September 19, 2018

সেরা হয়েও হাসতে পারছে না ফারজানা, কিন্তু কেন?

ঢাকাঃ  কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলার থানাহাট ইউনিয়নের রাজার ভিটা গ্রামের মুসলিম পরিবারের মেয়ে মোছা: রিনা বেগমের সাথে একই উপজেলার চিলমারী ইউনিয়নের বৈইলমন্দিয়ার খাতা গ্রামের মো: জমির মিন্টুর বিয়ে হয়। জমির উদ্দিনের রয়েছে একটি লন্ড্রির দোকান। এ ব্যবসা দিয়ে জীবন নির্বাহ করেন তিনি, রিনার ঘরে জন্ম নেয় ফারজানা। ব্রহ্ম নদ ভাঙনের পর একেবারে পথে বসেন জমির উদ্দিন। আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে কোনো উপায় না পেয়ে রমনা গ্রামের বাঁধ রাস্তাসংলগ্ন অন্যের ৪ শতক জমিতে বসবাস করছেন। আর জীবন বাঁচার তাগিদে পেশা হিসেবে বেছে নেন লন্ড্রির কাজ। বাঁধ রাস্তায় কোনো রকমে ঝুপড়ি তুলে তিনি লন্ড্রির কাজ করেন। যে টাকা আয় হয় তা দিয়ে খেয়ে না খেয়ে চলে তার সাত সদস্যের সংসার। এসব কষ্ট থেকে বাবাকে বাঁচাতে এবং সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে সচেষ্ট ফারজানা। তার মনে জেদ ছিল শত কষ্টের মধ্যেও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার। ক্ষুধার কী কষ্ট, গরিব ঘরে জন্ম নিয়ে ফারজানা তা বুঝতে শিখেছে ছোটবেলা থেকেই। সন্তানের আবদার মেটাতে না পেরে লজ্জিত বাবা ও মা কেন দু’হাতে মুখ লুকিয়ে কাঁদেন, তাও অনুভব করতে শেখে।

অনেক সময় উপোস থেকে এ মেয়েটি হাঁসির আড়ালে কান্না লুকিয়ে রাখে। আর পথ খুঁজে এসব বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়া। তার সেই ভাবনা সফল হয়েছে। সে এবার এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেয়েছে। তবে সেরাদের সেরা হয়েও সে হাসতে পারছে না। দারিদ্র্যের কারণে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় কাঁদছে ফারজানা। কাঁদছেন সহায় সম্বলহীন হতদরিদ্র বাবা-মা। ফারজানা অর্ধাহারে অনাহারে থেকেও বাড়ি থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে বিদ্যালয়ে যেত। নিতে হয়েছে অন্যের কাছ থেকে ধার করা সহায়ক বই। অন্যের সহযোগিতায় তাকে কিনতে হয়েছে খাতা-কলম। সকালের খাবার জুটলেও অন্য দু’বেলার নিশ্চয়তা নেই। তবে আছে সাফল্যের অদম্য স্পৃহা। প্রখর মেধার অধিকারী ফারজানা। সে বজরা দিয়ারখাতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে পিএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেনসহ উপজেলা মেধা তালিকায় ১১তম স্থান অধিকার করে।

২০১৩ সালে জেএসসি পরীক্ষায় চিলমারী উচ্চবিদ্যালয় থেকে গোল্ডেন জিপিএসহ উপজেলায় তৃতীয় স্থান অধিকার করে। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীর ট্যালেন্টপুল বৃত্তিও সে পায়। এবারে ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চিলমারী উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে গোল্ডেন জিপিএ পেয়ে সেই মেধার পরিচয় দিলো আরেকবার। ছোটবোন জাহানারা আক্তার ২০১১ সালে বজরা দিয়ারখাতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পিএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ ৫ এবং ২০১৪ সালে জেএসসি পরীক্ষায় চিলমারী উচ্চবিদ্যালয় থেকে গোল্ডেনসহ পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীর ট্যালেন্টপুল বৃত্তিও সে পায়।

ফারজানার বাবা জমির উদ্দিন জানান, বড় মেয়ে অষ্টম শ্রেণী পার হওয়ার পর বিপাকে পড়েন তিনি। মেধাবী এ মেয়েটিকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবেন কিভাবে? এ সময় সামান্য হলেও পাশে এসে দাঁড়ায় চিলমারী মেধাবী কল্যাণ সংস্থা। সংস্থা থেকে মেয়েটির লেখাপড়ার জন্য কিছু খরচ জোগান দেয়া হতো। কিন্তু এখন কী হবে সে চিন্তায় অস্থির হতদরিদ্র বাবা-মা। ফারজানা জানায়, স্যারদের পাশাপাশি মেধাবী কল্যাণ সংস্থার সহযোগিতায় এমন সাফল্য পাওয়া সম্ভব হয়েছে। মেধাবী কল্যাণ সংস্থার শিক্ষকেরা বিনা পয়সায় তাকে পড়িয়েছেন দীর্ঘ পাঁচটি বছর। বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও তাই। ফারজানার ইচ্ছা, সে ভবিষ্যতে একজন ডাক্তার হবে। কিন্তু কিভাবে? কে নেবে তার এ স্বপ্ন পূরণের ভার!নয়া দিগনত

Related posts