September 24, 2018

শীতকালের মিষ্টি রোদে পিঠা খাওয়ার আনন্দ

ইলিয়াছ মাহমুদ (ঢাকা): বাঙালির ঐতিহ্যবাহী খাদ্য তালিকায় এক অনন্য নাম পিঠা। পিঠা বাংলার সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মিষ্টি, ঝাল, টক নানা পদের মুখরোচক এসব পিঠার নাম শুনলেই জিভে জল ধরে রাখা দায়। বাঙালি সংস্কৃতিতে অতিথি আপ্যায়নে আজও পিঠার প্রচলন দেখা যায়। হেমন্তে যখন কৃষকের ঘরে নতুন ফসল ওঠে তখন পিঠা– পায়েসের আয়োজন যেন বেড়ে যায় কয়েকগুন। তবে শীতের সঙ্গে পিঠার সম্পর্ক নিবিড়। শীতে খেঁজুরের রস পিঠা খাওয়ার মজা আরও বাড়িয়ে দেয়। শীতের মিষ্টি রোদের উষ্ণতা নেয়ার সঙ্গে মজার সব পিঠা খাওয়ার আনন্দই আলাদা।

চালের গুড়া, গুড়, দুধ, ক্ষীর, নারিকেল, মসলা প্রভৃতি প্রয়োজন মতো মিশিয়ে বিভিন্ন ধরনের পিঠা তৈরি করা হয়। পিঠাকে আরও লোভনীয় করতে  হরেক রকম নকশাও কাটা হয়। পিঠার গায়ে নানারকম নকশা আঁকা থাকায় একে বলা হয় নকশি পিঠা। এলাকার ভিন্নতায় স্বাদ ও ডিজাইন আলাদা হয়ে থাকে। তবে আমাদের দেশে সব মিলিয়ে যে কত রকমের পিঠা আছে তা বলা মুশকিল। কিছু পিঠা আছে প্রায় সব অঞ্চলেই পরিচিত।

বাংলাদেশের  উল্লেখযোগ্য  কয়েকটি পিঠা হল- ভাঁপা পিঠা, পোয়া পিঠা, পাকান পিঠা, ফুল পিঠা, ঝাল পিঠা, ভেজিটেবল পিঠা, গোলাপ পিঠা, লবঙ্গ পিঠা, ছাঁচ পিঠা, লতিকা পিঠা, সন্দেশ, পানতোয়া পিঠা, রসফুল পিঠা, নকশি পিঠা, পুডিং পিঠা, দুধরাজ পিঠা, চিতই পিঠা, চুটকি পিঠা, চাপড়ি পিঠা, ঝুড়ি পিঠা, জামদানি পিঠা, মালাই পিঠা, হাঁড়ি পিঠা, সুন্দরী পিঠা, পুলি পিঠা, ঝিনুক পিঠা, পাতা পিঠা, পাটিসাপটা পিঠা, সূর্যমুখী পিঠা, সরভাজা পিঠা, দুধ পিঠা, জামাই পিঠা, আন্দশা পিঠা, কাটা পিঠা, বিবিখানা পিঠা, সাজ পিঠা, ডিম চিতইপিঠা, কাঁঠাল পিঠা, কাঁঠালপাতার পিঠা, খাস্তা পিঠা, গুড় পিঠা, চন্দ্রপুলি পিঠা, চাল পিঠা, ছানারপিঠা, ছড়া পিঠা, জামাইভোগ পিঠা, জালা পিঠা, ডোবা পিঠা, তিলকুলি পিঠা, দৈলাপিঠা, দুধকদু পিঠা, পাক্কাশ পিঠা, পাপড় পিঠা, বরফি পিঠা, বড়া পিঠা, মেরা পিঠা, মুগপাকন পিঠা, রুটি পিঠা, সেমাই পিঠা, ভাপাপুলি পিঠা, কলা পিঠা, ছাঁচপিঠা, চাপড়ি পিঠা, নারকেল পিঠা, পাটা পিঠা, মুঠা পিঠা, ছিটা পিঠা, গোকুলপিঠা, চুটকিপিঠা, চষি পিঠা, মালাই পিঠা, ফুলকুচি পিঠা, জামাইঠগ পিঠা, তাল পিঠা ছাড়াও আরো অনেক রকম বাহারি পিঠা রয়েছে। এতো  রকমের লোভনীয় সুস্বাদু পিঠা পৃথিবীর অন্য কোন দেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

শীতের শুরুতে প্রকৃতিতে হালকা কুয়াশা নেমে আসতে না আসতেই  শহরের রাস্তার ধারে এবং গ্রামের হাটে –বাজারে ভাপা পিঠা বিক্রি শুরু হয়। আটা নারিকেল গুড় পরিমাণ মতো বাটিতে ভরে পাতলা কাপড়ে মুড়ে পাতিলের ওপর বসিয়ে আগুনের তাপে পানির বাষ্প উঠে তৈরি হয় ভাপা পিঠা। এই ভাপা পিঠার স্বাদেই শীতের পিঠাপুলির দুয়ার খুলে দেয়। শহরের বিভিন্ন হাট-বাজার, ফুটপাতে বিভিন্ন টার্মিনালে ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, কুলি পিঠা, পাটিশাপটা, মেরাপিঠা ইত্যাদি বিক্রি হতে দেখা যায়। আবার পিঠার স্বাদ গ্রহণ ও একে নগরের মানুষের কাছে পরিচিত করে তুলতে দেশের বড় বড় শহরগুলো বিশেষ করে রাজধানীতে দিন অথবা সপ্তাহব্যাপী পিঠা উৎসবের আয়োজন করা হয়।

