November 18, 2018

সবার দৃষ্টি এখন কারাগারে

বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহা

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ

ম্মদ মুজাহিদ এখন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে। তাদের দন্ডাদেশ কার্যকরকে ঘিরে সারাদেশে নেয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কারাগার ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয়। এর মধ্যেই সাক্ষাৎ করেছেন দু’জনের স্বজনরা। কী হয়, কী হচ্ছে- তা জানার জন্য মানুষের দৃষ্টি কারাগারের দিকে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ওই দু’জনেরই পূর্ণাঙ্গ রিভিউ রায়ের কপি কারাগারে পৌঁছে। রায় তাদের পড়ে শোনানো হয়েছে। কারা সূত্র জানায়, সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে তাদের। বাকি আছে রায় বাস্তবায়নের জন্য কিছু আনুষ্ঠানিকতা। গতকাল রাত ৯টায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, আজ (বৃহস্পতিবার) রাতে ফাঁসি হচ্ছে না। এদিকে দ্রুত রায় কার্যকর করার দাবিতে মিছিল করেছে গণজাগরণ মঞ্চ।  আর জামায়াতে ইসলামী এ রায়ের প্রতিবাদে গতকাল সারাদেশে হরতাল পালন করেছে। অন্যদিকে বিএনপি বলেছে, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার।

এ নিয়ে দেশব্যাপী বিরাজ করছে টানটান উত্তেজনা। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এখন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে। বুধবার সুপ্রিম কোর্টের রিভিউ রায়ের পর পরিবারের সদস্যরা গতকাল বৃহস্পতিবার কারাগারে গিয়ে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। মৃত্যুদন্ডাদেশপ্রাপ্তদের এটিই পরিবারের সাথে শেষ সাক্ষাৎ কি না তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি কেউ। কারা কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ। গতকাল সকাল থেকেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ও এর আশপাশ এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গড়ে তোলা হয়েছে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয়। প্রস্তুত রাখা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁজোয়া যান। রিভিউ আবেদনের পূর্ণাঙ্গ রায়কে কেন্দ্র করে সকাল থেকে সুপ্রিম কোর্ট এলাকা ঘিরেও ছিল বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দুপুরের পর থেকে কারা কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা জোরদারসহ বিভিন্ন ব্যস্ততায় সবার দৃষ্টি চলে যায় সেদিকে।

বিকালে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের রিভিউ আবেদন খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায়ে স্বাক্ষর করেন বিচারপতিরা। এরপর দুজনের রায় পৃথকভাবে প্রকাশ করা হয়। এর পর থেকেই মৃত্যুদন্ডাদেশপ্রাপ্তদের কখন ফাঁসি হবে, এ নিয়ে চলতে থাকে জল্পনা-কল্পনা। পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি রাতে ৯টায় ট্রাইব্যুনাল হয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছেছে। কারা সূত্র বলছে, ফাঁসির দুই আসামিকে চুড়ান্ত রায় পড়ে শোনানো হয়েছে এবং প্রেসিডেন্টের কাছে  প্রাণভিক্ষার বিষয়েও তাদের মতামত জানতে চাওয়া হয়েছে। এদিকে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার পর থেকেই নাজিম উদ্দিন রোডস্থ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ও এর আশপাশের এলাকায় নেয়া হয় বাড়তি নিরাপত্তা। বন্ধ করে দেয়া হয় কারাগারের প্রধান ফটকের আশপাশের সব সড়ক। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও মিডিয়া কর্মী ছাড়া কারা ফটকের আশপাশে কাউকে অবস্থান করতে দেয়া হয়নি। দু-একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়া সবগুলোই ছিল বন্ধ। বাড়তি নিরপত্তা আর থমথমে পরিবেশে সেখানকার জনমনে ভর করে উদ্ধেগ-উৎকণ্ঠা। বেলা সাড়ে ১২টার আগে ৬টি গাড়িতে করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আসেন বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবারের ২২ সদস্য।

