September 25, 2018

হঠাৎ সরব বিএনপি, দফায় দফায় বৈঠক

ঢাকাঃ সরব হয়ে উঠেছেন বিএনপির সংস্কারপন্থি নেতারাবিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার পর থেকেই সরব হয়ে উঠেছেন সংস্কারপন্থি বলে পরিচিত দলের বাইরে থাকা নেতারা। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে কমিটিতে বঞ্চিত আর বিক্ষুব্ধ অংশটিও। বৈঠকের পর বৈঠক করে নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করছেন। জাতীয়তাবাদের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে করণীয় নির্ধারণ করছেন। দলের হাইকমান্ডের আশ্বাসের পর পঞ্চম এরপর ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল শেষেও তাদেরকে দলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলে বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছেন দলের বাইরে থাকা এক সময়ের হেভিওয়েট নেতারা। এরপরও তারা যোগাযোগ রাখছেন বিএনপির হাইকমান্ডের সঙ্গে। এমন নাজুক পরিস্থিতিতে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা করছেন। এরপরও ফলপ্রসূ কোনো সম্ভাবনা দেখা না গেলে যে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিকল্পনা নিয়েও এগুচ্ছে সংস্কারপন্থি নেতারা। এমনটাই জানা গেছে ওই সব নেতার সঙ্গে আলাপকালে।

সূত্র জানায়, বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয় ৬ আগস্ট। বিশাল আকারের নতুন কমিটিতে দুই একজন ছাড়া সংস্কারপন্থিদের বেশিরভাগ নেতারই ঠাঁই হয়নি। এ কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন দলের বাইরে থাকা শতাধিক সাবেক এমপি-মন্ত্রী, নেতারা। এখন নিজেদের করণীয় জানতে চেয়ারপার্সনের কাছে চিঠি দেবেন তারা। চিঠির কোনো সাড়া না পাওয়া গেলে নেতাকর্মীদের নিয়ে নতুন দল গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।

জানা গেছে, ১/১১ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০০৭ সালের ২৫ জুন বিএনপির মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া দলের অভ্যন্তরে ১৫ দফা সংস্কার প্রস্তাব দিলে এর প্রতি দলের ১২৭ সাবেক মন্ত্রী-এমপি তাকে সমর্থন দেয়। সেই থেকে ওই অংশটিকে সংস্কারপন্থি বলে বিএনপিতে চিহ্নিত। সংস্কার প্রস্তাবের পর খালেদা জিয়া গ্রেফতারের পূর্ব মুহূর্তে দলের মহাসচিব আবদুল মান্নান ভুঁইয়া, যুগ্ম মহাসচিব আশরাফ হোসেন, দফতর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে বহিষ্কার করেন। সে সময় দলের মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ পান প্রয়াত খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন।

ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন আর নানা চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্যেও বিএনপিকে ছেড়ে যাননি একসময়ে দলের গুরুত্বপূর্ণ এসব নেতা। এরপর সবাইকে নিয়ে কমিটি হবে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার এমন আশ্বাস বাস্তবায়নের অপেক্ষায় ছিলেন সংস্কারপন্থি নেতারা। কিন্তু ৬ আগস্ট তাদের আশা ভঙ্গ হয়। এরপরই সিদ্ধান্ত হয় খালেদা জিয়াকে চিঠি দেয়া হবে। সারাদেশে বঞ্চিত ও ক্ষুব্ধ নেতাদের বক্তব্যও এই চিঠিতে জুড়ে দেয়া হবে। এ লক্ষ্যে কয়েক নেতা কাজও শুরু করেছেন। এদিকে প্রত্যাশিত পদ না পাওয়ায় দলের বিক্ষুব্ধ অংশটি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছেন। পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে বারিধারার একটি বাসায় কয়েক দফায় বৈঠকও করেন তারা।

সংস্কারপন্থি ইস্যুতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, সংস্কারপন্থীরা অন্য দলে যাননি। এমনকি ২০০৮ সালের নির্বাচনেও তারা দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে চলেছেন। ২০০৯ সালের কাউন্সিলের পর সংস্কারপন্থী কিছু নেতা দলে নেয়া হলেও এবার বাকিদের নেয়া হয়নি। যদিও দলের চেয়ারপার্সন তাদের নেয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, এবার সুন্দর একটা কাউন্সিল হয়েছে। সেখানে চেয়ারপার্সন একটা রূপরেখা ঘোষণা করলেও সে অনুযায়ী কমিটি হয়নি। ঘোষিত কমিটিতে অনেক দুর্বলতা ও অসঙ্গতি রয়েছে। যোগ্যতার ভিত্তিতে পদ দেয়া উচিত ছিল। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তা করা হয়নি। সংস্কারপন্থি হওয়ার কারণে দলে যাদের জায়গা হয়নি, তারা তো বিকল্প দল গঠন করতেই পারেন। তবে তাদের সঙ্গে দলের হাইকমান্ডের কথা বলা উচিত।

জানতে চাইলে বিএনপির সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক জহিরউদ্দিন স্বপন বলেন, এতে করে আমরা ক্ষুব্ধ, হতাশ। কারণ সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে দলকে একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থা দেখতে চেয়েছিলেন। যার ওপর ভিত্তি করে চেয়ারপার্সন ঘোষিত জাতীয় ঐক্য গঠন করা সম্ভব হতো। কিন্তু বাস্তব অবস্থা ভিন্ন। জাতীয় ঐক্য গঠনের বাধা এবং কমিটি গঠন প্রক্রিয়ার কোটারি একই সূত্রে গাঁথা। আমরা আশা করি, কমিটি গঠনে যেসব ভুল-ত্রুটি আছে তা সংশোধন করে জাতীয় ঐক্য গঠনের বাধা দূর করা হবে।

বিএনপি সূত্র জানায়, বিগত ওয়ান-ইলেভেনে দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ায় গত কমিটি থেকে ছিটকে পড়েন অনেকে। এদের মধ্যে অনেকেই অতীতের ভুল স্বীকার করে নতুন কমিটিতে পদ পাওয়ার জন্য জোর লবিং করেন। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াও বিভিন্ন সময়ে দলের ঐক্যের কথা বলেন। সবাইকে নিয়ে নতুন কমিটি করা হবে এমন আশ্বাসও দেন তিনি। সংস্কারপন্থিদের কোনো প্রক্রিয়ায় দলে ফেরানো যায় সে ব্যাপারে কয়েকজনকে দায়িত্বও দেয়া হয়। দায়িত্বপ্রাপ্তরা সংস্কারপন্থিদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকও করেন। তাদের কে কোন পদ পেতে পারেন এমন একটি খসড়া তালিকাও হয়। ওই তালিকায় আলোচনায় ছিলেন সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, মফিকুল হাসান তৃপ্তি, জহিরউদ্দিন স্বপন, দেলোয়ার হোসেন খান দুলু, জিএম সিরাজ, ডা. সালেক চৌধুরী, ইলেন ভুট্টো। কিন্তু নতুন কমিটিতে কারোরই জায়গা হয়নি।

এদিকে কমিটিতে বঞ্চিত ও প্রত্যাশা অনুযায়ী পদ না পাওয়া ক্ষুব্ধ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন সংস্কারপন্থিরা। তাদের প্রথম পছন্দের তালিকায় আছেন দলের প্রভাবশালী নেতা ও সামরিক সাবেক আমলারা। আগের নির্বাহী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলেও বিএনপির নতুন কমিটিতে তাদের জায়গা হয়নি ২৫ থেকে ৩০ নেতার। এদের মধ্যে আশি ও নব্বই দশকের সাবেক অনেক মেধাবী ছাত্রনেতা যেমন রয়েছেন তেমনি সামরিক বাহিনী থেকে আসা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও রয়েছেন। লে. কর্নেল (অব) শাহজাহান, মেজর (অব) জাবেদ, মেজর (অব) সারোয়ার, ক্যাপ্টেন কামরুল, ব্যারিস্টার ফখরুল অন্যতম। বিগত আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় থাকলেও কমিটিতে জায়গা হলেও পদোন্নতি পাননি মেজর (অব) মিজানুর রহমান, মেজর (অব) হানিফ প্রমুখ।

এ বিষয়ে ব্যারিস্টার মেজর (অব) সারোয়ার বলেন, আমি একাধারে রাজপথে থেকেছি আবার মিডিয়ার কল্যাণে জনমত গঠনে কাজ করেছি। আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার কারণে প্রায় ৬ মাস জেলও খেটেছি। মামলা-হামলায় যতটুকু না বিপর্যস্ত হয়েছি তার থেকেও বেশি কষ্ট পেয়েছি নতুন কমিটিতে আমার কোনো স্থান না থাকায়। কোন প্রক্রিয়ায় কিভাবে নেতা বাছাই করা হয়েছে তা এখনো বুঝতে পারছি না।

সংস্কারপন্থি অংশের এক নেতা অনেকটা ক্ষোভ এবং হতাশার সুরে বলেন, আমরা ২০০৯ সালের কাউন্সিলের পর থেকে অপেক্ষা করছি। এর মধ্যে সুযোগ পেলেও ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে হাত মিলাইনি। গত কমিটির মতো এবারো আমাদের জায়গা দেয়া হয়নি। আমাদের অপরাধটা কি? আর কত অপেক্ষা করতে হবে। আমরা কি মরে গিয়ে প্রমাণ করব যে, আমরা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ আছি।

এ নেতা বলেন, খালেদা জিয়ার দলে যদি একেবারেই জায়গা না হয়, তাহলে আমরা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেব না। প্রয়োজনে বিকল্প রাজনৈতিক দল গঠন করে শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শে দল গঠন করব। নতুন কমিটিতে জায়গা না হওয়া বিএনপির সব ত্যাগী, বঞ্চিত ও ক্ষুব্ধ নেতাকেও ওই দলে জায়গা দেয়া হবে।

Related posts