September 21, 2018

সর্বকালের সেরা নায়িকা কানন দেবীর জন্মশতবর্ষে কিছু গোপন কথা

বিনোদন ডেস্ক, লন্ডনঃঃ তাঁর জীবনের গল্প যে কোনও ফিল্মের চিত্রনাট্যকে হার মানাতে পারে। তিনি আজ ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বকালের সেরা নায়িকাদের মধ্যে অন্যতম। তিনিই প্রথম বাঙালি অভিনেত্রী যিনি সর্বভারতীয় স্তরে সম্মানিত হয়েছিলেন। তিনি কানন দেবী। আজ তাঁর জন্মদিন।

হাওড়ার এক নিষিদ্ধপল্লিতে জন্ম হয়েছিল কানন দেবীর (মতপার্থক্য আছে)। তাঁর আত্মজীবনী সবারে আমি নমিতে কানন দেবী জানিয়েছেন, তাঁর বাবা রতনচন্দ্র দাস ও মা রজবালা লিভ টুগেদার করতেন। বাবা ছিলেন সওদাগর অফিসের কেরানি। দত্তক বাবা রতনচন্দ্র দাসের মৃত্যুর পর তাঁর মা এক আত্মীয়ের বাড়িতে রান্নার কাজ নেন। শোনা যায় হাওড়ার সেন্ট অ্যাগনেস কনভেন্টে পড়া শুরু হয়েছিল কাননের। কিন্তু, পরিস্থিতির জন্য স্কুলের পড়া এগোয়নি। ১২ কী ১৩ বছর বয়সেই তাঁর পরিচয় হয় স্টুডিওর সঙ্গে।

কাকাবাবু, যাঁর নাম ছিল তুলসী বন্দ্যোপাধ্যায়, তিনিই কানন দেবীকে মদন থিয়েটার্স / জ্যোতি স্টুডিওয় নিয়ে আসেন। ১৯২৬ সালে জয়দেব ছবিতে একটা ছোট্ট রোল পান কানন দেবী। সেই শুরু। তারপর ১৯২৭ সালে শঙ্খচক্র ছবিতে কাননবালা নামে কাজ করেন তিনি।

মদন থিয়েটার্সে মোট পাঁচটি ছবি করেছিলেন কানন দেবী। ঋষির প্রেম (১৯৩১), জোর বরাত (১৯৩১), কৃষ্ণ মায়া (১৯৩২) ও প্রহ্লাদ। তারপর তিনি চলে যান রাধা ফিল্মসে। এরপর নিউ থিয়েটার্স, এম পি প্রোডাকশনসেও কাজ করেন তিনি।

শোনা যায়, নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ে হওয়ায় অনেক সময় অপমানিত হতে হয়েছিল কানন দেবীকে। ১৯৩৫ সালে সতীশ দাশগুপ্তের বাসবদত্তা ছবিতে তাঁর নগ্নতার প্রদর্শন ছিল। কানন দেবীর নাকি তাতে মত ছিল না। ১৯৩২ সালে জোর বরাত ছবির শুটিংয়ে নাকি ছবির নায়ক জোর করে তাঁকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়েছিলেন। পরিচালকের নির্দেশেই নাকি এমনটা করা হয়েছিল। ছবিটি ছিল জয়তিশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। পরে এই জয়তিশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি মানময়ী গার্লস স্কুলই তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করে।

খ্যাতির স্বাদ তিনি পান মানময়ী গার্লস স্কুলে অভিনয় করে। তারপর তিনি কাজ করেন প্রফুল্ল ঘোষ ও বীরেন সরকারের সঙ্গে। শ্রী গৌরাঙ্গ, চার দরবেশ, মা, হরিভক্তি, সাথী, স্ট্রিট সিঙ্গার, পরাজয়, অভিনেত্রী, লগান, জওয়ানি কি রীত, পরিচয়, জবাবের মতো অনেক ছবিতেই কাজ করেন তিনি।

প্রমথেশ বড়ুয়া তাঁকে দেবদাস ছবিতে প্রধান নায়িকা চরিত্রে চেয়েছিলেন। কিন্তু, চুক্তিগত সমস্যার জন্য তিনি দেবদাসে কাজ করেননি। এর জন্য সারা জীবন নাকি অনুতাপও করেছেন কানন দেবী।

রায়চাঁদ বড়ালের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর কানন দেবীর জীবনে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়।। অভিনয়ের পাশাপাশি সংগীতের জগতেও প্রবেশ করেন তিনি। হিন্দুস্থানী ক্লাসিকালের সঙ্গে পাশ্চাত্য সংগীতেরও তামিল নেন। আল্লারাখার কাছে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। মেগাফোন গ্রামোফোন কম্পানিতে তিনি গায়িকা হিসেবে চাকরি পান। ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছেও তালিম নেন। পরে তিনি রবীন্দ্রসংগীতও শেখেন। ১৯৪১ সালে নিউ থিয়েটার্সের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার আগে তিনি ফ্রিল্যান্সার হিসেবে অনেক হিন্দি ও বাংলা ছবিতে কাজ করেছিলেন। কে এল সায়গল, পঙ্কজ মল্লিক, প্রমথেশ বড়ুয়া, পাহাড়ি সান্যাল, ছবি বিশ্বাস ও অশোক কুমারের মতো ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজ করেছিলেন কানন দেবী।

এরপর, ১৯৪৯ সালে তিনি নিজের প্রোডাকশন কম্পানি গড়ে তোলেন। নাম শ্রীমতি পিকচার্স। বেশিরভাগ ছবিই ছিল শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে। এই সময় তিনি ছবি পরিচালনাও করেন।

শোনা যায়, দু’বার বিয়ে করেছিলেন তিনি। প্রথমটা ১৯৪০ সালে অশোক মিত্রকে। তারপর ১৯৪৯ সালে, হরিদাস ভট্টাচার্যকে। হরিদাস ভট্টাচার্য ছিলেন তখনকার বাংলার সরকারের ADC।

মহিলা শিল্পী মহল নামে একটি সংস্থাও তৈরি করেছিলেন তিনি। তিনিই ছিলেন সংস্থার প্রেসিডেন্ট। সিনিয়র মহিলা আর্টিস্টদের সাহায্য করত সংস্থাটি। ১৯৯২ সালের ১৭ জুলাই, ৭৬ বছর বয়সে মারা যান কানন দেবী।

কানন দেবী ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম অভিনেত্রী, যিনি ভারতীয় সিনেমায় তাঁর অবদানের জন্য সম্মানিত হয়েছিলেন। ১৯৬৮ সালে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন। ১৯৭৬-এ পান দাদাসাহেব ফালকে সম্মান। অভিনয়জীবনে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল আকাশছোঁয়া। যুবক থেকে প্রৌঢ়, সকলেই তাঁর অনুরাগী ছিল। কলকাতার রাস্তায় বিক্রি হত তাঁর ছবি। তাঁর ফ্যাশন অনুকরণ করতেন মহিলারা।

২০১১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ভারতের ডাক বিভাগ কানন দেবীর একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে।

Related posts