September 26, 2018

হাজার রাতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ সে রাত

রহমত ও মাগফেরাতের সিঁড়ি পেড়িয়ে গোটা মুসলিম উম্মাহ নাজাতের শেষ দশক অতিবাহিত করছে । মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তার বান্দাহের প্রতি বিশেষত উম্মতে মোহাম্মাদীর প্রতি রমযান মাস অপার অনুগ্রহের পয়গামবাহী । কুরআনে কারীম ও পবিত্র হাদীস শরিফের উদ্ধৃতি দ্বারা রমযান মাসে গুরুত্ব প্রমাণিত । বিশেষত মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য রমযানের শেষ দশক পরম করুনাময়ের অবারিত সুযোগ উম্মোচিত হয় । কেননা রমযানের শেষ দশদিনের সাথে ইসলামের অনেকগুলো বিশেষ অনুষ্ঠান সম্পর্কীত । ই’তিকাফ পালন, লাইলাতুল ক্বদর উপহার, জুমাআতুল বিদা, ফিতরা ও যাকাত আদায় এবং রোযা সমাপান্তে খুশির ঈদের আগমন ঘটে নাজাতের দশকে এবং তৎপরবর্তীতেই । মানবতার মুক্তির দিশারী হযরত মুহাম্মদ সা. রমযানের এ সময়টাতে সর্বদা ইবাদাতে মশগুল থাকতেন এবং তার সকল অনুসারীদেরকেও বেশি বেশি ইবাদাত করার নির্দেশ দিয়েছেন । তবে এ সময়ের সকল ইবাদাতকে ছাপিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে হাজারের মাসের শ্রেষ্ঠ রাত তথা লাইলাতুল ক্বদরের রাত । মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরআন মাজীদে লাইলাতুল ক্বদরের পরিচয় এবং এ রাতের স্বতন্ত্র মর্যাদা বর্ণনা করে আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় বন্ধু এবং বন্ধুর সকল অনুসারীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা (ক্বদর) অবতীর্ণ করেছেন । বর্ণিত আছে, হযরত মুহাম্মদ সা. তার অনুসারীদের কল্যান নিয়ে সর্বদা চিন্তিত থাকতেন । তার ভাবনা ছিল, অন্যসকল নবী-রাসূলগণের অনুসারীগণ দীর্ঘ জীবন লাভ করেছে । এদের মধ্যে কারো উম্মত হাজার, আটশ কিংবা পাঁচশ বছর জীবনকাল লাভ করেছে । এই দীর্ঘ সময়ে তারা অগণন পূণ্য অর্জনের অবারিত সুযোগ লাভ করেছে । অথচ নবী মোস্তাফা সা. এর অনুসারীরা জীবনকাল লাভ করে মাত্র ৬০-৭০ বছর কিংবা তার চেয়ে কিছুটা কম বেশি । এই অল্পসময়ে আমাদের কম পূণ্য লাভের এবং পরকালীন মুক্তির চিন্তায় আমাদের প্রিয় মহামানব তথা মানবতার জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরিত হযরত মুহাম্মদ সা. এর দুশ্চিন্তা দূরীকরণ কল্পে সাম্যের প্রভূ ঘোষণার মাধ্যমে উপহার দিলে লাইলাতুল ক্বদরের রাত । যাদের ভাগ্যে এ রাতের সাক্ষাৎ নসীব হবে তারা হাজার মাসে ইবাদাত করলে যে পরিমান পূণ্য পেত তা মাত্র এক রাতের ইবাদাতেই পাবে ।  প্রতি বছর রমযান মাসের শেষ দশকের বেজোড় রাত্রির মধ্যে এমন একটি রাত্রিকে লুকায়িত রাখা হয়েছে যে রাত্রে, আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্বদর অবতীর্ণ করা হয় । তবে আল্লাহ তায়ালা কিংবা তার প্রিয় বন্ধু উম্মতের জন্য এ রাতকে নির্ধারিত করে দেননি, যাতে উম্মতে মোহাম্মাদী এ রাতের সাক্ষাৎ লাভের অভিপ্রায়ে ইবাদাতে মশগুল হয় । ইচ্ছাকৃত এ গোপনীয়তার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাহের পূণ্য লাভের মানসিকতা ও কর্মতৎপরতার পরীক্ষা নিতে চান ।

লাইলাতুল ক্বদরের পরিচয় এবং এ রাতের মর্যাদা বর্ণনা করে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি এ কোরআন অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত(ক্বদর) রজনীতে । (হে নবী) মহিমান্বিত রজনী সম্পর্কে আপনি জানেন কি ? মহিমান্বিত রজনী হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ । প্রত্যেক কাজে সে রাতে ফেরেশতাগণ ও জিব্রাঈল অবতীর্ণ হয় তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে । ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত সে রজনী শান্তিপ্রসূ ও নিরাপত্তা ।’(সূরা ক্বদর)। ইসলামিক স্কলাররা লাইলাতুল ক্বদরকে আরও কয়েকটি নামে অবহিত করেছেন । যেমন-লাইলাতুল হুকুম, লাইলাতুল রহমান, লাইলাতুল ক্বাদা, লাইলাতুল মাগফিরাহ, লাইলাতুল মুবারাকা, এবং লাইলাতুল জায়িযাহ । মানবতার মুক্তির দিশারী হযরত মুহাম্মদ সা. তার উম্মতদের উদ্দেশ্যে শবে ক্বদরের দিক-নির্দেশনা দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা রমযানের শেষ ৭ দিনে লাইলাতুল ক্বদর অনুসন্ধান করিবে’ । সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা রা.  থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, ‘লাইলাতুল ক্বদর হলো রমযানের ২৭ অথবা ২৯ তারিখ’ । তিনি আরও বলেন, ‘তোমরা রমযানের শেষ দশকে লাইলাতুল ক্বদর অন্বেষণ করো’ ।  বিশ্বনবী আরও বলেন, লাইলাতুল ক্বদর ২৯, ২৭,২৫ কিংবা ২৩ তারিখেও হতে পারে । উম্মাহাতুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী সা. যখন রমযানের শেষ দশকে প্রবেশ করতেন তখন নিজের লুঙ্গি শক্তভাবে বেঁধে নিতেন অর্থ্যাৎ ইবাদাতের প্রতি খুব মনোনিবেশ করতেন । এ রাতে তিনি জাগ্রত থাকতেন এবং নিজ পরিবারবর্গকে জাগিয়ে দিতেন । হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রা. হযরত মুহাম্মদ সা. এর কাছে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর নবী, যদি আমি লাইলাতুল ক্বদর পেয়ে যাই তবে কি বলব’ ? রাসূল সা. এর উত্তরে বললেন, বলবে হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমাকে ভালোবাসেন, আমাকে ক্ষমা করে দিন’ । সুনান আত তিরমীযি-৩৫১৩ । হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. কে বলতে শুনেছি, লাইলাতুল ক্বদর উপস্থিত হলে মহান আল্লাহ তায়াল বলেন- হে আমার বান্দা, আমার কাছে প্রার্থণা কর, আমার সম্মান-মর্যাদার শপথ, আজ তোমার আখেরাতের জন্য যা কিছু প্রার্থণা করবে, আমি তোমাদের তাই প্রদান করবো । আর তোমাদের দুনিয়ার জন্য যা কিছু প্রার্থণা করবে সে দিকেই আমি দৃষ্টি দিব । আমার সম্মানের কসম, তোমাদের পাপসমূহ গোপন রাখা হবে, যেহেতু তোমরা আমাকে পর্যবেক্ষক হিসেবে গ্রহন করেছো । আমার জাতের কসম, তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করা হলো । তোমরা আমাকে সন্তুষ্ট করেছো বলে আমিও তোমাদের উপর সন্তুষ্ট ।  যে সমস্ত বৈশিষ্ট্য উপস্থিত থাকলে বোঝা যাবে সে রাত ক্বদরের তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, রাতটি পরিস্কার ও উজ্জ্বল হবে ।  রাতটি নাতিশীতোষ্ণ হবে । টিপটিপ বৃষ্টি হতে পারে । রাতের আবহাওয়া হবে ভারসাম্যপূর্ণ ।

বিশেষ কয়েকটি কারনে লাইলাতুল ক্বদরের রাত্রি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ । এসকল কারনের মধ্যে বিশেষ কয়েকটি হচ্ছে-১.লাইলাতুল ক্বদরের রাতে সমগ্র কোরাআনে হাকীম লাউহে মাহফুজ থেকে প্রথম আসমানে নাজিল করা হয়েছে । ২. এ রাতের ইবাদাদ হাজার মাসের ইবাদাতের চেয়েও উত্তম ।৩. এ রাতে মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করা হয় । লাইলাতুল ক্বদরের রাত ইবাদাত ও সওয়াব হাসিলে মোক্ষম রাত হওয়ায় এ রাতে প্রত্যেক মুসলিমকে কিছু বিষয় অনুসরণ করতে এবং কিছু বিষয় বর্জন করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে । পালনীয় কাজগুলোর মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে-ক. ফরয নামাজ ঠিক সময়ে দলবেঁধে আদায় করা । খ.কিয়ামে লাইলাতুল ক্বদর করা অর্থ্যাৎ তারাবীর নামাজ আদায় করা । গ. লাইলাতুল ক্বদরের রাতে বেশি বেশি তওবা-এস্তেগফার, জিকির, তাসবীহ-তাহলীল, কুরআন পাঠ ও প্রার্থণা করা ।  এ বরকতময় রজনীতে বর্জনীয় বিষয়গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ইবাদাত বান্দেগীর চেয়ে অনুষ্ঠানমালা নিয়ে বেশি মাতামাতি ত্যাগ ও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় না করা । খাওয়া-দাওয়ার এমন আঞ্জাম না করা যাতে ইবাদাতে মানুষের মনোসংযোগ বিনষ্ট হয় । অশ্লীলতা ও বেহায়াপণা পরিত্যাগ করা । অবশ্য যা কিছু খারাপ ও অকল্যানকর তা সর্বদাই পরিত্যাজ্য ।

লাইলাতুল ক্বদর রাত ইসলামের একটি অতীব গুরত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যমণ্ডিত ইবাদাতের সময় হওয়ার পরেও আমাদের সমাজের কিছু লোক এ ইবাদাতের সুফল থেকে বঞ্চিত হবে । বস্তুত তারা পূর্ণরাত্রি ইবাদাতে কাটালেও আল্লাহর রাসূলের ঘোষাণা অনুযায়ী তারা এ রাত দ্বারা মোটেও উপকৃত হবে না । হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেছেন, হযরত মুহাম্মদ সা. ইরশাদ করেছেন, লাইলাতুল ক্বদর উপস্থিত হলে প্রত্যেক মু’মিন পুরষ ও মহিলার উপর ফেরেশতাগণ সালাম প্রেরণ করেন । তবে মদ পানকারী, শুকরের গোস্ত ভক্ষনকারী এবং জাফরানের সুগন্ধি ব্যবহারকারীর নিকট ফেরেশতাদের সালাম পৌঁছে না অর্থ্যাৎ তারা ফেরেশতাদের দোয়া থেকে বঞ্চিত হয় । অন্য এক হাদীসে এসেছে, বিশ্বনবী সা. বলেছেন, পিতামাতার অবাধ্য সন্তান, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ও বিদ্বেষীর প্রতি ফেরেশতাগণ সালাম প্রেরণ করেন না । এরা সর্বদাই আল্লাহর ফযিলত ও রহমত থেকে  বঞ্চিত থাকেন । তবে যদি তারা আল্লাহর কাছে তওবা করে তবে আল্লাহ তায়ালা তাদের তওবা কবুল করতে পারেন ।

নিঃসন্দেহের লাইলাতুল ক্বদরের রাত আল্লাহ প্রিয় বন্ধুর অনুসারীদের জন্য এক পরম পাওয়া । এ রাত ঘুমিয়ে কাটানোর রাত নয় । ইসলামকে যারা পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে ধারন করে তাদের প্রত্যেকেরই এ রাতে আল্লাহ তায়ালার ইবাদাত বান্দেগীতে কাটানো উচিত । আল্লাহ তায়ালা তাদেরকেই ভালবাসেন, মানুষের মধ্যে যারা তার কাছে বিনীত । কাজেই যে রাতগুলোর ব্যাপারে আল্লাহর রাসূলের নির্দেশ দিয়েছেন সে রাতগুলোতে বেশি বেশি আল্লাহর ইবাদাতে মশগুল থাকা প্রতিটি মুসলিম নর-নারীর ঈমানী দায়িত্ব । অধিকাংশ আলেমের মতে, ২৭ শে রমাযান দিবাগত রাত্রিতে লাইলাতুল ক্বদর হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি । কাজেই বিশ্বনবীর নির্দেশ মত ২৭ শে রমাযান জামা’আতের সাথে এশার নামায আদায় থেকে শুরু করে সারা রাত্র আল্লাহর ইবাদাত করে এবং তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে যাতে জামাতের সাথে ফযরের নামায আদায় করতে পারি তার চেষ্টা করা উচিত । সর্বোপরি আল্লাহর কাছে সব সময় বেশি বেশি দোয়া প্রার্থনা করতে থাকব, যাতে আমাদের ভাগ্যে লাইলাতুল ক্বদর উপস্থিত হয় এবং এ রাতে ইবাদাত করার মাধ্যমে আমরা হাজার রাতে ইবাদাত করার সমতুল্য সওয়াব অর্জন করতে পারি । হে আল্লাহ, আমাদের ভাগ্যকে প্রশস্থ ও সুপ্রসন্ন করে দিন ।

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।

Related posts