September 24, 2018

সিলেটে সতর্ক পুলিশ

সিলেট থেকেঃ  জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় সিলেটে সতর্ক পুলিশ। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারিও। এরপরও স্বস্তি নেই। যে কোনো সময় সিলেটে হামলার আশঙ্কা রয়েছে। এমন তথ্য খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্তাদের। আশঙ্কার পাশাপাশি সিলেটবাসীকে এ সম্পর্কে সতর্ক করতে আলেম উলামা, স্থানীয় জনগণ, পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করা হচ্ছে। সর্বশেষ গতকাল দুপুরে সিলেটের কোতোয়ালি থানায় ওপেন হাউজ ডে ও ইমামদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার কামরুল আহসান।

সিলেটে গেলো কয়েক বছরে জঙ্গি হামলার কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে, এক সময় জঙ্গিদের উগ্র কর্মকাণ্ডের কারণে ঘুম হারাম ছিল সিলেটের মানুষের। নিরাপদ স্থান হওয়ার কারণে ২০০৬ সালের মার্চ মাসে এসে সিলেটে আশ্রয় নিয়েছিলেন জামায়াতুল মুজাহিদীন জেএমবির প্রধান জঙ্গিগুরু শায়খ আব্দুর রহমান। সিলেটের শাপলাবাগের সুর্য দীঘল বাড়িতে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় র‌্যাবের হাতে ধরা পড়েন শায়েখ। এখনও সুর্য দীঘল বাড়ি ও শায়েখ রহমানের স্মৃতি সিলেটবাসীর মনে জ্বলজ্বল করছে। সিলেটের মানুষের শায়েখ রহমানের সেই অবস্থান ও টানা তিন দিনের শ্বাসরুদ্ধকর অপারেশনের কাহিনী ভুলেননি। ওই সময় পলাতক থাকা বাংলা ভাইও সিলেট এসেছিল বলে গোয়েন্দা তথ্যে মিলেছিল।

বাংলা ভাই সিলেট হয়ে ময়মনসিংহে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। শায়েখ রহমানের পর সিলেটের হবিগঞ্জের বাসিন্দা জেএমবির পরবর্তী কমান্ডার সাইদুর রহমানকে ঘিরে তৎপরতা ছিল। শায়েখ রহমান সিলেটে অবস্থানকালীন সাইদুর রহমান নগরীর হাতিমবাগ এলাকার একটি বাসায় অবস্থান করতো। এর আগে ২০০৫ সালে সিলেটের ১২টি স্থানে একযোগে বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছিল। পরে র‌্যাব ও পুলিশের মুহুর্মুহু অভিযানে সিলেটের জঙ্গি আস্তানা তছনছ হয়ে যায়। কিন্তু গেলো বছরের ১২ই মে সিলেট নগরীর সুবিদবাজারে ব্লগার ও বিজ্ঞানমনা লেখক অনন্ত বিজয় দাস খুনের ঘটনার মধ্য দিয়ে সিলেটের জঙ্গিরা জানান দেয়। এরপর থেকে সিলেটের জঙ্গি ধরপাকড়ে অভিযান শুরু করে পুলিশ।

ওই সময় সিআইডি কর্মকর্তারা সিলেটের কানাইঘাট, টুকেরবাজার, জকিগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে কয়েকজন ভয়ঙ্কর ‘সাইবার’ জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে। এর মধ্যে রয়েছে মাওলানা আবদুল হকও। আবদুল হকের প্রযুক্তি জ্ঞান দেখে খোদ গোয়েন্দারাই হতবাক হন। পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খোলস পাল্টানো জঙ্গিরা সিলেটে আরও বেশি প্রশিক্ষিত হয়ে ঘাপটি মেরে বসে আসে। তাদের অনুসন্ধান করা হচ্ছে। সিলেটের জঙ্গি হামলার আশঙ্কা নিয়ে গত ৯ই জানুয়ারি সিলেটের পুলিশ লাইন মাঠে ইমামদের সঙ্গে বৈঠকে তথ্য দেন ডিআইজি মিজানুর রহমান। তিনি এ বার্তা দিয়ে আলীম, উলামাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। ডিআইজির সতর্কবার্তার পর সোমবার সিলেটে দুই ঘণ্টার জন্য ঝটিকা সফরে আসা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও একই কথা জানালেন। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, সিলেটে জঙ্গি তৎপরতা রয়েছে।

এ কারণে সবাইকে সতর্ক থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য প্রদানের আহ্বান জানিয়েছেন। আর গতকাল পুলিশ কমিশনার কামরুল আহসানও একই আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এদিকে, শুধুমাত্র সতর্কবার্তা দিয়েই বসে থাকেনি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ইতিমধ্যে পুলিশ সিলেট নগরের প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় মসজিদ কমিটি সম্পর্কে অনুসন্ধান শুরু করেছে। একই সঙ্গে পাড়ায় পাড়ায় তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। বাইরে থেকে কেউ এসে বাড়ি ভাড়া নিলে পুলিশকে এ ব্যাপারে তথ্য প্রদানের অনুরোধ জানানো হয়েছে। এদিকে, এই অবস্থায় আগামী ২১শে জানুয়ারি সিলেট আসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার সফরকে ঘিরে গোটা সিলেট নগরকেও নিরাপত্তার বলয়ের আওতার নিয়ে আসা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে ও পরে যাতে সিলেটের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে সে ব্যাপারে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে পুলিশ প্রশাসন।

পুলিশ কমিশনারেরও আহ্বান: সিলেটের জঙ্গি হামলা প্রতিরোধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার কামরুল আহসান। মঙ্গলবার দুপুরে কোতোয়ালি মডেল থানা আয়োজিত ইমাম-মসজিদ কমিটির সঙ্গে মতবিনিময় সভা ও ওপেন হাউজ ডে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। কামরুল আহসান বলেন, ‘অতীতে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেভাবে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে, সেটার সূত্র ধরে সিলেটে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই আগে থেকেই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। এজন্যই ইমাম, মোয়াজ্জিন ও মসজিদ কমিটির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করা হয়েছে। তারাও জঙ্গি হামলা প্রতিরোধে পুলিশকে সহযোগিতা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।’ তিনি ইমাম ও মসজিদ কমিটির সেক্রেটারিদের উদ্দেশ্য করে বলেন, মসজিদে অপরিচিত কোন ব্যক্তি ব্যাগ নিয়ে ঢুকলে তা তল্লাশি করবেন।

নিজে তল্লাশি করতে হবে না যে ব্যাগ নিয়ে ঢুকবে তাকে দিয়ে তল্লাশি করাবেন। এভাবে যদি আমরা সচেতন হই তাহলে কোনো জঙ্গিবাদ আমাদের দেশে ঠাই পাবে না। অন্যের অনিষ্ঠ করলে মুসলমান হওয়া যায় না, তাই পাড়া-প্রতিবেশীদের প্রতি মায়া মমতা থাকা দরকার। কোতোয়ালি থানার ওসি সোহেল আহমদের সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন, সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এসএম রোকন উদ্দিন। সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার রহমত উল্লাহসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ও বিভিন্ন মসজিদের ইমাম ও মসজিদ কমিটির সেক্রেটারিরা।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts