September 19, 2018

সরস্বতী পুজো বনাম নবী দিবস পালন : স্কুলে উত্তেজনা

qqভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বেশ কয়েকটি স্কুলে হিন্দু আর মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে তাদের নিজ নিজ ধর্মের উৎসব পালনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরী হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

হিন্দু ছাত্ররা সরস্বতী পুজো আর মুসলিম ছাত্ররা নবী দিবস পালন করতে চেয়েছে, আর তাকে কেন্দ্র করেই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরী হয়েছে।

এর জেরে হাওড়ার একটি স্কুল এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ আর তার প্রধান শিক্ষক পদত্যাগ করেছেন। অন্য আরেকটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক বলছেন তিনি খুব চাপের মধ্যে রয়েছেন।

মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন, হিন্দু ছাত্রদের যদি সরস্বতী পুজো করতে দেওয়া হয় তাহলে মুসলমানদের কেন স্কুলে নবী দিবস পালন করতে দেওয়া হবে না ?

হাওড়া জেলার তেহট্ট হাই স্কুলে সবথেকে বেশী উত্তেজনা তৈরী হয়েছে, যার জেরে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে স্কুলটি বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। স্কুলে বসেছে পুলিশ পাহারা।

স্কুল পরিচালন কমিটির সভাপতি নীহার রঞ্জন ভুঁইয়া নিজের বক্তব্য রেকর্ড করতে দিতে চান নি, তবে সরস্বতী পুজোর আর নবী দিবস পালন নিয়ে সংঘাতের জেরেই যে গন্ডগোল বাধে, সেটা স্বীকার করেছেন তিনি।

১৭০০ ছাত্রর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ মুসলমান ছাত্র পড়াশোনা করে সেখানে। তাদেরই মধ্যে একটা অংশ বেশ কিছুদিন ধরেই দাবী করছিল যে নবী দিবস পালন করতে দিতে হবে।

স্থানীয় মানুষ বলছেন নবী দিবস পালনের দাবীর পক্ষে বেশ কয়েকটি জমায়েতও হয়, যেখানে কয়েকজন খ্যাতনামা মৌলবিও এসেছিলেন। কিন্তু শেষ মুহুর্তে প্রশাসন সেখানে নবী দিবস পালন করতে দেয় নি।

আর তারপর থেকেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান ছাত্ররা বলতে থাকে যে নবী দিবস যখন করতে দেওয়া হয় নি, তখন সরস্বতী পুজোও করতে দেওয়া হবে না।

ওই স্কুলেরই কাছে থাকেন, এমন একজন প্রাক্তন ছাত্র নাম উল্লেখ না করার শর্তে বিবিসি-কে বলছিলেন, “পুজোর আগের দিন হিন্দু ছাত্ররা সরস্বতী পুজো করার দাবীতে রাস্তা অবরোধ করেছিল। পুলিশ লাঠি চালিয়েছিল। তা সত্ত্বেও পরের দিন ঠাকুর পুজোর আয়োজন করেছিল ছাত্ররা। কিন্তু পুলিশ আর র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স তাড়া করে সরিয়ে দেয় সবাইকে। পুজো হতে পারেনি।”

স্কুল কবে খুলবে, মাধ্যমিক আর উচ্চমাধ্যমিক মিলিয়ে আড়াইশোরও বেশী ছাত্রদের অ্যাডমিট কার্ড কীভাবে দেওয়া হবে, নতুন শিক্ষাবর্ষের পঠনপাঠন কীভাবে হবে, তা নিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ কিছুই জানেন না।

আর এর মধ্যেই পদত্যাগ করেছেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক উৎপল মল্লিক।তাঁর সঙ্গে অনেকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা যায় নি।

এই স্কুলের পরিচালন কমিটি যেমন বলছে গোটা ঘটনায় বাইরে থেকে এসে কিছু ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নবী দিবস পালনের জন্য ছাত্র এবং স্থানীয় মুসলমান বাসিন্দাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন, ঠিক তেমনই কথা বলছেন উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার আরেকটি স্কুলের প্রধান শিক্ষকও।

ই চাঁদপুর হাই স্কুলেও বেশ কিছুদিন ধরে সরস্বতী পুজো আর নবী দিবস পালনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা চলেছে।

সেখানেও বাইরে থেকে কিছু মৌলবী এসে নবী দিবস পালনের দাবী জানাতে শুরু করেন বলে জানাচ্ছিলেন প্রধান শিক্ষক পার্থ প্রতিম বিশ্বাস।

“আমি প্রথম থেকেই বলেছিলাম যে পরিচালন কমিটি বা সরকার যদি নির্দেশ দেয়, তাহলেই নবী দিবস পালন করতে দিতে পারি। বারে বারেই তাঁরা আসতে থাকেন। পরিচালন কমিটিরও বেশ কয়েকটি মিটিং ডেকেছিলাম, অনেকেই আসেননি।”

“শেষমেশ বলেছিলাম সবার কাছ থেকে কুড়ি টাকা চাঁদা আদায় করে নবী দিবস হোক আর সরস্বতী পুজোও হোক। আর এটাও বলেছিলাম যখন সঠিক নবী দিবসে সেটা পালন করা হবে আর শুধুই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাই থাকে অনুষ্ঠানে, তাহলেই আমি দুটি অনুষ্ঠনেই আসব, নচেৎ নয়,” বলছিলেন মি. বিশ্বাস।

নবী দিবস হয়েছে তাঁর স্কুলের পাশের মাঠে, আর সরস্বতী পুজোর পরেই কিছু ছাত্র আক্রমণ করে ওই প্রধান শিক্ষককে।

পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশনের সভাপতি মুহম্মদ কামরুজ্জামানের প্রশ্ন, হিন্দুদের পুজো যদি হতে পারে, তবে মুসলমান ছাত্ররা নবী দিবস পালন করতে গেলে কেন বাধা আসবে?

“বহু স্কুলেই সরস্বতী পুজো আর নবী দিবস দুটোই হয়ে আসছে অনেক দিন ধরে। কিন্তু সম্প্রতি কিছু স্কুল কর্তৃপক্ষ নবী দিবস পালনের অনুমতি দিতে চাইছেন না। তা নিয়েই ছাত্রদের মধ্যে আর সেখান থেকে অভিভাবকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে, সংঘর্ষ হচ্ছে। সেটা স্কুল থেকে রাস্তাতেও নেমে আসছে। এটা কখনই কাম্য নয়,” বলছিলেন মি. কামরুজ্জামান।

এই উত্তেজনা প্রশমনে প্রশাসন বা ক্ষমতাসীন দল কী করছে, তা জানতে চেয়েছিলাম হাওড়ার যে এলাকার স্কুলে অশান্তি চলছে, সেখানকার তৃণমূল কংগ্রেস দলের বিধায়ক নির্মল মাজির কাছে।

তিনি জানিয়েছেন কিছু সাম্প্রদায়িক এবং স্বার্থান্বেষী লোক হিন্দু আর মুসলমান – দুই পক্ষকেই উস্কানি দিচ্ছে।

তার বক্তব্য, “কয়েকটি বিরোধী রাজনৈতিক দলও চক্রান্ত করছে ওখানে। তবে এই ব্যাপারে আমরা প্রশাসনকে নিজের মতো কাজ করতে দিচ্ছি – কোনওভাবেই নাক গলাচ্ছি না।”

Related posts