September 26, 2018

সিগারেট বিভ্রাট

চারণ গোপাল চক্রবর্তী: ইতিহাস পরিক্রমায় জার্মান ডাক্তারগণ সর্বপ্রথম ধূমপাণের কুফল সম্পর্কে বিশ্বকে অবহিত করে।সিগারেট স্বাস্থ্যর জন্য ক্ষতিকর।ধূমপান ক্যান্সার সহ নানাবিধ প্রাণনাশি রোগের কারণ।ধূমপান মৃত্যু ঘটায়।এই সব নানাবিধ জন-সচেতনা মূলক বিজ্ঞাপনে সাড়া না দিয়াও আমার মত অকাট যাহারা স্বেচ্ছায় মৃত্যু’কে আলীঙ্গণ করার নিমিত্তে নিয়মিত ধূমপানে আগ্রহী ,যাহারা আত্মহত্যার পথে বীরদর্পে চলিয়াছি নিত্যই,তাহারা ইদানিংকাল সন্মুখীন হচ্ছি প্রতিনিয়ত কতক কালোবাজারি ব্যাবসায়ীর স্বেচ্ছাচারিতার।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ধূম্রপাণে আমার মত গন্ড কে অনাগ্রহী করার নিমিত্তে সিগারেট এ শুল্ককর প্রতি বছর বাজেট বৃদ্ধি করে,যাহা বিগত কয়েক বছর পূর্ব হইতে অধ্যাবধি অব্যাহত ।ইহা নিশ্চয় সাধুবাদ পাবার যোগ্যতম প্রক্রিয়া ।প্রকারান্তরে মাঝে মাঝে নিজেকেই নিন্দিত কারণে নন্দিত মনে হয় যে, একজন নিয়মিত ধূম্রপায়ী হিসাবে বেকার হইয়াও নিয়মিত দেশের স্বার্থ সংশ্লিস্ট উন্নয়ন এ কর দেওয়ার মাধ্যমে নিজ দায়িত্ব পালনে একজন সু-নাগরিকের ভূমিকায় অসীন আমিও,যদিও দেশের অনেক উচ্চ মার্গীয় কর্তা ব্যাক্তিগণ শুল্ক কর দিতে অপারগ।
যাকগে সেইসব আলাপচারিতা।

চলমান খ্রীস্টিয় সনের সেদিন ছিলো চলতি একবিংশ শতাব্দীর পহেলা মার্চ ,প্রতিদিনকার নিয়মিত-অনিয়মিত রুটিনের ব্যাতিক্রম সেদিনও হয়নি।ঠীক যথানিয়মে প্রভাত গড়িয়ে অপরাহ্ন প্রাতেই নিদ্রা ভাঙ্গিলো এবং তন্দ্রাচ্ছন্নতা কিছুতেই কাটিতে চাহিতেছিলো না,কি করি বিছানা ছাড়িয়া নিয়মিত নিয়মেই সিগারেট এর স্মরণাপন্ন হইলাম।কিন্তু একি দায় আমার সিগারেট প্যাক শূণ্য!কি করি এখন!অনন্য উপায় না দেখিয়া লিফট বিহীন ছয়তলা বিশিস্ট বাসা হইতে সিঁড়ী ভাঙ্গিয়া দরদর করিয়া নামিয়া গেলাম বাসার নিচে অবস্থিত কামালের দোকানে ।এখানে উল্লেখ্য এই যে আমি রাজধানী ঢাকা শহরের নবাগত আগুন্তুক।মাঁথা গুজিবার ঠাঁয় হিসাবে আশ্রয় পাইয়াছি বন্ধু রাজিবের সহায়তায় তার রুমমেট হিসাবে।বেকার জীবনের ধারাপাতে জর্জরিত প্রাণ কোন ভাবে দিনপাত করে যাচ্ছি মোহাম্মদপুরের রাজিয়া সুলতানা রোডে’র ভাড়া’র ফ্ল্যাটে।তো কামাল ভাই কে কহিলাম ভাই একটা স্টার নেক্সট দেন ,ভাই আমার সাফ জানিয়ে দিলো সিগারেট নাই ,কহিলাম কেনো,কহিলেন সিগারেট এর দাম বৃদ্ধি পাইয়াছে,আপনার টা ৬ টাকা ,আর বাকি গুলোতেও ১/২ টাকা প্রতিটায় বৃদ্ধি পাইয়াছে।আমি ভাই আপনাদেরকে না জানাইয়া চড়া দাম দিয়া আনিবো না,কারণ আমি ঝগড়া করিতে চাই না।

