September 24, 2018

স্বৈরাচার পতনের ২৫বছর পরও কি গণতন্ত্র পেয়েছি?

সূফি বরষণ: ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালের এই দিনে —স্বৈরাচার পতন দিবস। এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক তাৎপর্যময় দিন। দেশব্যাপী তীব্র গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের এই দিনে সামরিক স্বৈরাচার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হন। অনেক মৃত্যু এবং দীর্ঘ রক্তাক্ত পথ অতিক্রম শেষে এই ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে বাংলাদেশের বুকে চেপে থাকা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ৯ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান হয়। শুরু হয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অগ্রযাত্রা।

গতকাল রোববার ছিল স্বৈরাচার এরশাদ সরকার পতনের দিন । আজ থেকে ২৫ বছর আগের এই দিনে ৬ ডিসেম্বর, ১৯৯০ গণতন্ত্রকামী মানুষের গণঅভুত্থানের মুখে রাষ্ট্রপতির আসন থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন সেনাশাসক স্বৈরাচার এরশাদ। তবে বিগত সাধারণ নির্বাচনের আগে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ স্বৈরাচারী এরশাদের সঙ্গে গাটছড়া বাঁধার পর থেকে গত সাত বছর যাবৎ এ দিনটিতে কোনো কর্মসূচি পালন করছে না। নব্বাইয়ে দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে ৪ ডিসেম্বর রাতে এরশাদ অনেকটা নাটকীয়ভাবে তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী পদত্যাগের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।

এরই ধারাবাহিকতায় পরদিন (৫ ডিসেম্বর) সব রাজনৈতিক দলের অনুরোধে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ শর্তসাপেক্ষে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। আর ১৯৯০ সালের এই তারিখে (৬ ডিসেম্বর) আনুষ্ঠানিকভাবে এরশাদ পদত্যাগ করেন এবং বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের এই দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে ’৯০-এর ঐতিহাসিক গণআন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে। অবসান ঘটে দেশব্যাপী শ্বাসরু্দ্ধকর পরিস্থিতির। শুরু হয় নতুন রাজনৈতিক পদযাত্রা। কালের আবর্তে এরপর কেটে গেছে ২২টি বছর। এই দীর্ঘ সময়েও বাস্তবায়ন হয়নি তিন জোটের সেই ঐতিহাসিক রূপরেখা। বরং দুটি বড় রাজনৈতিক দলের আপসকামী মনোভাবের কারণে স্বৈরাচারী এরশাদ ও তার দল জাতীয় পার্টি দেশের রাজনীতিতে বেশ ভালোভাবেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। সময়ের আবর্তে জাতীয় পার্টি এখন ক্ষমতাসীন মহাজোটের অন্যতম শরিক এবং দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদেরসহ অনেক নেতা বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও অন্যান্য পদে আছে। আর গত ৫ জানুয়ারি ২০১৪ সালের ভোটার বিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে পতিত স্বৈরাচার এরশাদের পার্টিকে করা হয়েছে সংসদের বিরোধী দল॥ অন্যদিকে ২০১০ সালে বছর উচ্চ আদালত এক রায়ে জেনারেল এরশাদকে অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং তাকে শাস্তি দেয়ার ভার সংসদ এবং সরকারের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু পতিত সামরিক স্বৈরাচারী হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বর্তমান ফ্যাসিবাদী সরকারের একজন দোসর হওয়ায় সরকার তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

১৯৯০ সালের এই দিনে ভয়েস অব আমেরিকার (ভোয়া) বাংলা বিভাগ বাংলাদেশের সর্বশেষ অবস্থা বিষয়ে ভোয়া’র দক্ষিণ এশিয়া ব্যুরোর সংবাদদাতা পিটার হাইমলাইনের একটি প্রতিবেদন এবং তত্কালীন সাতদলীয় জোটনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার একটি সাক্ষাত্কার সম্প্রচার করেন। সাক্ষাত্কারটি তুলে ধরা হলো—
বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে বেগম জিয়ার সাক্ষাত্কার ভিওএ কর্মী কাফি খান টেলিফোনে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলেছেন।

তার বিবরণ:

