September 26, 2018

হারিয়ে যাচ্ছে টিএসসির গৌরব!

স্টাফ রিপোর্টারঃ  দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি (ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র) ও এর আশপাশের এলাকার গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এই এলাকাটিতেই গড়ে তোলা হচ্ছে ‘সাংস্কৃতিক বলয়’। কিন্তু গেল বইমেলায় বিজ্ঞানলেখক অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা, বর্ষবরণে নারীর শ্লীলতাহানির মতো জঘন্যতম ঘটনায় ম্লান হয়েছে এই এলাকার গৌরব।

তা ছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রোজকার ছিনতাই-চাঁদাবাজির ঘটনা, প্রকাশ্যে মাদক সেবনসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড সংস্কৃতিবান্ধব এই এলাকার গৌরবকে করছে কলঙ্কিত। দীর্ঘদিন ধরে যে-এলাকাটি ছিল মুক্তমনা মানুষের অবাধ বিচরণের জায়গা, প্রশাসনের নিরব ভূমিকায় সে-স্থানটিই হয়ে উঠছে ভীতিকর।

গত ১৪ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমিতে বুদ্ধিজীবী দিবসের আলোচনায় এমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী দুঃখ করে বলেছেন, ‘আমরা সমস্যার গভীরে প্রবেশ করতে পারিনি বলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী নির্যাতন, হত্যা, ছাত্র-শিক্ষকের সমন্বয়হীনতাসহ অসংখ্য অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। আর এসবের কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা শিক্ষিত মানুষের বস্তিতে পরিণত হচ্ছে।’

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রগতির সহযাত্রী হিসেবে টিএসসি’র সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো দেশের ক্রান্তিকালে এগিয়ে এসেছে। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রায় ৪৭ বছর পর ১৯৬৮ সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত হয় টিএসসি। মধুর ক্যান্টিন যেমন ছাত্র-আন্দোলনের সূতিকাগার, তেমনি স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলন থেকে শুরু করে এখনও সকল আন্দোলনে টিএসসির ভূমিকা রয়েছে সামনের সারিতে। শুধু টিএসসিই নয়, এর আশপাশের এলাকাও গৌরবের স্থান।

নানা ঘটনায় হতাশা জানালেও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘বাঙালি সংস্কৃতির বিরোধিতা করে যারা, তারাই বর্ষবরণের দিন টিএসসি এলাকায় নারীকে শারীরিকভাবে নিগৃহীত করেছে। ওরা দেখাতে চায়, বর্ষবরণে গেলে নারীদের লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। ভবিষ্যতে এখানে যেন নারীরা না আসে। কিন্তু এটা তো কখনওই হবে না। আগামী নববর্ষে মানুষ এবারের দ্বিগুণ হবে।’

তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ প্রশাসনের নিরব ভূমিকা খুব হতাশব্যঞ্জক। অভিজিৎ-হত্যার সময়ও পুলিশ কাছাকাছিই ছিল। প্রশাসন কেন নিরব তা কিছুতেই বোধগম্য নয়। আমি খুব হতাশ।’

টিএসসির রয়েছে সুদীর্ঘ গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। টিএসসি’র প্রথম পরিচালক এ জেড খানের (আমানুজ্জামান খান) পৃষ্ঠপোষকতা ও আন্তরিক সহযোগিতায় অল্প সময়েই প্রশস্ত হয় সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে কার্যক্রম শুরু হলেও ৫২-র ভাষা আন্দোলনের পর ৫৬ সালে গঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক সংসদ।

আর এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে টিএসসিতে কার্যক্রম শুরু করে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন। আবৃত্তি, নাটক, নাচ ও গানের সংগঠন মিলিয়ে প্রায় পঞ্চাশটির অধিক সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানে।

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে নাট্যচক্র, আরণ্যক, ঢাকা পদাতিক ও ঢাকা থিয়েটার নাট্যচর্চা শুরু করে এখানে। ওই সময়ে দেশের নাট্যাঙ্গনে নাটকের এই দলগুলো নিজেদেরকে মেলে ধরে সৃজনশীল ও নান্দনিকভাবে। সত্তরের দশকে নাটকের দল প্রতিষ্ঠার পর আশির দশকে আবৃত্তি সংগঠনগুলো তাদের কার্যক্রম শুরু করে টিএসসিকে কেন্দ্র করে।

সাগর লোহানী, নাঈমুল ইসলাম খান, আলী রিয়াজ ও আমানউদ্দৌলা এই চারজন মিলে ৮৩-তে গঠন করেন আবৃত্তি সংগঠন ‘স্বরশ্রুতি’। এর পরের বছর ওয়াহিদুল হক, নরেন বিশ্বাস, মীর বরকত, বিপ্লব বালা ও গোলাম সারোয়ার মিলে প্রতিষ্ঠা করেন আবৃত্তি সগঠন ‘কণ্ঠশীলন’।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘সন্ধ্যার পর তো এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাওয়াই যায় না। কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা আছে। কিন্তু সন্ত্রাসী না রুখে উল্টো নিষেধাজ্ঞা তো ব্যক্তি স্বাধীনতার লঙ্ঘন। কোনো শিক্ষিত মানুষ তা মেনে নিতে পারে না।’

টিএসসিতে যে সংগঠনগুলো বিগত কয়েক দশক ধরে সংস্কৃতিচর্চা করে যাচ্ছে সেগুলোর মধ্যে আবৃত্তি সংগঠনগুলো হলো বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, কণ্ঠশীলন, স্বরশ্রুতি, চারুবাক, চারুকণ্ঠ, প্রজন্ম কণ্ঠ, বৈকুণ্ঠ, মুক্তধারা ইত্যাদি।

সঙ্গীত-সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদ, সত্যেন সেন শিল্পী গোষ্ঠী, ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, বহ্নিশিখা, স্ব-ভূমি, বঙ্গবন্ধু শিল্পী গোষ্ঠী, রৌদ্র করোটি ইত্যাদি।

নাটকের দলের মধ্যে রয়েছে ঢাকা পদাতিক, পদাতিক নাট্য সংসদ টিএসসি, লোক নাট্যদল টিএসসি, দৃষ্টিপাত নাট্য সংসদ, দৃষ্টিপাত নাট্যদল ইত্যাদি। এ ছাড়াও রয়েছে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর অভিভাবক সংগঠন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, জাতীয় কবিতা পরিষদ, পথনাটক পরিষদ ইত্যাদি।

টিএসসি এলাকাকে পরিকল্পিতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে স্বাধীনতাবিরোধী পক্ষ বর্বর ঘটনার জন্ম দিচ্ছে, এমনটা জানিয়ে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, ‘বাঙালির যেকোনো অর্জনেই টিএসসি এলাকায় এসে মানুষ জড়ো হয়। এই এলাকায়ই রয়েছে ঐতিহাসিক সোহারাওয়ার্দী উদ্যান, স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বর, অপরাজেয় বাংলাদেশের মতো বিজয়চিহ্নগুলো। এসব তাদের পরাজয়ের জায়গা। তারা মনে করে, এই এলাকাটিকে যদি কলঙ্কিত করা যায়, তাহলে মানুষ আর এখানে আসবে না। এই এলাকাটিকে যত বেশি প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করা যায়, ততই তাদের লাভ। কিন্তু আমরা তা হতে দেব না।’

পরাজিত শক্তিরা যাতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, টিএসসি ও এর আশপাশের এলাকায় যাতে আর কোনো কলঙ্কের দাগ না পড়ে সেজন্য সরকারের প্রতি কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষেরা। তারা মনে করেন, টিএসসি কালিমালিপ্ত হওয়া মানে দেশ ও জাতি কালিমলিপ্ত হওয়া। আর এ ব্যাপারে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন, এমনটাই আশা করেন তারা।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts