April 21, 2019

সতর্কতা ছাড়াই বিপজ্জনক রাসায়নিক সংরক্ষণ

 

রফিকুল ইসলাম রফিক,নারায়ণগঞ্জ:  পুরান ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ১২০ জনের প্রাণহানির ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশে। ওই দুর্ঘটনায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল বিস্ফোরকজাতীয় কেমিক্যালের উপস্থিতি। তখন বিপজ্জনক দাহ্য পদার্থ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে সরকারের শীর্ষ মহল থেকে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়। সরিয়ে নেয়া হয় কিছু গুদাম। এচিত্র পুরান ঢাকার হলেও নারায়ণগঞ্জের টানবাজার এলাকা এর বেতিক্রম নয়।

কিন্তু এখনো বহু গুদামে বিপজ্জনক রাসায়নিক সঠিকভাবে সংরক্ষণ হচ্ছে না। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

রাসায়নিকের ব্যবসায় বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু এ ধরনের ব্যবসায় মুনাফা অনেক বেশি হওয়ায় অনেকেই এতে আগ্রহী হন। ফলে অধিকাংশ ব্যবসায়ীরই জানা নেই যে, কোন ধরনের রাসায়নিক বিপজ্জনক। ফলে রাসায়নিকের চরিত্র ও সংরক্ষণের পদ্ধতি না জানায় বিপজ্জনক রাসায়নিক মজুদে নেয়া হচ্ছে না বাড়তি সতর্কতা।

রাসায়নিক ব্যবসা গড়ে উঠেছে মূলত নারায়ণগঞ্জে রয়েছে অসংখ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অবাধে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক বিক্রি হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের কোনো লাইসেন্স নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিস্ফোরক পরিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সারা জেলায় পেট্রোলিয়াম লাইসেন্স রয়েছে অধশতাধীকের কম। বিস্ফোরক পরিদপ্তর ছাড়াও জেলা প্রশাসন ও সরকারি বিভিন্ন সংস্থা রাসায়নিকের লাইসেন্স দিয়ে থাকে।

বাজারে হরহামেশা বিক্রি হচ্ছে, এমন রাসায়নিকের মধ্যে বেশকিছু অনেক বিপজ্জনক ও দাহ্য, যার থেকে ঘটতে পারে বড় কোনো দুর্ঘটনা। এসব রাসায়নিকের মধ্যে টলুইন, জাইলিন, এসিট্রন, আইসো প্রোফাইল অ্যালকোহল, পটাশিয়াম ক্লোরেট, রেড ফসফরাস, সালফার, অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট, পটাশিয়াম নাইট্রেট, সোডিয়াম নাইট্রেট, নাইট্রোসেলুলোজ, পটাশিয়াম ক্লোরেট, ফসফরাস ও সালফার উল্লেখযোগ্য।

বিপজ্জনক রাসায়নিক সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিক্রির ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু জেলার অধিকাংশ কেমিক্যাল ব্যবসায়ী এ নির্দেশনা মানছে না। প্রশাসনের যোগসাজশে অনেকেই বিপজ্জনক রাসায়নিক অবাধে বিক্রি ও গুদামজাত করছেন। বিপজ্জনক রাসায়নিক বিক্রির ক্ষেত্রে লাইসেন্স নেয়া জরুরি হলেও শুধু আমদানিকারক পর্যায়ে কিছু লাইসেন্স রয়েছে বলে জানা গেছে।

বিস্ফোরক বিধিমালা-২০০৪ অনুযায়ী, বাংলাদেশে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে নিয়োজিত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে বাণিজ্যিক বিস্ফোরক মজুদের জন্য ম্যাগাজিনের সাইট, লে-আউট নকশা অনুমোদন, বিস্ফোরক আমদানি, পরিবহন ও মজুদ বা অধিকারে রাখার লাইসেন্স দেয়া হয়। এছাড়া এ আইনের অধীনে আমদানি ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিস্ফোরকের প্রকার নির্ধারণেও প্রাধিকার দেয়া হয়। এক্ষেত্রে বিস্ফোরক মজুদের সাইট ও লে-আউট নকশা অনুমোদনপূর্বক তা পরিদর্শনের পর লাইসেন্স মঞ্জুর করা হয়। পাশাপাশি লাইসেন্সকৃত সাইট পরিদর্শনের বিধানও রাখা হয়েছে আইনে। এছাড়া ম্যাগাজিনে ব্যবহার অনুপযোগী বা বিপজ্জনক বিস্ফোরকের বিনষ্টকরণের পদ্ধতি নির্ধারণ করে বিনষ্টকরণের অনুমতি প্রদানের বিধানও রয়েছে আইনে।

উল্লিখিত আইন ছাড়াও রয়েছে কার্বাইড বিধিমালা ২০০৩। এ বিধিমালা অনুযায়ী, ক্যালসিয়াম কার্বাইডের দাহ্য বৈশিষ্ট্যের কারণে কার্বাইডের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে কার্বাইড আমদানি, পরিবহন এবং অ্যাসিটিলিন গ্যাস জেনারেশন
প্লান্ট ও সংযুক্ত মজুদাগারে কার্বাইড মজুদের লাইসেন্স প্রদান করা হয়।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের কার্যকরী সদস্য এনায়েত হোসেন মারুফ বলেন, বিপজ্জনকসহ সব ধরনের কেমিক্যাল ব্যবসার ক্ষেত্রে লাইসেন্স দেয়া জরুরি। কিন্তু খুচরা ব্যবসায়ীদের কোনো লাইসেন্স নেই। বিপজ্জনক রাসায়নিকের ব্যবসা নজরদারিতে আনতে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স প্রদান করা জরুরি। এসব লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সমিতির অনুমোদন, ট্যাক্স-ভ্যাট, গুদামজাত ব্যবস্থা, বিক্রির যোগ্যতা ও ব্যবসায়ীর দক্ষতা দেখা উচিত। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ সহ সাড়া দেশে ক্ষেত্রে সেটি হচ্ছে না।

জানতে চাইলে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক মো. শামসুল আলম বলেন, বিপজ্জনকসহ যেসব রাসায়নিক মানুষের জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ, তা তদারকির মতো লোকবল আমাদের নেই। কারণ আমরা শুধু কারিগরী দিকটি দেখে থাকি। এগুলোর তদারকি কিংবা আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার বিধান ব্রিটিশ আমল থেকেই জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের। তবে বিপজ্জনক রাসায়নিক সংরক্ষণের জন্য আলাদা গুদামের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। এরই মধ্যে পুরান ঢাকার অনেক ব্যবসায়ী নিজ উদ্যোগে গুদাম অন্যত্র স্থানান্তর করেছেন বলেও তিনি জানান।
দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/০৮ এপ্রিল ২০১৬/রিপন ডেরি

Related posts