September 21, 2018

সিলেট-২ আসনে আগাম প্রচারণায় সরগরম রাজনৈতিক মাঠ

 

IMG_20180702_191019মো. আবুল কাশেম, বিশ্বনাথ  (সিলেট) প্রতিনিধি :: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সরগরম হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক মাঠ। দেশের বিভিন্ন সংসদীয় আসনের মতো সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর) আসনেও বইছে আগাম নির্বাচনী হাওয়া। ভোটের প্রস্তুতি নিয়ে প্রচারনা শুরু করেছে সরকারী দল আওয়ামী লীগ ও মাঠের বিরোধী দল বিএনপি। জাতীয় পার্টিও বসে নেই। এবার সদ্য সমাপ্ত ঈদুল ফিতর ঘিরে রাজনীতিবিদদের ভোটের রাজনীতি ছিল চোখে পড়ার মতো। নির্বাচন অনুষ্ঠানের কয়েক মাস সময় বাকি থাকলেও নির্বাচনী এলাকা সিলেট-২ আসনে নিজ নিজ দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতোমধ্যে নানা কর্মসূচীতে অংশ নিয়ে নিজেদের প্রার্থীতা জানান দিচ্ছেন। ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়ে অনেকেই ঝুলিয়েছেন ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার। আবার কেউ কেউ মসজিদ, মন্দিরে দান-খয়রাত ছাড়াও সামাজিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে দিয়েছেন। মোটকথা নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা ততই বাড়ছে। বাড়ছে মাঠ দখলের কৌশলও।

সংসদ নির্বাচনে রেখে এ আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ, সংসদে বিরোধী দল জাপা ও মাঠের রাজনীতিতে বিরোধী পক্ষ বিএনপি’র সম্ভাব্য প্রার্থীরা গণসংযোগ, প্রচার প্রচারনা ও সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগদান করে নিজেদের প্রার্থী হিসেবে জানান দিচ্ছেন। সেই সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে চলছে লবিং গ্রুপিং। তবে জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের ঐক্যজোট থাকায় কে কোনো দল থেকে মনোনয়ন দেয়া হবে তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। স্ব স্ব অবস্থান থেকে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রচার প্রচারনা চালিয়ে আসছেন।

অপর দিকে মাঠের রাজনীতিতে বিএনপি এককভাবে মাঠে চড়ে বেড়াচ্ছেন। এ আসনে বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগ অথবা জাতীয় পার্টির প্রার্থীর সঙ্গেই চুড়ান্ত লড়াইয়ের সম্ভাবনা। প্রার্থীরা এ আসনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গণসংযোগ, শোডাউন ও প্রচার প্রচারনা চালিয়ে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের দাবী এ আসনটি জোটের অন্য কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। কারণ দলীয় সকল কার্যক্রম পরিচালনা করতে হলে অবশ্যই এ আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে থাকা খুবই জরুরী। অন্য দিকে জাতীয় পার্টি মনে করেন এ আসনটি বর্তমানে জাতীয় পার্টির ঘাটি হিসেবে দখলে রয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী জাতীয় পার্টির টিকেটে ইয়াহইয়া চৌধুরী এহিয়া এমপি হয়েছেন। জাতীয় পার্টির টিকেটে এমপি নির্বাচিত হওয়ায় দলমত নির্বিশেষে সকলের কাছে ক্লিন ইমেজ সৃষ্টি করতে পেরেছেন এহিয়া। এমপি এহিয়া কেন্দ্রীয় জাতীয় পার্টির যুগ্ম-মহাসচিব নির্বাচিত হয়ে অন্যান্য সময়ের তুলনায় তাঁর নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি সুসংগঠিত।

এ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ কোন্দল রয়েছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী দুইজন আর বিএনপিতে একজন। বর্তমানে আসনটি জাপা’র দখলে। গত নির্বাচনে এই আসনে সংসদ সদস্য হন জাপা’র ইয়াইয়াহ চৌধুরীর এহিয়া। আগামী জাতীয় নির্বাচনে আসনটি আওয়ামী লীগের হাতে থাকছে, না কী জাপা (এরশাদ) সহ জোট হলে জাপাকেই ছেড়ে দেওয়া হবে? এই নিয়েই মূলত: আলোচনা রয়েছে এলাকার ভোটাদের মধ্যে। এবার এই আসনে আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থী আলোচনায়। বিএনপি’র একমাত্র প্রার্থী এবং জাপা’র বর্তমান সংসদ সদস্যকে ঘিরেই যত আলোচনা।

আলোচিতরা হলেন, বর্তমান সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় জাতীয় পার্টি যুগ্ম-মহাসচিব ইয়াইয়াহ চৌধুরী এহিয়া, জেলা আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি শফিকুর রহমান চৌধুরী, বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্ঠা ও নিখোঁজ ইলিয়াসপত্নী তাহসিনা রুশদি লুনা এবং যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী।

শফিক চৌধুরী ও আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী ইতিমধ্যে প্রার্থীতা ঘোষণা দিয়েছেন। তবে দল কাকে মনোনয়ন দেয় কেবল দেখার বিষয়। এই ইস্যুতে সরকারদলীয় এই সংগঠনটির কোন্দল আরো বাড়তে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনীতিকরা। এ আসনে আওয়ামী লীগ দুটি বলয়ে বিভক্ত রয়েছে। একটি শফিক চৌধুরী বলয় ও অপরটি আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বলয়। সিলেট-২ আসনে যেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়া হয় এই ইস্যুতে কেন্দ্রীয় ও জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা একই সুরে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও গণমাধ্যমে বক্তব্য দিচ্ছেন। তারা বলছেন,সিলেট-২ আসন আওয়ামী লীগের শক্তিশালী সংগঠন রয়েছে। এই আসন শরিকদের দেয়া যাবে না।

