November 18, 2018

সক্রিয় হচ্ছে ছাত্রদল!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহাবস্থান নিশ্চিত এবং গণতন্ত্র রক্ষায় সরকার বিরোধী আন্দোলনকে তরান্বিত করতে ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় কমিটি বর্ধিতকরণ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শাখা সংগঠন ও ইউনিটের কমিটি গঠনের কাজ শুরু করেছে বিএনপির এই ছাত্র সংগঠনটি।

তবে এই কমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় গত কয়েক বছরের (বিশেষ করে গত এক বছর) আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে থাকা নেতাকর্মীদের গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় এবং তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মনে করেন, কমিটিতে যদি ত্যাগী ও পরিশ্রমী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা হয় তাহলে আন্দোলন সংগ্রাম বেগবান হবে। আর যদি এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে পকেট কমিটি কিংবা নিষ্ক্রিয়দের দিয়ে কমিটি গঠিত হয় তাহলে ছাত্রদল তার অভিষ্ঠ লক্ষে পৌঁছাতে পারবে না। বরং আগের চেয়ে আরো খারাপ অবস্থানে পড়তে পারে।

গত বছরের ১৪ অক্টোবর রাজিব আহসানকে সভাপতি এবং আকরামুল হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে ১৫৩ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। গত এক বছরে রাজপথে সরকারের কঠোর অবস্থানের পরেও বেশ কিছু মিছিল-মিটিং করতে সক্ষম হয় রাজিব আহসান এবং আকরামুল হাসান নেতৃত্বাধীন কমিটি।

তবে তাদের এই মিছিল-মিটিং ছিলো বিচ্ছিন্ন এবং অনেকটা অকার্যকর। ঐক্যবদ্ধভাবে কোথাও মিছিল হতে দেখা যায়নি গত এক বছরে। আবার কারো কারো বিরুদ্ধে সরকারের সঙ্গে আঁতাত করার খবরও প্রকাশিত হয়েছে সংবাদ মাধ্যমে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মহানগর এবং ঢাকায় অবস্থিত কলেজগুলোর কমিটি না দিতে পারাটা বর্তমান কমিটির অন্যতম বড় ব্যর্থতা বলেও মনে করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। কোনো সাংগঠনিক পরিচয় না থাকায় অনেকে আবার ছাত্রদলের কর্মসূচিতে যোগদানেও অনীহা প্রকাশ করেছেন। ফলে আন্দোলন কিছুটা হলেও ব্যত্যয় ঘটেছে বলে মনে করছেন খোদ ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির অনেক নেতা।

ছাত্রদল সূত্রে জানা গেছে, ছাত্র রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল এক সময় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রধান ঘাঁটি। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ বড় বড় সব আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছে ছাত্রদল। কিন্তু অজানা কারণে গত ১১ বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে নতুন কোনো কমিটি দেয়া সম্ভব হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কমিটি দেয়া হলেও জিইয়ে রাখা হয়েছিল অনেক সমস্যা। অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংসহ নানা কারণে সারাদেশের ক্যাম্পাসগুলোতে আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে পড়ে অন্যতম এ বৃহৎ ছাত্র সংগঠনটি।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে কমিটি না হওয়ায় হতাশ হয়ে এবং ছাত্রত্ব হারিয়ে অনেক নেতাকর্মী এখন দৈন্যদশায় দিনাতিপাত করছেন। অনেকে আবার রাজনীতিতে আগ্রহ হারিয়ে সরকারি-বেসরকারি চাকরি করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্রদল কর্মী বলেন, ‘আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হই। অনেক ইচ্ছা ছিল রাজনীতির মাধ্যমে সাধারণ ছাত্রদের এবং পরবর্তীতে দেশের সেবা করব। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, ছাত্রদলের কমিটি না দেওয়ায় আমার সেই আশা নিরাশায় পরিণত হয়েছে। বাধ্য হয়েই সরকারি চাকরিতে আবেদন করি এবং বর্তমানে সরকারি চাকরি করছি। তবে ছাত্রদলের কমিটি হবে শুনে খুব আনন্দ পাচ্ছি। কারণ, আমার মতো আর কেউ হয়তো রাজনীতি থেকে বিদায় নিতে হবে না।’

এদিকে লন্ডন সফরের পর দেশে ফিরে ছাত্রদলের কমিটি গঠন করার জোর তাগিদ দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে ইতিমধ্যে কয়েকবার বৈঠকে বসেছেন খালেদা জিয়া। গত ৮ ডিসেম্বর তিনি ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের ত্যাগী এবং পরিশ্রমী নেতাকর্মীদের তালিকা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল কমিটি করারও নির্দেশ দেন তিনি। তালিকা প্রকাশ করতে ছাত্রদল বিভিন্ন উপ-কমিটি গঠন করে কাজ করছে। তবে কমিটি কখন গঠিত হবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।

সংগঠনের কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মোক্তার হোসেন বলেন, পুলিশের গুলির মুখেও ছাত্রদল প্রতিটি কর্মসূচি পালনের চেষ্টা চালাচ্ছে। কর্মসূচি পালন ও আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখায় অনেক ছাত্রদলের নেতাকর্মী গুম হয়েছেন। গুম হওয়াদের মধ্যে অনেকের লাশও পাওয়া যায়নি।

অপর যুগ্ম সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, অতীতেও ছাত্ররাই সব আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু ছাত্রসহ সাধারণ মানুষের উপর পুলিশের নির্বিচারে গুলি চালানোর ঘটনা অতীতে ঘটেনি। তিনি বলেন, গুলির মুখেও ছাত্রদল সাধ্যমত মাঠে থাকার চেষ্টা চালাচ্ছে।

সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. উল্যাহ চৌধুরী ফয়সাল বলেন, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সারা দেশে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করে থাকে। জাতির সংকটময় মুহূর্তে জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে ছাত্রদলই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে। তেমনি গত এক বছর বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে আমরা রাজপথে থাকার চেষ্টা করেছি। আগামীতেও যে কোন নির্দেশ পালন করতে ছাত্রদলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী প্রস্তুত রয়েছে।

নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগকে নাকচ করেছেন ছাত্রদলের সহ-সভাপতি নাজমুল হাসান। তিনি পাল্টা দাবি করেন, বিএনপির সব আন্দোলন-সংগ্রামেই রাজপথে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের সবচেয়ে সরব উপস্থিতি থাকে। আর ছাত্রদলের নেতৃত্বেই আন্দোলন গতি পায়, যা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, বিএনপির আন্দোলন সফলে কেউ থাকুক বা না থাকুক, ছাত্রদল রাজপথে থাকবে। একইসঙ্গে ছাত্রদলের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা যথাযথভাবে পালন করবে।

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান বলেন, ছাত্রদলের স্বাভাবিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। তিনি বলেন, সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসের রাম রাজত্ব কায়েম করেছে। সেখানে কোন সহাবস্থান নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং ইউনিটের কমিটি গঠনের মধ্যে দিয়ে সহাবস্থানের পথ ত্বরান্বিত হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

তিনি বলেন, গণতন্ত্রহীন বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করাও ছাত্রদলের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তাই বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এবং নির্দেশনায় ছাত্রদল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সকল আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেবে বলেও তিনি জানান।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts