November 17, 2018

হল্‌ট, না হয় ব্রাশফায়ার করবো

24 Mar, 2016, মতিউর রহমানঃঃ বাংলাদেশ তখন অশান্ত, অস্থির। খাদ্য সংকটে কাবু দেশ। এর মধ্যে প্রতিবিপ্লবীরা পরিস্থিতিকে উসকে দিচ্ছে। গণবাহিনী গুপ্তহত্যা শুরু করেছে। রক্ষীবাহিনীও অ্যাকশনে। এক ভীতিকর পরিবেশ। আতঙ্ক গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। এর মধ্যে বিশেষ ক্ষমতা আইন জারি হয়েছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব। সংবাদমাধ্যম সতর্ক। এক ধরনের আহাজারি। বিপ্লবী দমনের নামে লালঘোড়া মাঠে। রাস্তাঘাটে ক্ষুধার্ত মানুষের মিছিল। জনস্রোত শহরমুখী। অনাহারে মৃত্যুর খবর সংবাদপত্রের পাতায়। তবে নিয়ন্ত্রিত। দুর্ভিক্ষে লক্ষাধিক মানুষ মারা গেল। সরকারি নেতারা যুক্তরাষ্ট্রকে এ জন্য দায়ী করতে লাগলেন। কিউবায় পাট রপ্তানির খেসারত নাকি দিতে হয়েছে বাংলাদেশকে। কথিত মতে, খাদ্যবাহী একটি জাহাজের গতি নাকি ঘুরিয়ে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। যদিও এর কোন দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।

এই দুর্ভিক্ষ যে তৈরি করা হয়েছিল এ নিয়ে অবশ্য সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। নেতৃত্বের ভুল না আন্তর্জাতিক রাজনীতির বলি তা এখন অবধি পরিষ্কার হয়নি। আজকের বাংলাদেশ দেখে যদি ’৭৪-এর পরিস্থিতির সঙ্গে মিল খুঁজতে চান তাহলে তিনি বলবেন, পাগল নাকি! তখন গড়ে প্রতিদিন ৮৪টি লাশ দাফন করতো আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম। এটা ছিল কেবলমাত্র ঢাকার পরিস্থিতি। বাইরের খবর তেমনটা সংবাদপত্রে আসতো না। সেপ্টেম্বর মাসে বায়তুল মোকাররমে অ্যাসাইনমেন্ট কাভার করতে গিয়ে এক লজ্জাকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলাম। দুই শতাধিক উলঙ্গ, অর্ধ উলঙ্গ নারী-পুরুষ মিছিল করছিল। এদের একটি দাবি- ভাত চাই, ভাত দিতে হবে। কারা এদেরকে গ্রাম থেকে এনেছিল তখন জানার চেষ্টা করেও সফল হইনি।

এর পেছনে যে রাজনীতি ছিল তা বলার কোনো অপেক্ষা রাখে না। তখনই অবশ্য পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য ৪৩০০ লঙ্গরখানা খোলার সিদ্ধান্ত আসে সরকারের তরফে। চালের সের যখন ৭ টাকা তখন চাঞ্চল্যকর এক খবর দেয় দৈনিক ইত্তেফাক। খবরে বলা হয়, মানুষ যখন অনাহারে মারা যাচ্ছে তখন ২১ লাখ টাকার বিদেশি মদ ও সিগারেট আমদানি করা হয়েছে। বাসন্তীর ছবি ছেপে তো ইত্তেফাক শোরগোল বাঁধিয়ে দেয়। শফিকুল কবিরের রিপোর্ট আর আফতাব আহমেদের জালপরা বাসন্তীর ছবি নিয়ে পরে গবেষণা হয়েছে। ১লা নভেম্বর ’৭৪ বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধকল্পে কবি, লেখক, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, চিত্রশিল্পীসহ সমাজের নানা স্তরের মানুষের এক সমাবেশ ডাকা হয়। এই সমাবেশে হাজির ছিলেন ড. আহমদ শরীফ, মীর্জা গোলাম হাফিজ, এনায়েত উল্লাহ খান, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, বদরুদ্দীন উমর, কামরুন্নাহার লাইলীসহ অনেকেই। সমাবেশে বক্তারা বলেন, ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষ ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষকে ছাড়িয়ে গেছে। সর্বদলীয় রিলিফ কমিটি গঠনের কথাও বলা হয়। ট্রাস্টের পত্রিকা হলেও পূর্বদেশে তা ছাপা হতো। তখন তো প্রয়াত কবি রফিক আজাদ ‘ভাত দে হারামজাদা তা না হলে মানচিত্র খাবো’ কবিতা লিখে চারদিকে হইচই ফেলে দেন। অনেক কবিতা লিখলেও তিনি এই একটি কবিতার জন্য বিখ্যাত হয়েছিলেন।

আশার কথা, এতসবের পরও আওয়ামী লীগ তার যথাযথ সম্মান দিয়েছে। শবযাত্রায় বাদ সাধেনি কেউ। গান স্যালুটও পেয়েছেন। সৌভাগ্যবান বটে। আমার ডিউটি প্রতিদিন আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামে কত বেওয়ারিশ লাশ দাফন হয় তার খবর দেয়া। প্রতিদিনই মৃত্যুর খবর লিখতে লিখতে একদিন চিফ রিপোর্টারকে বললাম, অন্য অ্যাসাইনমেন্ট দিলে ভালো হয়। চিফ রিপোর্টার বললেন, আজ হয়তো খারাপ লাগছে। একদিন ভালো লাগবে। বুঝতে পারিনি কি বলতে চেয়েছিলেন। ‘যখন রিপোর্টার ছিলাম’ এই রোজনামচা লিখতে গিয়ে মনে হয় এটাই তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন। আমি কোনোদিন ভাবিনি ডায়েরি লিখবো। অনেক পাঠক বলছেন আগে সবকিছু লেখা ছিল। এখন প্রতিদিন একটা করে দিচ্ছি। তা ঠিক নয়। সম্পূর্ণ স্মৃতি থেকে লিখছি। এ জন্য কিছু ভুল ত্রুটিও থেকে যাচ্ছে। পূর্বদেশের স্মৃতি আমাকে কাঁদায়, হাসায়। জীবনের মোড় নেয়া অনেক কিছু ঘটেছিল সে সময়। কবি হেলাল হাফিজ। ১৯৬৯ সালে ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ লিখে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেছিলেন।

বলে রাখা ভাল, একটি কবিতার বই লিখে একজন কবি জনমানুষের কাছে পৌঁছে যাবার নজির বোধকরি খুব কমই আছে। যা হোক, পূর্বদেশে আমার সহকর্মী। শুধু একসঙ্গে কাজ করি তা নয়। এক সঙ্গে ঢাকা স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলাও দেখি গ্যালারিতে বসে। প্রেস ক্লাবে খাওয়া-দাওয়া করি এক সঙ্গে। রাতে বাড়ি ফেরার স্কুটারেও নিত্যসঙ্গী। একদিন রাত পৌনে দুটো। কাজ শেষ। স্কুটারে উঠলাম দুজনই। গন্তব্য সার্জেন্ট জহুরুল হক হল। গেটের সামনে গিয়ে দেখি গোটা এলাকা অন্ধকারে ডুবে আছে। বিদ্যুৎ আসে, বিদ্যুৎ যায়, এটা নিত্যদিনের ঘটনা। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। স্কুটার দ্রুতগতিতে চলছে। গেটের কাছে থামতেই মনে হচ্ছে কোথায় যেন গোলমাল। তখনও বুঝতে পারিনি বিপদ সামনে। স্কুটার থেকে গেটের সামনে আসতেই চিৎকার করে বলে উঠলো ‘হল্‌ট, না হয় ব্রাশফায়ার করবো’। আচমকা এই আওয়াজে কাঁপন উঠলো সারা শরীরে। একজন টর্চলাইট মেরে দেখলো আমরা কারা। আমার চেহারা পরিচিত নয়। কবিকে সবাই চেনে। মুখে দাড়ি। কাঁধে ঝোলা। বেশভূষাই আলাদা। স্টেনগান নিয়ে একজন কাছাকাছি এলো। তিনজন পাশে দাঁড়িয়ে। সবার হাতেই অস্ত্র। আমরা দুজন হাত তুললাম। এর মধ্যে একজন কবি হেলাল হাফিজকে চিনলো।
আরে আপনারা। জানেন না হল পরিস্থিতি।
না, কি হয়েছে।

মুজিববাদীদের আমরা হল থেকে হটিয়ে দিয়েছি। এই এলাকা এখন বৈজ্ঞানিক ছাত্রলীগের দখলে।
আমরা দুজন সাংবাদিক। ডিউটি করে ফিরলাম।

বুঝতেই পারছি কবিকে দেখে। ঠিক আছে, ভেতরে যান। স্টেনগানধারীকে তখন চিনতাম না। ভয় কাটলো। তবুও রাতে ঘুম এলো না। বারবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরছি। কবিকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানালাম। বললাম, দাড়ি আর ঝোলা না থাকলে তো আজ দুজনই খতম হয়ে যেতাম। কে এই যুবক? যে স্টেনগান দিয়ে ব্রাশফায়ার করতে চেয়েছিল। ওকে তো কখনও দেখিনি। সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ছিল বৈজ্ঞানিক ছাত্রলীগধারীদের সদর দপ্তর। এখান থেকেই তাদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হতো। অনেকদিন হয়ে গেল। মনেও নেই। কি ঘটেছিল বা ঘটতে যাচ্ছিলো সে রাতে। নানা অভিজ্ঞতার পর সত্তর দশকের শেষ ভাগে যখন সংবাদে কাজ করছি তখন চিনলাম। অস্ত্রধারী সে যুবকটি কে ছিল। নাম তার শফিকুল আলম কাজল। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সংবাদে সে আমার সহকর্মী হয়েছিল। এক সঙ্গে রিপোর্টিং করেছি অনেক দিন। একদিন কথায় কথায় সে বলেছিল তার ওপর নির্দেশ ছিল ব্রাশফায়ার করার। তাদের কাছে নাকি খবর ছিল মুজিববাদী ছাত্রলীগ পালটা হামলা চালাতে পারে। স্কুটারে করে অস্ত্র আনা হচ্ছে এই খবর নাকি কারা তাদের দিয়েছিল। এ কারণে গুলি ছোড়ার নির্দেশ ছিল। কবির ঝোলা না থাকলে নিশ্চিত করে বলতে পারি সেদিন অন্য কিছু হতে পারতো। মানে কি? ব্রাশফায়ার। হতে পারতো। খোলাখুলি স্বীকারোক্তি। এবারও বেঁচে গেলাম তাহলে।

কাজল বললো, রাখো না এসব। এটাতো এখন অতীত। এবার নিয়ে তিনবার হলো। গুলির হাত থেকে বাঁচলাম। ’৭১ সালের ২৬শে মার্চ সকালে। আরেকবার ’৭২ সালের ২০শে ডিসেম্বর। মৌলভীবাজার সরকারি হাইস্কুলে মাইন বিস্ফোরণে যে ২৩ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছিল তাদের পাশে হয়তো আমার নাম লেখা হতো। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছি। কে যেন ম্যানেজার স্টল থেকে মিষ্টি নিয়ে এসেছে। অনেক দিন পর পুরনো বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে মাত্র ৫ মিনিট আগে ক্যাম্প ছেড়েছি। অল্প দূরে হেলাল টেইলারিং। এখানেই আড্ডা দিতাম। চেয়ারে বসতে না বসতেই বিকট শব্দ। মুহূর্তেই সব শেষ। ২৩ জন অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাকে আমরা হারালাম। যারা নয় মাস জানবাজি রেখে লড়াই করে দেশ স্বাধীন করেছিল। অনেক স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফিরেছিল বীরের বেশে। এমনই দুর্ভাগ্য মা-বাবা, আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গেও তারা দেখা করতে পারলো না। শহীদ ফলকে নাম ছাড়া রাষ্ট্র তাদের জন্য আর কী করেছে?
(চলবে)

Related posts