December 10, 2018

শেষ রক্ষা আর হলো না

244

 

ডাঃ রুখসানা আমিন সুরমা

ঘটনাটি আমার নিজের দেখা। প্রায় এগারো বছর আগে ঘটেছে। আমাদের বাড়ির পাশাপাশি এই ভাবী থাকতো। ভাবীর একটা ছেলে বাচ্চা ছিল। ভাবী দেখতে বেশ সুন্দর ছিল। ঐখানে ভাড়া থাকতো। ভাবীর স্বামী চাকুরী করতো কোথায়, তা এখন খুব একটা মনে পরছে না। মাঝে মধ্যে ভাবীর সাথে কথা হতো, কেমন আছেন, কি অবস্থা। শুধু এই পর্যন্তই, আর তেমন কিছুনা। জানতাম ভাবী স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে আছে, ভালো আছে। একদিন কথায় কথায় জানলাম ভাবীর এটা ভালোবাসার বিয়ে। অর্থাৎ দু’জন দু’জনকে ভালোবেসে বিয়ে করেছে। এখনও দু’জন খুব সুখে আছে, ভালো আছে। দু’জন দু’জনকে অনেক ভালবাসে।

ভাবীর বাচ্চার বয়স মাত্র তিন বছর। হঠাৎ স্বামীর অন্যমনস্ক ভাব। ভাবী চালাক ছিল, স্বামীর উপর নজরদারী শুরু করলো, সন্দেহ বাড়তে লাগলো। এক পর্যায়ে স্বামীর অফিসে গিয়ে খোঁজ খবর নিতে লাগলো। জানতে পারলো স্বামীর অন্য আরেকটি মেয়ের সাথে গভীর সম্পর্ক। এই সম্পর্কের গভীরতা কতটুকু তা ভাবী বছর খানেকের মধ্যেই জানতে পারলো। তার স্বামী তাকে আর বাচ্চাকে রেখে না জানিয়ে গোপনে আরেকটি বিয়ে করেছে। ভাবী যেয়ে নিজের চোখে দেখে প্রমান নিয়ে এসে তারপর বিশ্বাস করলো।

তারপর সেখান থেকে ফিরে এসে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। সবাই কান্নার শব্দ শুনে ছুটে এলো, আমরাও শুনলাম। লোকমুখে জিজ্ঞেস করালম কি হয়েছে? তখন সবাই এ ঘটনা বলল। লোকজন ঘন্টা খানেক ভিড় করে থাকলো আর তাকে বুঝাতে চেষ্টা করলো। তারপর এক পর্যায়ে মানুষের ভীড় যখন কমে গেল ভাবী বাচ্চাটাকে বাইরে রেখে নিজের ঘরে ঢুকে গায়ে কোরোসিন তেল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিলো। দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে, সবাই দরজা ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে ততক্ষণে ভাবী পুড়ে শেষ হয়ে গেল। অর্থাৎ ভাবী তার ভালোবাসা হারানোর কষ্টে, স্বামীর বিশ্বাস ঘাতকতায় তার জীবনের প্রতি অনিহা চলে এসেছে। ঘৃনায়, দুঃখে, কষ্টে সহ্য করতে পারেনি। তাই বোকার মতো নিজেকেই নিঃশেষ করে দিলো। সবাই দরজা ভেঙ্গে ঢুকে আর উনাকে শেষ রক্ষা করতে পারলো না।

আমরা ছিলাম তিন তলায়, উনারা নীচ তলায় থাকতো। জানাজানি হতে হতে মানুষের ভীড় উপচে পরতে লাগলো। আমি শুনে ছুটে যেতে চাইলাম, আমার আম্মা আমাকে জোড় করে ধরে রাখলো, বলল- তুই কিছুতেই যেতে পারবি না। আমি বললাম- কেন আম্মা? আম্মা বলল- তুই সহ্য করতে পারবি না, ঐ দৃশ্য আর চোখে দেখা যায় না, কালো কয়লা হয়ে গেছে। বাচ্চাটা মা-মা করে চিৎকার করছে। কেউ সহ্য করতে পারছে না, তুইও সহ্য করতে পারবি না। আমি তোকে যেতে দেবো না। আমার ছোট বোন আমাকে বলল- আম্মা প্রয়োজনে আপুকে বেঁধে রাখেন, তাও ঐখানে যেতে দিয়েন না। আপু নরম মনের মানুষ। আপু একেবারেই সহ্য করতে পারবে না। সত্যি তাই হলো, আমার আম্মা কোন ভাবেই যেতে দিলো না। আমি শুধু ঘরে বসেই কাঁদলাম। শেষ অবস্থা কিছুই দেখতে পেলাম না। শুধু আম্মাদের মুখেই শুনলাম। তারপর ভাবীর মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন এলো, থানা পুলিশ হলো, তার স্বামীকে খুঁজতে শুরু করলো পুলিশ। এর মধ্যে অনেক সময় পার হয়ে গেল। তারপর আর জানিনা, আর কি বা জানবো, জেনেই বা কি হবে?

কোন স্বামী যেন এমন অন্যায় না করে, কারো ভালোবাসা যেন এই ভাবে শেষ না হয়ে যায়, কোন নারী যেন এমন বোকামী করে নিজেকে নিজে শেষ না করে। সুস্থ্য ভাবে, সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকার অধিকার সবার আছে। নারী নির্যাতন কারো ব্যক্তিগত ব্যাপার বা সমস্যা নয়। নারী নির্যাতন আজ আমাদের সমস্যা, সামাজিক সমস্যা। সবাইকে এর প্রতিবাদ করতে হবে। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, তাদের পাশে থাকতে হবে, যার যার মতো করেই সহযোগিতা করতে হবে। আমি বলবো-
“আর একটি নারীও নির্যাতন নয়
এ নির্যাতন যেন অচিরেই বন্ধ হয়”

সবাই সবার কথা ভাবলো, ঐ তিন বছরের শিশুটির কথা কি কেউ ভাবলো? মুহুর্তের মধ্যেই শিশুটি বাবাকে হারালো, মাকে চিরতরে হারালো, কি অপরাধ ঐ শিশুটির? মা-বাবার আদর ভালোবাসা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার প্রতিটি শিশুর আছে। আমরা অন্তত ওদের কথা ভাববো।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি

Related posts