অপরদিকে, জোটের শরিক দল জাপা তাদের বিশ্বাস এ আসন ফের জাতীয় পার্টিকে দেয়া হবে। এমন বিশ্বাস নিয়ে তারাও লাঙ্গল প্রতিকে ভোট চাইতে শুরু করেছেন। জোটগত ভাবে নৌকা না লাঙ্গল প্রতিক নিয়ে এ আসনে নির্বাচন হবে এখনও বলা মুশকিল। আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী কিংবা জোটের শরিক জাপাকে এই আসন ছেড়ে দেয়া হলেও আওয়ামী লীগের বিভক্তির অবসান না হলে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী। বিএনপি’তেও অভ্যন্তরীণ কোন্দল রয়েছে।

সদ্য সমাপ্ত রমজান মাসে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি ইফতার মাহফিল আয়োজন করে। আর এসব ইফতার মাহফিল আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগ নেতারা দাবি করে আসছেন আগামী নির্বাচন সিলেট-২ আসনে নৌকা প্রতিক পাওয়া যাবে এবং নৌকা প্রতিকে ভোট প্রার্থনা করে আসছেন। জাতীয় পার্টিও তারা লাঙ্গল প্রতিক নিয়ে এ আসনে নির্বাচন করবেন বলে দাবি করে ভোট চাচ্ছেন।

অন্যদিকে, বিএনপির প্রার্থীর ইলিয়াসপত্নী তাহসিনা রুশদি লুনা ঈদুল ফিতরের পূর্বে ও শেষে তার নির্বাচনে এলাকায় অসুস্থ দলীয় নেতাকর্মীর আত্বীয় স্বজন দেখতে ছুটে যান ও বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। এসময় তাকে দলীয় নেতাকর্মীর মোটর শোভাযাত্রা নিয়ে শোডাউন দিতে দেখা যায়।

জানাগেছে, সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর) সংসদীয় আসনে আওয়ামী-লীগের প্রার্থী কে হচ্ছেন এ নিয়ে আলোচনার ঝড় বইছে বিশ্বনাথ উপজেলা জুড়ে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী নিয়ে অনিশ্চয়তায় দলের কর্মী ও সমর্থকরা। সাবেক সংসদ সদস্য ও সিলেট জেলা আওয়ামী-লীগের সাধারন সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী ও যুক্তরাজ্য আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী দলীয় মনোনয়ন পেতে তৎপর রয়েছেন। তবে কে পাবেন দলীয় মনোনয়ন এখনও তা নিশ্চত হওয়ায় যায়নি।
দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার লক্ষ্যে মাঠে নেমেছেন আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। তিনি দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়সহ একাদশ সংসদ নির্বাচনে নিজেকে প্রার্থী হিসাবে ঘোষনা দেন। এছাড়াও আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীকে সংসদ সদস্য দেখতে চাই এমন দাবী নিয়ে অসখ্য নেতা কর্মীর বিলবোর্ড শোভা পাচ্ছে বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগরে। ইতি মধ্যে তিনি দেশে ফিরেছেন। নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন সময়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে মতবিনিময় করে আসছেন।

২০০১ সালের নির্বাচনে এ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নিখোঁজ এম ইলিয়াস আলী নির্বাচিত হন। তিনি সংসদ সদস্য থাকাবস্থায় এ অঞ্চলে বিভিন উন্নয়নমূলক কাজের জন্য ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে এম ইলিয়াস আলী সুবিধা জনক অবস্থানে ছিলেন। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-বালাগঞ্জ-ওসমানীনগরে) আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শফিকুর রহমান চৌধুরী তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধী বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী এম ইলিয়াস আলীকে প্রায় তিন হাজার ভোটে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। গতবারের মতো এবারও সিলেট-২ আসনে কে পাবেন আওয়ামী লীগের দলীয় টিকেট তা নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। কে হবেন সিলেট-২ আসনের নৌকার কান্ডারী? দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কার হাতে নৌকার দায়িত্ব দেন। না কি গত নির্বাচনের মতো সমঝোতার মাধ্যমে জাতীয় পার্টির যুগ্ম মহাসচিব বর্তমান সংসদ সদস্য ইয়াহইয়া চৌধুরী এহিয়াকে আবারো দেয়া হবে মনোনয়ন তা নিয়ে এলাকাবাসীর মাঝে চলছে গুঞ্জন।

বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-২ আসন। এই আসনকে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে থাকেন। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি সঙ্গে সমঝোতায় এখানে আওয়ামী লীগ থেকে কেউ প্রার্থী হননি। বরাবরই এই আসনে আওয়ামী লীগ থেকে একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন প্রাপ্তির জন্য লড়াই করেন। আর এতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। এবারও এর ব্যতিক্রম নয়। আগামী জাতীয় নির্বাচনে এই আসন থেকে লড়তে ইতিমধ্যেই আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থী রয়েছেন মাঠে। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি শফিকুর রহমান চৌধুরী ও যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। দুই উপজেলায় তাদের অনুসারীরা নিজ নিজ নেতার মনোনয়ন প্রাপ্তির ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেট-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীতা নিয়ে শেষ মুহূর্তে লড়াই জমে ওঠার আশঙ্কাও করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে আনোরুজ্জামান চৌধুরীর পক্ষে এলাকার আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নবীন ও প্রবীন নেতাকর্মী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। বিশ্বনাথ-বালাগঞ্জ শফিকুর রহমান চৌধুরী বলয় ও আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বলয় সৃষ্টি হয়েছে। দুটি বলয় বিভিন্ন কর্মসূচি পৃথকভাবে পালন করে আসছে।

Related posts