সাক্ষাৎ আবেদনের তালিকায় স্ত্রী, ছেলে, পুত্রবধূসহ পরিবারের ১৫ সদস্যের নাম উল্লেখ ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র ৮ জন সাক্ষাতের অনুমতি পান। প্রায় ঘণ্টাখানেক ভেতরে অবস্থান করার পর তারা বেরিয়ে আসেন। এর মধ্যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী, ছেলে ফজলুল কাদের ফাইয়াজ ও হুম্মাম কাদের চৌধুরী, মেয়ে ফারজিন কাদের চৌধুরী, দুই বোন জোবায়দা কাদের চৌধুরী, হাসিনা কাদের চৌধুরী এবং ভাই জামালউদ্দিন কাদের চৌধুরী ছিলেন। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাতের আগে-পরে তারা কেউ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি। সাক্ষাৎ শেষে পরিবারের একজন সদস্য বলেন, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী তাদের বলেছেন, তোমরা আল্লাহর ওপর ভরসা রেখো। এ সময় তাকে মোটেও বিচলিত মনে হয়নি। বুধবার কাশিমপুর কারাগার থেকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে আসা হয়। এরপর বেলা পৌনে ২টার দিকে জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের সঙ্গে কারাগারে সাক্ষাৎ করতে যান তার পরিবারের ১২ সদস্য। এ তালিকায় ছিলেন স্ত্রী তামান্না ই জাহান, ছেলে আলী আহমেদ তাহজিব, আলী আহমেদ তাহকীক ও আলী আহমেদ মাবরুর, মেয়ে তামান্না বিনতে মুজাহিদ, ভাই মোহাম্মদ খালেদ ছাড়াও পুত্রবধূ সৈয়দা রুবাইয়াজা, নাসরিন আকতার ও ফারজানা জেরিন, আত্মীয় নুরুল হুদা মাহমুদ, আ ন ম ফজলুল হাবিব সাব্বির ও ওযায়ের এম এ আকরাম।

আধা ঘণ্টার মতো অবস্থানের পর তারা বেরিয়ে আসেন। এ সময় তারা বলেন, পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের জন্য আইনজীবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন মুজাহিদ। তিনি প্রেসিডেন্টের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি না জানতে চাইলে তারা জানান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ প্রেসিডেন্টের কাছে একটি বিশেষ বিষয়ে আবেদন করবেন। তবে বিষয়টি কী তা পরিবারের সদস্যদের জানাননি তিনি। মুজাহিদের ছেলে আলী আহমাদ মাবরুর বলেন, তার বাবা বলেছেন, রিভিউ খারিজের রায়ের ব্যাপারে কারা কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে কিছু জানায়নি। এ ব্যাপারে আদেশের কোনো কপিও তিনি পাননি। এ অবস্থায় তিনি আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করতে চান। তিনি প্রেসিডেন্টকে সাংবিধানিক অভিভাবক মনে করেন। আইনজীবীদের সঙ্গে আলাপ করে তিনি প্রেসিডেন্টের কাছে একটি বিশেষ বিষয়ে আবেদন করতে চান। এর পর মুজাহিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ চেয়ে বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আবেদন করেন তার আইনজীবীরা। আজ শুক্রবার সকাল ১০টায় দেখা করার অনুমতি চেয়ে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে এ আবেদন করা হয়। কারা কর্তৃপক্ষ আবেদনটি গ্রহণ করলেও তারা অনুমতির বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। মানবতাবিরোধী অভিযোগের দায়ে সর্বোচ্চ আদালতের দেয়া মৃত্যুদন্ডের রায় পুনর্বিবেচনার যে আবেদন করেছিলেন মৃত্যুদন্ডদেশপ্রাপ্ত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, গত বুধবার তা খারিজ করে দেন আপিল বিভাগ। এর মধ্য দিয়ে তাদের যুদ্ধাপরাধ মামলার আইনি লড়াইয়ের চ‚ড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়। তারা এখন কেবল প্রেসিডেন্টের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারবেন। আসামিরা তা না চাইলে কিংবা প্রেসিডেন্টের ক্ষমা না পেলে সরকার দিনক্ষণ ঠিক করে কারা কর্তৃপক্ষকে ফাঁসি কার্যকরের নির্দেশ দেবে।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts