আমাদের ধর্ম আমরা পালন করব।’

এ সময় সামনের বেঞ্চের একটা মেয়েও (উত্তম) স্যারকে প্রশ্ন করে বলে, ‘স্যার, আমাদের ধর্মের বিষয়ে (হেডস্যার) এ রকম কথা কীভাবে বললেন?’

ওই মেয়ের নাম কী?

নাম রূপন্তী। বাণিজ্য বিভাগে পড়ে। বাড়ি কল্যান্দি রেললাইনের পাশে।

রূপন্তীর প্রশ্নের উত্তরে উত্তম স্যার কী বললেন?

তখন স্যার বললেন, ‘উনি হেডস্যার (শ্যামল কান্তি) যা ভালো মনে করছেন, বলছেন।’

এরপর …

ওই দিন পঞ্চম পিরিয়ডে আবার হেডস্যার আমাদের রুমে আসেন। ক্যারিয়ার শিক্ষার ক্লাস চলছিল। শিক্ষক ছিলেন মোশারফ স্যার। তাকে বিদায় দিয়ে হেডস্যার নিজেই ক্লাস নিচ্ছিলেন। তখন আমার পেছনের একজন শব্দ করে হাসছিল। আমি লিখছিলাম। স্যার ডাক দিয়েছেন, বুঝতে পারিনি। আমার কাছে এসে শার্টের কলার ধরে বললেন, ‘তোমাকে ডাকছি শুনছ না? আমাকে কি হেডমাস্টার মনে হয় না?’ এরপর আমাকে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি দিতে লাগলেন। এক পর্যায়ে তলপেটে একটি ঘুষি লাগলে আমি বসে পড়ি। মা-বাবা এবং আল্লাহর নাম নিয়ে কাঁদছিলাম। তখন স্যার বলেন, ‘কিসের আল্লাহ? আল্লাহ বলতে কিছু নেই, তোরা নাপাক, তোদের আল্লাহও নাপাক।’

মোশারফ স্যার কিছু বলেননি?

ওই স্যারকে আগেই বের করে দিয়েছিলেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। ক্লাসের ক্যাপ্টেন রাহিম রমজানকে দিয়ে হেড স্যার আমার জন্য ট্যাবলেট নিয়ে আসে। খালি পেটে আমি ওষুধ খেতে চাইনি। প্যারাসিটামল আর অ্যান্টাসিড ট্যাবলেট জোর করেই খাওয়ালেন। আমি বলেছি, ‘শরীর খারাপ লাগছে বাড়ি চলে যাব।’ স্যার বিকেল ৪টার আগে ছুটি দেবেন না। তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনে তোর পেছনে এক হাজার টাকা খরচ করব।’ বাধ্য হয়ে ৪টায় ছুটি হওয়ার পর বন্ধুদের সাহায্যে বাড়ি ফিরি। এরপরের দিন স্যার আমাদের বাড়িতে যান। আম্মাকে বলেন, ‘ধর্মের বিষয়টা, যেটা রিফাতকে ক্লাসে বলছি, দয়া করে কমিটির লোকদেরকে বলবেন না।’ আমার মনে হয় কি স্যারের মাথায় কিছু সমস্যা আছে।

হেড স্যার আপনাকে টার্গেট করবে কেন?

স্যার মনে হয় বুঝতে পারেননি।

এরপর কী হলো?

এ ঘটনায় আম্মা কমিটির লোকজনের কাছে দরখাস্ত দেন। তারা ১৩ তারিখ (১৩ মে) বিচারের কথা জানান। এদিন শুক্রবার ছিল। আম্মাসহ স্কুলে যাই সকাল সাড়ে ৯টার দিকে। (১০টার দিকে) মিটিং শুরু হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে লোকজন স্কুলের দরজা-জানালায় আক্রমণ করে ভেঙে ফেলার অবস্থা করে।

আপনার আম্মাসহ যখন মিটিংয়ে যান তখন স্কুলে মানুষ জড়ো হয়েছিল?

না, তখন কমিটির লোকজন ছাড়া কেউ ছিল না।

হঠাৎ এমন হলো কেন?

ধর্মের কটূক্তির কথাটা সবাই জেনে গিয়েছিল। এ কারণে এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত ছিল।

কীভাবে জানলো?

ক্লাসে আমি ছাড়াও তো অনেক ছাত্র ছিল। তারা সবাইকে বলেছে।

ক্লাসে সহপাঠীদের মধ্যে কারা ছিল?

আসিফ, মৃদুল, আকিব, মাকসুদ, রূপন্তী এরা ছিল।

মিটিংয়ের পরিস্থিতি কেমন ছিল?

মিটিং প্রথমে ভালোই ছিল।

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলো কীভাবে?

বাইরে চার-পাঁচ হাজার লোক জড়ো হয়। কেউ কন্ট্রোল করতে পারছিল না।

মিটিংয়ে স্কুল পরিচালনা কমিটির কেউ কি প্রধান শিক্ষককে ধমক বা আক্রমণ করেছিল?

না।

তাহলে?

বাইরে থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবক এবং এলাকাবাসী আক্রমণ করে। অনেক মহিলাও ছিলেন।

উত্তেজিত মানুষেরা কী করলো?

প্রথমে (হেড স্যারকে) হালকা চড়-থাপ্পড় দিয়ে শার্টের কলার ছিঁড়ে ফেলে কয়েকজন। স্যার ভয়ে টেবিলের নিচে গিয়ে আশ্রয় নেন। এরপর (সংসদ সদস্য) সেলিম ওসমান স্যার এসে তাকে নিয়ে যান।

সেলিম ওসমান তো অনেক পরে আসেন। এর আগে আর কী হয়েছিল?

হ্যাঁ, এমপি স্যার পরে এসেছেন। এর আগে উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও, ইউনিয়ন চেয়ারম্যানসহ অনেক নেতা এসেছেন। তবে পুলিশ না এলে স্যারের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যেত।

আপনি তো স্কুলের প্রধান শিক্ষকের রুমে শুরু হওয়া বৈঠকে পুরো সময়টা রুমের মধ্যে ছিলেন?

হ্যাঁ, ছিলাম।

এমপি সাহেব আসার পরে কী হলো?

এমপি সাহেব (স্যারকে) বললেন, ‘ছেলেটাকে তুমি শুধু শুধু মারছ কেন? ধর্মের ব্যাপারে এই ধরনের মন্তব্য করছ কেন?’

আর কী করলেন?

এমপি স্যার কয়েকটা চটকানা দিলেন। কিন্তু এলাকাবাসী দাবি জানাচ্ছিল যে, মাস্টারকে আমাদের হাতে তুলে দেন। ওরে ফাঁসি দিতে হবে না হয় জুতার মালা গলায় দিয়ে গ্রাম ঘোরাতে হবে।

এমপি সাহেবের চটকানা দেওয়ার পরে কী হলো?

চটকানা দিয়ে এমপি স্যার তাকে বাইরে নিয়ে গিয়ে কান ধরে ওঠবস করিয়ে পুলিশের কাছে দিয়ে দিলেন। রুম থেকে বের হওয়ার আগে হেড স্যার এমপি সাহেবকে বলছিলেন, ‘আপনি যে বিচার করবেন আমি সেটা মেনে নেব।’

শ্যামল কান্তির সঙ্গে কমিটির লোকদের কোনো সমস্যা ছিল?

কমিটির লোকদের মধ্যে কোনো সমস্যা দেখিনি। স্যারের একটু মেন্টাল সমস্যা আছে মনে হয়। অনেক ছাত্র-ছাত্রীকে স্যার বেত দিয়ে পিটিয়েছেন। মাথায় মনে হয় একটু সমস্যা আছে। আমার জ্যাঠাতো বোন রুপালির হাতে বেতের বাড়ি দিয়ে চামড়ার ছাল তুলে ফেলছিলেন একবার।

এ ঘটনা এখন কত বড় হয়েছে আপনি বুঝতে পারছেন?

বুঝতেছি।

এখন কী চান আপনি ?

ধর্মের কটূক্তির বিচার চাই। আমাকে মারার বিচারও চাই।

কিন্তু, ম্যানেজিং কমিটির কাছে করা আবেদনে তো ধর্মের অবমাননার বিষয়ে আপনারা অভিযোগ করেননি। এখন করছেন কেন?

স্যার আমাদের বাড়িতে এসে আম্মার কাছে মাফ চেয়েছিলেন। এই কারণে দরখাস্তে সেটা লিখিনি। আমার সামনে এসএসসি পরীক্ষা, স্যারের হাতে অনেক ক্ষমতা, এটা ভেবে আমার দুলাভাই (সাদেক) ধর্মের বিষয়টা উল্লেখ করতে না করেছিলেন। এ ছাড়া সহপাঠীরাও বলছিল যে, তুমি মারের বিচার চাও, আমরা ধর্মের বিষয়ে একসাথে বলব।

এর আগে নাকি আপনি অস্বীকার করেছেন যে, হেড স্যার ধর্ম কটূক্তির কথা বলেননি?

প্রথম দিকে মিডিয়ার বিভিন্ন লোকজন দশ-বিশবার আমাদের বাড়িতে আসত। ধর্ম নিয়ে কটূক্তির কথাটা আমি তাদেরকে বলি কিন্তু তারা (মিডিয়া) তুলে ধরে না।

একাত্তর টিভি আমাকে জিজ্ঞেস করছিল তুমি কি মাইকিং করছিলা? আমি বলি, না। তুমি কি লোকজন নিয়ে গিয়েছিলে? বললাম, না। এই কথাটাই ওই কথাটার (ধর্মের অবমাননা) সঙ্গে ভাঁজ খাইয়ে ওই ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।

আমি যখন কথা বলছিলাম তখন এলাকার অনেক লোক ছিল। তারা শুনছে। আর যত মিডিয়া আসছে তাদের কেউ সত্যটা প্রকাশ করছে না।

যে ব্যাপারটা আমি বলি সেটা প্রকাশই করে না। টিভিতেই দেখায় না। খেতে-ঘুমাতে পর্যন্ত পারতাম না। মিডিয়া এত জ্বালিয়েছে। এমপি ও হেড স্যারের ঘটনায় মিডিয়া সত্য প্রকাশ করছে না।

সরকারের পক্ষ থেকে কেউ আপনার সঙ্গে কথা বলেছেন?

হ্যাঁ। সরকারি লোকজনও এসেছিলেন। তাদের কাছে রূপন্তী, মাকসুদ, আসিফ, রাহিম রমজান এবং আমি সব বলেছি। এটা পরে কী হলো বুঝতে পারলাম না।

হেফাজতের সমাবেশে কীভাবে গেলেন?

নারায়ণগঞ্জ ডিআইটি মসজিদের খতিব আওয়াল সাব যোগাযোগ করে নিয়েছেন।

সেলিম ওসমান সাহেবের পক্ষ থেকে কেউ যোগাযোগ করে আপনাদের সঙ্গে?

না, তাদের পক্ষ থেকে কেউ যোগাযোগ করেনি।

খোঁজ নেই উত্তম কুমারের …

ওই দিনের ঘটনায় ছাত্রদের বাইরে একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন বিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক উত্তম কুমার গুহ। রিফাত হাসানের সাক্ষাৎকার শেষে কল্যান্দি গ্রামের উত্তম কুমারের বাসায় গিয়ে তালা মারা পাওয়া যায়। দুই তলা বিল্ডিংয়ের পাশের ফ্ল্যাটে উত্তম কুমারের প্রতিবেশী হাবিবুর রহমান মিঠুর সঙ্গে কথা হয়।

মিঠু বলেন, গত বৃহস্পতিবার (১৯ মে) থেকে উনি বাসায় নেই। কোথায় গিয়েছেন তা আমাদের বলে যাননি।

মিঠুর স্ত্রী জানান, সাংবাদিক গোয়েন্দা সবাই খালি উনার কাছে আসে। এই যন্ত্রণায় মনে হয় বাসা ছেড়ে গেছেন। ভয়ও পেতে পারে।

সূত্র- দ্য রিপোর্ট

Related posts