ব্রিটিশ আমেরিকান ট্যোবাক গ্রুপের সিগারেট খেয়েই আমি ও আমার মত ঘৃণিত বাংলাদেশী অভ্যস্ত।কহিলাম আমি,ভাই গ্রুপে কি দাম বাড়াইছ্‌ে ?মিয়াভাই কহিলো,আরে না কোম্পানীর কাছেই সিগারেট নাই,বাজারের মহাজনদের কাছ থেইকা আনতে হইতাছে ।

মনে আমার ঝড় বহিয়া গেলো ,কোম্পানী মানে ?তাইলে কি বহুল জনপ্রিয় ব্রিটীশ আমেরিকান ট্যোবাক গ্রুপ? কোম্পানী নাম টা শুনলেই মনে ভাসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কথা,ছোট বেলা থেকেই শুনে শুনে বড় হওয়া যে-“আমাদের দেশে চা এর চাষ কোম্পানী শুরু করে, প্রথম প্রথম সকলকেই নাকি ডেকে চা খাওয়াতো বিনে পয়সায়।তারপর দিন কতক বিনে পয়সার তকমা অব্যাহত থাকে এবং আমাদের পূর্ব-পুরুষগন যখন চা এর ক্যাফাইনের ধুম্রজালের নেশায় আচ্ছন্ন হয় তখন নাকি কোম্পানী চা এর জন্য অর্থ-মূল্য ধার্য্য করে ।

আমাদের হুক্কার তামাকের স্থলে অভিজাত-অভিনব সিগারেট এর আমদানী কারক এই বঙ্গে কোম্পানী,যদিও নবম শতাব্দি তে সিগারেট এর ঐতিহাসিক আবির্ভাব ধরা হয় মেক্সিকো’তে,তারপর ১৮৮০ সালে জেমস আলবার্ট বোনসেক এর হাত ধরে আধুনিকায়নে পরিচিতি লাভ করে ব্যাপকতায়,প্রথমে অভিজাত শ্রেণীদের ভাব-মাধুর্য্যেতে সিগারেট ভূমিকা রাখিতো,ধীরে তার বিচরণ সহজলভ্যতার সুবাদে নিম্নজাত শ্রেণীতেও স্থায়ী আসণ গাড়ে কালের হালে।

কামাল ভাই কইলো সিগারেট খাইতে হইলে বেশি দাম দিয়া কেনা লাগবো।অন্য কোনো পন্থা না পাইয়া অগ্যতা পাশের দোকানের ছেলেটার নিকট হইতে ৫ খানা সিগারেট ৩০ টাকা মূল্য শোধাইয়া কিনিয়া লইলাম।বাসায় ফিরে নিয়মত নাওয়া-খাওয়া শেষে ভিক্ষালব্ধ ধণে জ্ঞাণ স ারণের নিমিত্তে পথে বাহিরিলাম।পথমধ্য যতবার সিগারেটের পিপাসা পাইয়াছে ততবার পার্শ্ববর্তী দোকানের স্মরণাপম্ন হইয়া কামাল ভাইয়ের নিকট হইতে প্রাপ্ত বয়াণ্রে সুরেই বাধিত হইলাম বারংবার।