কাফি খান : বাংলাদেশে প্রায় দু’দিনে দেশের রাজনৈতিক মঞ্চে যে নাটকীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, আপনাদের আন্দোলন সফল হতে চলেছে, তার ফলে কি দেশ থেকে জরুরি অবস্থা সম্পূর্ণ উঠে গেছে?
খালেদা জিয়া : দেখুন, আমরা আন্দোলন করছিলাম দেশে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। এ আন্দোলন এমন একধাপ এগিয়েছিল, যখন আমরা আমাদের লক্ষ্য ছিল এই সরকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা আমাদের কর্মসূচি অব্যাহত রাখব। আমরা আমাদের কর্মসূচি দিয়েছিলাম, যতদিন না পর্যন্ত এরশাদশাহি পদত্যাগ করবে। এরই ধারাবাহিকতায় আন্দোলন এমন এক অবস্থার মধ্যে পরিণত হলো, তখন এরশাদ কারফিউ দিল। সে ভেবেছিল যে, এতে বোধহয় সে জনগণকে, তাদের আন্দোলনকে স্তব্ধ করবে, কিন্তু সেটা সে করতে পারবে না, ব্যার্থ হলো।
কাফি খান : জেনারেল এরশাদ কখন ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন বলে আপনারা আশা করছেন?
খালেদা জিয়া : তারা ঘোষণা দিয়েছে যে আগামী শনিবার পার্লামেন্ট ডাকা হবে এবং সেখানে হস্তান্তর করবে সংবিধান ধারা অনুযায়ী।

কাফি খান : এরপরে, ক্ষমতা হস্তান্তর-পরবর্তী পর্যায়ে আপনারা কী করবেন? নির্বাচনের ডাকটা কে দেবেন? যিনি ক্ষমতা হাতে নেবেন, আপনাদের মনোনীত যার হাতে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন, তিনি কী নির্বাচনের দিন তারিখ ঘোষণা করবেন?
খালেদা জিয়া : নির্বাচনের দিন তাখির ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।
কাফি খান : আপনারা নির্বাচনে যাবেন, তা কীভাবে সেটা?
খালেদা জিয়া : নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হলে আমরা অবশ্যই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব।
কাফি খান : আপনার ৭ দল মিলে এ নির্বাচনে প্রতিন্দ্বন্দ্বিতা করবেন, নাকি বিএনপি এককভাবে?
খালেদা জিয়া : সেগুলো তো পরের ব্যাপার।
কাফি খান : বাংলাদেশে অতীতকাল থেকে একটা ধারা চলে আসছে যে, যে দল ক্ষমতায় থাকে তাদের বাইরে কারও বক্তব্য টেলিভিশন বা রেডিও’তে সুযোগ থাকবে না। তো সেই ধারার কি পরিবর্তন হবে বলে আপনারা মনে করছেন?
খালেদা জিয়া : আমরা আশা করি, বিশেষ করে আমি বলতে চাইছি যে, সে সুযোগ থাকা উচিত সকলেরই।
অন্যদিকে ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা পতিত সামরিক স্বৈরাচরী এরশাদের ক্ষমতা হস্তান্তরের পরদিন অর্থাত্ ৯০ সালের ৭ ডিসেম্বর ‘এরশাদের বিদায়’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনটির অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো :

এরশাদের বিদায়
শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট এরশাদ বিরোধী দলগুলির সব দাবিই মানিয়া লইলেন। তিনি কেবল পত্রপাঠ পদত্যাগ করিতেই সম্মত হন নাই, বিরোধী দলের পছন্দমতো ব্যক্তিকে অন্তর্বর্তীকালীন তদারকি সরকারের প্রধান হিসেবে নিয়োগ করিয়া জাতীয় সংসদ ভাঙিয়া দিয়া সাধারণ নির্বাচনের পথও প্রশস্ত করিয়া দিয়াছেন। বলা বাহুল্য, স্বেচ্ছায়, স্বতঃপ্রণোদিত হইয়া তিনি সরিয়া দাঁড়ান নাই। কোন স্বৈরাচারীই বা কবে তাহা করিয়াছে? তিনি সরিয়া দাঁড়াইলেন বাধ্য হইয়া, প্রবল গণআন্দোলনের চাপে পড়িয়া। বস্তুত, বাংলাদেশের চলতি রাজনৈতিক পরিস্থিতি এরশাদ বা তাঁহার সরকারের নিয়ন্ত্রণের একেবারেই বাহিরে চলিয়া গিয়াছে। এখন তাহার ইচ্ছা নিরপেক্ষভাবেই ঘটনার গতি জনসাধারণের অভিপ্রায় দ্বারা নির্ধারিত হইতেছে। এরশাদ চাহিলেও তাহার পক্ষে ক্ষমতা আঁকড়াইয়া থাকা সম্ভব নহে। তাহার শাসনের বিরুদ্ধে সঞ্চিত ক্ষোভ এমন বিস্ফোরণে ফাটিয়া পড়িয়াছে যে, এরশাদ ও তাহার দলের লোকেদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাই বিঘ্নিত হওয়ার উপক্রম। সেনাবাহিনীকে আজ এরশাদের বাসভবন পাহারা দিতে হইতেছে। এসবই জনশক্তির জয়। জনশক্তি জাগ্রত হইলে তাহা যে যে-কোনো শক্তিমান স্বৈরাচারীকেই নতজানু করিয়া ছাড়িতে পারে, আরো একবার তাহা প্রমাণ হইলো। প্রমাণ হইয়া গেল, সশস্ত্র বাহিনীর বন্দুকের নল নয়, জনগণই শক্তির উত্স।…

অর্থনৈতিক দুর্গতি, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দারিদ্র্য ও নিঃস্বতা, বর্তমান বেকারত্ব ছাড়াও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সেনানায়কের একদলীয় শাসন, প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনের অনুপস্থিতি, মৌলিক নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার ছাঁটাই বাংলাদেশের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে পরিপুষ্ট করিয়াছে। এই আকাঙ্ক্ষা যখন গণআন্দোলনের রূপ গ্রহণ করে এবং বিরোধী রাজনৈতিক জোট ও শক্তিগুলিকে অভিন্ন এরশাদ বিরোধী মঞ্চে ঐক্যবদ্ধ হইতে বাধ্য করে, তখনই এরশাদ সরিয়া দাঁড়াইতে বাধ্য হন। গত আট বছর ধরিয়া তাহার শাসন যে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে হস্তগত ক্ষমতাকে গণতান্ত্রিক বৈধতা দিতে ব্যর্থ হইয়াছে, তাহা এখন স্পষ্ট। ৮৬ ও ৮৮ সনে দুই দুইটি নির্বাচন করিলেও বাংলাদেশের জনগণ যে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন নাই এবং এরশাদকে যে তাঁহার নিজেদের প্রতিনিধি বলিয়া স্বীকার করেন না, তাহাও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানাইয়া দিলেন।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেই সময়ের সেনাবাহিনীর প্রধান এরশাদ সামরিক আইন জারি করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেন। এরশাদ বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর বর্তমান অবৈধ অগণতান্ত্রিক হাসিনাও স্বৈরাচার এরশাদের মতো আর এক নব্য স্বৈরাচার॥
স্বৈরাচার এরশাদের নেতৃত্বে ৮ বছর ৮ মাস বাংলাদেশ পরিচালিত হয়। একজন ব্যক্তির অধীনে টানা সবচেয়ে বেশিদিন শাসন পরিচালনার রেকর্ড এটি। ওই শাসনামলে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান চেষ্টা করে।

১৯৯০ সালের শেষের দিকে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলনের সঙ্গে দেশের প্রায় সকল সামজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এরশাদ হটানোর আন্দোলনে যোগ দেয়।

অক্টোবর মাস থেকেই উত্তাল হতে শুরু করে রাজপথ। ১০ অক্টোবর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচির মধ্য দিয়ে টালমাটাল রাজনীতির চূড়ান্ত অবস্থার সূচনা হয়।

১০ নভেম্বর বুকে-পিঠে গণতন্ত্র লিখে স্বৈরাচার হটানোর মিছিলে যোগ দিয়ে গুলিতে প্রাণ হারান নূর হোসেন, গুম করা হয় হুদা টিটোকে। ২৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে গুলি করে হত্যা করা হয় স্বৈরাচার বিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের নেতা ডা. শামসুল আলম খান মিলনকে।

এরপর দ্রুতই বদলাতে থাকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি। জনবিস্ফোরণমুখ গণ-অভ্যুত্থানের ভয়ে ৫ ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়ার ঘোষণা দেয় বাংলাদেশের ইতিহাসে অবৈধভাবে সবচেয়ে বেশিদিন ক্ষমতায় থাকা এরশাদ।
৬ ডিসেম্বর বিশেষ পরিস্থিতিতে হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর বাধ্য হন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

এরশাদের উত্থান-পতন, স্বেচ্ছাচারিতা এবং হত্যার রাজনীতি: জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। ১৯৮২ সালে ক্ষমতা দখল করে একটি সামরিক ফরমান (এমএলআর-৮২) জারি করেন এরশাদ। এতে আকারে-ইঙ্গিতে কেউ তার সামরিক শাসনের সমালোচনা-বিরোধিতা করলে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়। এরশাদের ক্ষমতা দখলের প্রতিবাদ শুরু হলে এই এমএলআর-৮২’র অধীনে রাজনৈতিক নেতাসহ হাজার হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয়। সামরিক স্বৈরাচারী এরশাদ দীর্ঘ নয় বছরের শাসনামলে আন্দোলন-সংগ্রাম ঠেকাতে অনেক জাতীয় রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতার করেন। অন্তরীণ করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপার্সন ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ওয়ার্কার্স পার্টি, গণফোরামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সিনিয়র নেতাদের কারারুদ্ধ করেন এরশাদ। বর্তমানে মহাজোট সরকারের মূল দল আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত আবদুস সামাদ আজাদ, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী সাহারা খাতুন, মহাজোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন প্রমুখও রেহাই পাননি।

রাজনৈতিক দলগুলো এরশাদের ক্ষমতা দখলকে প্রথমদিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা না করে অনেকটাই নীরবে মিলিটারি স্বৈরশাসন মেনে নিতে বাধ্য হন। রাজনৈতিক দলগুলো বিষয়টি মেনে নিলেও ছাত্ররা মেনে নেননি এই সামরিক অভ্যুত্থান। ক্ষমতা দখলের দিনই (২৪ মার্চ ১৯৮২) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ওইদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে পোস্টার লাগাতে গিয়ে বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর তিন সদস্য গ্রেফতার হন। ওই ছাত্রনেতারা হলেন শিবলী কাইয়ুম, হাবিবুর রহমান ও আবদুল আলী। পরে সংক্ষিপ্ত সামরিক আদালতে তাদের সাত বছরের কারাদণ্ড হয়। সেই থেকে শুরু হয় সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্রদের আপসহীন লড়াই। বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতারা ১৯৮২ সালের ২৬ মার্চের স্বাধীনতা দিবসে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিতে গিয়ে শহীদ বেদিতেই সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। মিছিলের খবর শুনে সাভার সেনানিবাস থেকে সেনাবাহিনী এসে স্মৃতিসৌধে ছাত্রদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালায়। সরকারি ফরমান ও তত্পরতার কারণে সে সময় সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়লেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে লাল-কালো অক্ষরে এরশাদের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে দেয়াল লিখন অব্যাহত থাকে। ছাত্রদের দেয়াল লিখন সমানে মুছতে থাকে সামরিক সরকারের তল্পিবাহক পুলিশ বাহিনী। পুলিশ যত দেয়ালে সাদা চুন টেনে মুছে ফেলে, ছাত্ররা ততই দেয়াল লিখন চালিয়ে যেতে থাকে। এভাবেই সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে চলছিল দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রামের প্রাথমিক প্রস্তুতি। এ সময় ছাত্রনেতারা একটি সর্বাত্মক গণতান্ত্রিক ছাত্র আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিলেন। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেয়া হয়। সেটাই ছিল সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম লিখিত প্রতিবাদ।

পতনের সিঁড়ি: সামরিক স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী প্রথম বড় ধরনের আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, যা মধ্য ফেব্রুয়ারির আন্দোলন হিসেবে পরিচিত। আর এদিন থেকেই শুরু হয় সামরিক স্বৈরাচার এরশাদ আমলের রক্ত ঝরার ইতিহাস। এদিন মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিল এবং সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন কাঞ্চন, জাফর, জয়নাল, আইয়ুব, দিপালী ও ফারুক। ১৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোজাম্মেল পুলিশের গুলিতে নিহত হন। ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম আহূত সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি সফল করতে ছাত্রদের একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল সকাল প্রায় ১১টার দিকে শিক্ষা ভবনের সামনে পৌঁছলে পুলিশ বাধা দেয়। ফলে ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে পুলিশ গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে তাত্ক্ষণিকভাবেই বেশ ক’জন নিহত হয়। নিহতদের ক’জনের লাশ গুম করে সরকার। বিকালে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা এবং বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও ঢাকা শহরে কারফিউ জারি করা হয়। একইসঙ্গে ওই সময় পুলিশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রাবাসে ঢুকে ছাত্রছাত্রীদের ওপর বেপরোয়া হামলা চালায় এবং ব্যাপকসংখ্যক ছাত্রকে গ্রেফতার করে। ছাত্র হত্যা এবং পুলিশি হামলার প্রতিবাদে পরদিন এ আন্দোলন জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দাবালনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ফলে পরদিন সরকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু সামরিক স্বৈরাচার এরশাদের শাসনামলে সংবাদপত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা এতটাই ব্যাপক ছিল যে, এই বিক্ষোভ এবং ছাত্রহত্যার ঘটনার বিষয়ে পরদিন কোনো পত্রিকায় সরকারের প্রেসনোটের বাইরে অন্য কোনো খবর প্রকাশ হতে পারেনি।

অবিরাম রাজনৈতিক হত্যা: এরশাদ তার দীর্ঘ ৯ বছরের শাসনামলে আন্দোলন-সংগ্রাম প্রতিহত করতে কত মানুষ হত্যা করেছে, তার সঠিক হিসাব নেই। তবে ১৯৮৩ সালের মতোই তার শাসনামলজুড়ে ছিল গণতন্ত্রকামী সংগ্রামীদের মৃত্যুর মিছিল।

১৯৮৪ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় হরতালের সমর্থনে মিছিল চলাকালে নিহত হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র দেলোয়ার হোসেন ও ইব্রাহিম সেলিম। ১ মার্চ সেলিম এবং ইব্রাহিম হত্যার প্রতিবাদে ৭ দল ও ১৫ দল হরতাল ডাকে। সেই হরতালে নিহত হন শ্রমিক তাজুল ইসলাম। ২৭ সেপ্টেম্বরের হরতালে ঢাকার কালীগঞ্জে নিহত হন রাজনৈতিক নেতা ময়েজ উদ্দিন। এদিন স্বপন কুমার, নেত্রকোনায় তিতাস ও অপর একজন নিহত হন। ঢাকায় পুলিশের গুলিতে এক রিকশাওয়ালা ও ফুটপাতের এক দোকানদার এবং ঢাকার বাইরে আরও দুজন নিহত হন। ২৪ নভেম্বর চুয়াডাঙ্গায় ফজলুর রহমান নামে একজন নিহত হন। ২২ ডিসেম্বর রাজশাহীতে মিছিলে নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয় হলের বাবুর্চি আশরাফ, ছাত্র শাজাহান সিরাজ ও পত্রিকার হকার আবদুল আজিজ।

১৯৮৫ : ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মিছিলে নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাউফুন বসুনিয়া। ১৯ মার্চ হরতাল চলাকালে এক কিশোরের মৃত্যু হয়। ২২ এপ্রিল মিছিলে বোমা হামলায় একজন, ৯ অক্টোবর তেজগাঁও পলিটেকনিকে ৪ জন, ৩০ অক্টোবর ছাত্রনেতা তিতাস, ৩১ অক্টোবর ঢাকার মিরপুরে বিডিআরের গুলিতে ছাত্র স্বপন ও রমিজ নিহত হন। ৭ নভেম্বর আদমজী জুট মিলে ধর্মঘটে হামলায় ১৭ শ্রমিক এবং বিডিআরের গুলিতে তিন শ্রমিক নিহত হন।
১৯৮৬ : ৭ মে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিহত হন ৫ জন। ১৪ মে হরতালে নিহত হন ৮ জন। ১৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রতিরোধ আন্দোলনে নিহত হন ১১ জন। ১০ নভেম্বর হরতাল চলাকালে ঢাকার কাঁটাবন এলাকায় শাহাদত নামে এক কিশোর নিহত হয়।

১৯৮৭ : ২২ জুলাই জেলা পরিষদ বিল প্রতিরোধ ও স্কপের হরতালে নিহত হন ৩ জন। ২৪ অক্টোবর শ্রমিক নেতা শামসুল আলম, ২৬ অক্টোবর সিরাজগঞ্জের লক্ষ্মীপুরে কৃষক জয়নাল, ১ নভেম্বর কৃষক নেতা হাফিজুর রহমান মোল্লা, ১০ নভেম্বর নূর হোসেন নিহত হন এবং ১১ নভেম্বর থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশের গুলিতে ছাত্রনেতা আবুল ফাত্তাহ, ছাত্র বাবলু, যুবনেতা টিটো, শেরপুরের আমিনবাজারে পুলিশের গুলিতে উমেছা খাতুন, গোলাম মোহাম্মদ আসলাম, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খোকন ও দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও তিনজন নিহত হন। এরপর ৫ ডিসেম্বর কক্সবাজারের চকরিয়ায় ছাত্রনেতা দৌলত খান নিহত হন।

১৯৮৮ : ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে শেখ হাসিনার জনসভায় আগত মিছিলে গুলিবর্ষণে নিহত হন ২২ জন। তারা হলেন—ক্ষেতমজুর নেতা রমেশ বৈদ্য, হোটেল কর্মচারী জিকে চৌধুরী, ছাত্র মহিউদ্দিন শামিম, বদরুল, শেখ মোহাম্মদ, সাজ্জাদ হোসেন, মোহাম্মদ হোসেন, আলবার্ট গোমেজ, আবদুল মান্নান, কাশেম, ডিকে দাস, কুদ্দুস, পঙ্কজ বৈদ্য, চান মিঞা, হাসান, সমর দত্ত, পলাশ, সবুজ হোসেন, কামাল হোসেন, শাহাদাত হোসেন। এ বছর ৩ মার্চ চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিরোধ আন্দোলনের সময় হামলায় ১৫ জন নিহত হন।
১৯৯০ : ১০ অক্টোবর সচিবালয়ে অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে পুলিশের বেপরোয়া গুলিতে ছাত্র জেহাদ ও মনোয়ার, হকার জাকির, ভিক্ষুক দুলাল, ১৩ অক্টোবর পুলিশের গুলিতে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র মনিরুজ্জামান ও সাধন চন্দ্র শীল, ২৭ অক্টোবর হরতাল চলাকালে ঢাকার বাইরে দুজন, ১৪ নভেম্বর আদমজীতে ১১ জন, ২৬ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চা দোকানদার নিমাই, ২৭ নভেম্বর ডা. শামসুল আলম মিলন, ২৮ নভেম্বর মালিবাগ রেলপথ অবরোধে দুজন, ৩০ নভেম্বর রামপুরায় বিডিআরের গুলিতে একজন, ১ ডিসেম্বর মিরপুরে ছাত্র জাফর, ইটভাঙা শ্রমিক আবদুল খালেক, এক মহিলা গার্মেন্ট কর্মী ও নুুরুল হুদাসহ সাতজন, আট মাসের শিশু ইমন, নীলক্ষেতে একজন, কাজীপাড়ায় দুজন এবং ডেমরার যাত্রাবাড়ীতে দুজন, চট্টগ্রামের কালুরঘাটে একজন, খুলনার খালিশপুরে মহাব্রজ, নারায়ণগঞ্জের মণ্ডলপাড়ায় এক কিশোর, ৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম ও চাঁদপুরে পুলিশের গুলিতে দুজন; ২৭ নভেম্বর থেকে ৩ ডিসেম্বরের মধ্যে ময়মনসিংহে দুজন, রাজশাহীতে দুজন, ধানমন্ডিতে একজন ও জিগাতলায় একজন নিহত হন।

স্বৈরাচার আসে স্বৈরাচার যায় কিন্তু দেশের মানুষ আর গণতন্ত্রের মুখ দেখে না॥

লেখকঃ

 

সূফি বরষণ, প্রবাসী সাংবাদিক ও অনলাইন একটিভিস্ট,

                            এবং

পরিচালক, মুক্তবুদ্ধি চর্চা কেন্দ্র। 

Related posts