শুধু শীতেই কেন? এখন সারাবছর পিঠা খাওয়ার সুযোগ রয়েছে। শহরের বেশকিছু এলাকায় গড়ে উঠেছে পিঠাঘর যেখানে সারা বছরই পিঠা বিক্রি করা হয়। মিলনমেলা, গায়েহলুদ, জন্মদিন, বিয়েশাদীসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও পিঠা সরবারাহেরব্যবস্থা করে থাকে এ পিঠার দোকানগুলো। বাংলার লোকজ ও নান্দনিক সংস্কৃতিরই বহিঃপ্রকাশ এ পিঠা শহুরে জীবনে যতই ফ্যাশনেবল বা আর্টিফিশিয়াল হোক, এর শেকড় গ্রামে। গাঁয়ের মাটির গন্ধেই পিঠার মৌ মৌ সুবাস।

রাজধানীর বেইলী রোডের একটি পিঠার দোকান ‘পিঠাঘর’। এখানে বছরের সব ঋতুতেই পাওয়া যাচ্ছে রকমারি পিঠা। ‍এ ‍পিঠাঘরে বিক্রি হচ্ছে শাহী মালাই এবং মালাই পিঠা ৪০টাকা, সাজপিঠা, পুডিং পিঠা, বিবিখানা ৩৫টাকা, পাটি শাপটা, মালপোয়া, ক্ষীর লুচি, মুগসোলা পানপিঠা ৩০ টাকা, লবঙ্গ লতিকা, রস ফুল, নারিকেলের বরফি, শাহি মুগ পাকন, রস গজা, খাজা পিঠা ২৫টাকা, বালপোয়া, পাকন, নকশী, সর ভাজা, তেলপোয়া, ভাঁপাপিঠা বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা করে। এছাড়া বিভিন্ন দামের মধ্যে আছে শাহী রস পাকন, কলা পিঠা, জবা ফুল পিঠা, গোলাপ ফুল পিঠা, তিল পনির পিঠা, পাতাপিঠা, সুন্দরী পাকন পিঠা, পাংশা, সূর্যমুখী ও চিতই পিঠা।

বেইলীরোডের পিঠাঘরের স্বত্তাধিকারী কাজী গোলাম কিবরিয়া বাংলামেইলকে বলেন, ১৬ বছর হলো এখানে পিঠার ব্যবসা করছি।দিন দিন বেচা-বিক্রি বাড়ছে।  সকাল ১০টা থেকে রাত ১০ টা পযর্ন্ত দোকান চলাকালীন এখানে ক্রেতার ভিড় লেগেই থাকে। নকশি পিঠার চাহিদাই এখানে বেশি। আমাদের কয়েকজন কারিগর আছে। তারা বাসায় বসে এসব বাহারি পিঠা তৈরি করে।

তিনি বলেন, পিঠা পার্সেল ও করি আমরা। বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে অনেকে হাজার হাজার টাকার পিঠার অর্ডার করে থাকে।

শুধু বেইলী রোড নয় রাজধানীর গুলশান, বনানী, পুরানো ঢাকা, ধানমণ্ডিসহ অনেক এলাকায় আছে পিঠা বিক্রির স্টল। তবে এখানে উচ্চবিত্তদের আনাগোনাই বেশি দেখা যায়। শুধু অভিজাত এলাকাই নয় ঢাকার ফুটপাতেও বিক্রি হয় বিভিন্ন জাতের পিঠা। শান্তিনগেরর চৌরাস্তার মোড়ে ফুটপাতে পিঠা বিক্রি করেন বিল্লাল হোসেন।

তিনি বলেন, আমার দোকান সকাল ৮টা থেকে রাত ১১টা পযর্ন্ত চলে। দাম কম হওয়ায় এখানে সবশ্রেনীর ক্রেতাই পিঠা কিনতে আসে। তবে এখানকার বড় ক্রেতা মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষেরা।

বিল্লাল জানান, তার দোকানে প্রতিটি পিঠার মূল্য বিশ টাকা করে। এছাড়াও ঢাকার বিভিন্ন ফুটপাতে চিতই, ভাঁপা, তেলের ভাজা পিঠা ৫ থেকে ১০ টাকা দরে কিনতে পাওয়া যায়।

শীতে শহরে পিঠা যতই সহজলভ্য হোক না কেন। হাঁড় কাঁপানো কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরেখেজুরের গুড়ের তৈরি লোভনীয় নানাবিধ পৌষালি পিঠা উনুনের পাশে বসে খাওয়ার আকর্ষণই অন্যররকম। শীতের সকালে উঠানের মিষ্টি রোদে মাদুর, হোগলা বা পিঁড়িতে বসে পিঠা খাওয়ার আনন্দ কখনও ভোলার নয়।

Related posts