এইভাবেই কাটিতে লাগিলো দিন, কোম্পানী ১৯ শে মার্চ নতুন মোড়ক বাজারে আনিতেছে বলিয়া দোকানদারেরা নতুন সুর তুলিছে।ইতিমধ্য বাড়ি যাইবার বাসণা হইলো,রাতের বাসে চড়িয়া সুসং অভিমুখে যাত্রা দিলাম।ভোরে পৌঁছিয়া নিজ মফস্বল শহরের দোকানদার দের নিকট হইতেও একই ব্যাখ্যা পাইলাম এবং রাজধানীর চলমাণ সিগারেট মূল্য এখানেও।তবে এইখানে ছোট টং দোকানের ব্যাবসায়ীদের ভাষ্য আমাকে বিস্মিত করিলো।মজিদ নামে যে ছেলেটির নিকট হইতে আমি নিয়মিত বিষ কিনিয়া থাকি সে শুধালো ,ভাই কা আর ম আর স সিগারেট চড়া দামে বিক্রি করিতেছে,কোম্পানীর কাছে ১০ প্যাকেট চাহিলে দেয় ২ টা, কি করিবো?কা,ম,সা এর নিকট হইতেই কিনিতে হয় কারণ আমার দোকানে যে পরিমান সিগারেট দরকার ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ি যেহেতু তার সিঁকিখানাও পাইনা কোম্পানীর নিকট হইতে সেহেতু অধিক দামে আনিয়া চড়া মূল্যতেই বিক্রি করিতে হইবে ।

নিজের মনে নিজেই প্রশ্ন করিতে লাগিলাম,কিভাবে সম্ভব কালোবাজারি-অসাধুদের নিয়ন্ত্রণ করা,ওরা অধিক মুনাফার জন্য আমার মত বিষখোর দের ব্যাবহার করছে।সরকার জুনে বাজেট ঘোষণা করিবে সেই জন্য ৩ মাস পূর্বেই চড়া মূল্য দিতে হইতেছে আমাদের।গ্রুপ/কোম্পানী নতুন মোড়ক বাজের আনিয়াছে কিন্তু পুরাতণ মোড়ক এর প্যাকেটে সয়লাব অলী-গলীর দোকান মহাজণদের কারসাজীতে,যার নিত্য শিকার আমার-আমাদের মত যেনে শুনে বিষ পাণকারীরা।

মফস্বল শহরের ব্রিটীশ আমেরিকান ট্যোবাক গ্রুপের একজন বাজারজাতকারী স ালক আমার পরিচিত, ওনাকে শুধালাম দাদা,এ কি শুরু করিয়াছেন আপনারা, সিগারেট নিয়ে লোকচুরি? উত্তরে তিনি শুধাইলেন,আমাদের তো কোনো ঘাটতি নেই!
যদি তাহাই সত্য হয়,তাহলে সিগারেট বিয়ে কে বা কারা মাতে প্রতি বছর!কেনো আমাদের বিভ্রাটে পড়তে হয় ?

দুদক বা নারকোটিক্স ডিপার্টমেন্ট কেনো কোনো পদক্ষেপ নেয়না, ইহা কি দূর্ণীতির আওতায় পড়ে না!? ফকির আলমগীর গাহিয়াছিলেন,”হাজার টাকায় গরীব ঠকায়, তাকায় রাঙ্গা চোখে, মিডা কথা কয়না তো কেও, আমরা ছোডলোকে”—তাহাই যেনো চীর বাস্তব।অসাধু-কালোবাজারি জিন্দাবাদ।
বিঃদ্রঃ-উপোরক্ত প্যাঁচালখানি ভোক্তা হিসাবে মত প্রকাশের প্রচেস্টা মাত্র, ইহা কাওকে ধূম্রপাণে উৎসাহিত করিতে নহে।ধূমপান বিষ পাণ।

চারণ গোপাল চক্রবর্তী, নেত্রকোনা।

Related posts