September 21, 2018

হিযবুতের শতাধিক সশস্ত্র কিলার মাঠে!

ঢাকাঃ  গত বছর ভিডিও কনফারেন্স করার পর থেকে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীর আত্মগোপনে চলে গেছে। তাদের প্রকাশ্যে কোন কার্যক্রম নেই। তবে ভিডিও কনফারেন্সে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা। হিযবুতের প্রায় ১০ হাজার সদস্য এই ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নিয়ে রক্তাক্ত বিপ্লবের জন্য শপথ নেয়। বিপ্লব ঘটাতে ইতিমধ্যে তাদের শতাধিক কর্মী সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়েছে। এরাই এখন দেশে গুপ্তহত্যা চালাচ্ছে বলে একটি গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। এদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে শিবিরের ‘রগকাটা’ গ্রুপের কয়েকজন বিক্ষুব্ধ কর্মীও। এছাড়া অন্য একটি গোয়েন্দা সংস্থা হিযবুত তাহরীরের পলাতক সশস্ত্র কর্মীদের তালিকা করেছে। জামিন পেয়ে পলাতক সংগঠনটির মোট সাড়ে ৪শ’ কর্মীর কোন খোঁজ নেই বলে তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাম্প্রতিককালে দেশে ব্লগার, শিক্ষক, বিদেশি নাগরিক, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, সেবক, লেখক, প্রকাশক, পুলিশ পরিবারের সদস্য এবং হিন্দু ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীর মানুষ খুনের সঙ্গে শুধু জেএমবি নয়; নেপথ্যে শিবিরের ‘রগকাটা’ গ্রুপের সঙ্গে হিযবুত তাহরীরও জড়িত রয়েছে বলে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন। তিনি মনে করেন, হিযবুতের সশস্ত্র দলের প্রত্যেক সদস্যই প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনেক চৌকস। এই প্রযুক্তিগত জ্ঞান দিয়েই তারা গোপন অপারেশন চালাচ্ছে। এছাড়া একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এসব খুনের ঘটনা তদন্তকালে নিশ্চিত হয়েছে যে এ ধরনের টার্গেট কিলিং মিশন শুধু জেএমবি’র মতো জঙ্গি সংগঠনের পক্ষে একা করা সম্ভব নয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (প্রশাসন) মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘হিযবুত তাহরীরের জামিনপ্রাপ্ত সদস্যরা আন্ডারগ্রাউন্ডে আছে। দেশে সাম্প্রতিক হত্যাকান্ডের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি।’

গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১১ সালের ২০ ডিসেম্বর ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান চেষ্টার অন্যতম পরিকল্পনাকারী মেজর (বরখাস্ত) সৈয়দ মো. জিয়াউল হক বর্তমানে হিযবুত তাহরীরের সশস্ত্র গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার সঙ্গে সেনাবাহিনীর বিপদগামী চাকরিচ্যূত ছয় কর্মকর্তাও যোগ দিয়েছেন। বিদেশে অবস্থান করে মেজর (বরখাস্ত) জিয়ার মাধ্যমে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ও আনসার-আল-ইসলাম নামে জঙ্গি সংগঠন দিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করার প্রমাণ পেয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

এ ব্যাপারে র্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে.কর্নেল আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমরা হিযবুত তাহরীরের পলাতক নেতাকর্মীদের ব্যাপারে সন্ধান করছি।’ গত ৭/৮ মাসে হিযবুতের প্রকাশ্যে কোন কার্যক্রম নেই এমন তথ্যের সত্যতা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘তারা প্রকাশ্যে না করলেও আত্মগোপনে থেকে জঙ্গি কার্যক্রম চালাচ্ছে-এ ব্যাপারে খোঁজ নেয়া হচ্ছে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০০৯ সালের ২১ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হিযবুত তাহরীরের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পর থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক, বুয়েটের একজন শিক্ষক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ শিক্ষকসহ সংগঠনটির প্রায় সাড়ে ৬শ’ নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়। অবশ্য এদের মধ্যে সাড়ে ৪শ’ই জামিনে বেরিয়ে গেছে। জানা গেছে, হরকাতুল জিহাদ বা জেএমবি’র সদস্যরা বোমা, অস্ত্র ও জিহাদী বইসহ গ্রেফতার হয়। সে ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোতে জোড়ালো অভিযোগ থাকে। কিন্তু হিযবুত তাহরীরের সদস্যরা লিফলেট বিতরণ অথবা মিছিল করতে গিয়ে গ্রেফতার হয়। ফলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো অপেক্ষাকৃত দুর্বল হওয়ায় তারা আদালত থেকে দ্রুত জামিন পেয়ে যায়।

গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে বলা হয়েছে, জামিন পাওয়া হিযবুতের অনেক সদস্যের খোঁজ মিলছে না। তারা নিয়মিত মামলাগুলোতেও আদালতে হাজিরা দিচ্ছে না। এদের মধ্যে শিবলী আহমেদ, করিম জাহিদ, জাহিদুর রহমান রবিন, সৈয়দ মোহাম্মদ গালিব, সৈয়দ মুস্তাফিজ, সোলায়মান, আমীর হামজা, আতাউল্লাহ রাফি, সামির খান, ফামিদুর রহমান, কাজী মেহেদী, ওয়ায়িজ মাহবুব, জুলহাস বিশ্বাস, ইদ্রিস, সুজাজিত হোসেন, শহীদুল ইসলাম, দেওয়ান কামরুল, জামিলুর ইসলাম, সামিউল শহীদ, নাইমুল আরিফ, মজিবুল হোসেন, রবিউল ইসলাম , রিসাদ খান, ফয়সাল, হাবিবুর রহমান ওরফে সুজন, মাকসুদুর রহমান ওরফে রনি, মেহরীয়র হক, আফরোজ অপু, কামরুজ্জামান বাচ্চু , সোহান হাফিজ , সোহেল রানা , মোর্শেদুল আলম সুজন , সাইফ মাহমুদ , আবু সুফিয়ান শিপু, নূরুজ্জামান চৌধুরী মাসুম , কামরুল হাসান, মহসিন, মীর নজরুল ইসলাম, আব্দুল জব্বার রাজিব, রোকনুজ্জামান রোকন, শাহিনুল ইসলাম সজল , সাদেকুল ইসলাম ভূঁইয়া, জুয়েল আহম্মেদ , মনিরুজ্জামান লাভলু, রাব্বি মিয়া, ফয়সাল আহমেদ, এমএ আজিজ রতন, এফএ সাফফাত রহমান ফাহিম, আব্দুল­াহ মোহাম্মদ শাহিন, নাঈম আল মামুন, সাজ্জাদ হোসাইন, তাহমিদ আফসারী আকিক, ফারাবী আহমেদ রসি, এসএম শামসুল হুদা অমিত, নজমুল হক, ফুয়াদ মোহাম্মদ আব্দুল মুইজ, ফারহাবী ইসলাম সিয়াম, সাকিব আল হাসান, আব্দুল­াহ আল ফারুকী, শরিফুল ইসলাম, মামুনুর রশিদ, মোস্তফা মিনহাজ, সাখাওয়াত হোসেন, মামুনুর রশিদ আনসারী ও শাহজালাল মিয়াসহ অন্তত সাড়ে ৪শ’ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে ওই রিপোর্টে।

জানা গেছে, গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে হিযবুত তাহরীর অনলাইনে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সম্মেলন করে। মাত্র ২ ঘন্টার ওই সম্মেলনে অন্তত ১০ হাজার হিযবুত সদস্য অংশ নেয়। র্যাবের গোয়েন্দা শাখা তদন্ত করে দেখতে পেয়েছে যে ওই ১০ হাজার সদস্যই ভুয়া আইডি খুলে সম্মেলনে অংশ নেয়। পরবর্তীতে তাদের আর শনাক্ত করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

এ প্রসঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন সময়ে হিযবুত তাহরীর প্রকাশিত লিফলেটগুলোতে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবের আহবান জানানো হয়েছে। অনলাইনে ভিডিও কনফারেন্সেও তারা নিজেদের মধ্যে রক্তাক্ত বিপ্লব ঘটানোর আহবান জানায়। এই বিপ্লবে অংশ নিতে হলে পরিবার-পরিজন থেকে দূরে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ভিডিও কনফারেন্সে অংশগ্রহণকারীরা উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজের বিত্তশালী পরিবারের সদস্য। তারা বিভিন্ন সময়ে মিশর, তুরস্ক, লিবিয়া, সিরিয়া, লেবানন, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও তিউনিশিয়া কেন্দ্রিক হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে অনলাইনে যোগযোগ করেছে-এমন প্রমাণও পাওয়া গেছে।

আরেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, সশস্ত্র বিপ্লবের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে দেশে মানুষ খুনের ঘটনা বাড়তে থাকে। প্রতিটি খুনের ঘটনার পর এ ঘটনা আইএস করেছে-এমন বিবৃতিও দেওয়া হয়। এসব বিবৃতির সবগুলোই বিদেশ থেকে টুইট করা হয়েছে। হিযবুতের একটি পরিকল্পনাকারী গ্রুপ বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছে। এদের মাধ্যমেই এসব খুনের ঘটনার স্বীকারোক্তি দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।ইত্তেফাক

Related posts