September 21, 2018

শিক্ষিতরা হিযবুত, অশিক্ষিতরা জেএমবির হাত ধরে জঙ্গি হচ্ছে!

ঢাকাঃ টার্গেট কিলিংয়ে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের অর্ধশত সশস্ত্র ‘যোদ্ধা’কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা ও কল্যাণপুরে পুলিশের জঙ্গি বিরোধী অভিযানে ৬ জন নিহত হয়েছে। হিযবুত তাহরীরের এসব ‘যোদ্ধা’দের প্রায় সকলেই উচ্চশিক্ষিত আর বিত্তশালী পরিবারের সন্তান। হিযবুত তাহরীরের এসব সদস্যকে রক্তাক্ত এ পথে আনতে অন্তত ১০ জন পরিকল্পনাকারী কাজ করছেন। এদের মধ্যে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ৪ জন শিক্ষক, বুয়েটের একজন শিক্ষক, তিন জন চিকিত্সক ও দুইজন তথাকথিত রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী রয়েছেন।

অন্যদিকে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) যেসব সদস্য অশিক্ষিত বা অল্পশিক্ষিত অথবা একটু গোঁয়ার ধরনের, তাদেরকে এই পথে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। কথায় কথায় রেগে যায় এবং কোনো একটি বিষয় মাথায় ঢুকলে তা দ্রুত কার্যকর করতে চায়—এমন ধরনের জেএমবি সদস্য এখন টার্গেট কিলিং ও আত্মঘাতী হামলায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।

হলি আর্টিজানে হামলার ঘটনায় পুলিশের হাতে আটক নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষক হাসনাত রেজা করিম জিজ্ঞাসাবাদে হিযবুত তাহরীরের একটি বড় ধরনের নেটওয়ার্কের তথ্য দিয়েছে গোয়েন্দাদের কাছে। যদিও হাসনাত রেজা করিম এ হামলার সঙ্গে জড়িত– এমন বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

সূত্র জানায়, ২০১২ সালের ১৮ জানুয়ারি গুলশানের একটি নামি হাসপাতালের হূদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. গোলাম হায়দার রসুলকে উত্তরা ৩ নম্বর সক্টরের ১৩ নম্বর রোডের ৪৩ নম্বর বাড়ি থেকে র্যাব গ্রেফতার করে। ডা. গোলাম হায়দার রসুলের বাড়ির একটি সড়ক পরেই গুলশানে হলি আর্টিজানে হামলার নেতৃত্বদানকারী দুর্ধর্ষ জঙ্গি নিবরাস ইসলামের বাড়ি। ডা. গোলাম হায়দার রসুলকে টিএফআই (টাস্ক ফোর্স ফর ইন্টারগেশন) সেলে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারকে উত্খাতের জন্য এক পরিকল্পনা ফাঁস করে দেন তিনি। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশে হিযবুত তাহরীর বড় ধরনের অপারেশন চালাবে, যেটি রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী থামাতে পারবে না। এর আগে ২০১১ সালের ২০ ডিসেম্বর সেনাবাহিনীতে মেজর (চাকরিচ্যুত) জিয়াউর রহমানের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের বিষয়টিও ডা. গোলাম হায়দার রসুল তার জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন।

২০০৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. গোলাম মওলা ও ড. গোলাম মহিউদ্দিন গ্রেফতার হওয়ার পর তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম কারা পরিচালনা করছেন— সে বিষয়ে একটি তালিকা তিনি (ডা. গোলাম হায়দার রসুল) জানিয়ে দেন। তালিকা অনুযায়ী হিযবুত তাহরীরের আর্থিক বিষয়টি দেখাশুনা করেন মির্জা আমিন। তিনি আগে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের বড় পদে কর্মরত ছিলেন। চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি একটি রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা খোলেন। তার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের দুই রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী মওলানা মাহমুদুল হাসান ও মওলানা মামুনুর রশিদ হিযবুতের অর্থের জোগান দেন।

চিকিত্সকদের নামের তালিকার ব্যাপারে ডা. গোলাম হায়দার রসুল জানিয়েছেন, ধানমন্ডি এলাকার তাকওয়া মসজিদের পাশে একটি চেম্বারে বসেন ডা. আনোয়ার জাভেদ। তার সঙ্গে ডা. এমআর আলী ও বারডেম হাসপাতালের একজন চিকিত্সক, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিসহ চারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষক ও বুয়েটের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আলী নাঈম হিযবুতের প্রচারণা চালান। হিযবুতের অপারেশন কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, ব্যারিস্টার করিম জাহেদ হিযবুতের অপারেশন কার্যক্রমের সমন্বয় করেন। এই করিম জাহেদই গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর ও চলতি বছরের ১৭ জুন হিযবুতের অনলাইন সম্মেলনের সমন্বয় করেন।

এদিকে হলি আর্টিজানে নিহত জঙ্গিদের মধ্যে নিবরাস ইসলাম, রোহান বিন ইমতিয়াজ ও মীর সামিহ মোবাশ্বির ছিল হিযবুত তাহরীরের সদস্য। কল্যাণপুরে পুলিশের জঙ্গি বিরোধী অভিযানে নিহত ৯ জনের মধ্যে সাবেক ডিএফআইয়ের (বর্তমানে ডিজিএফআই) পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুর রউফের নাতি মার্কিন পাসপোর্টধারী সেজাদ রউফ অর্ক ওরফে মরোক্কো, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানের নাতি আকিফুজ্জামান ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষার্থী তাজ উল হক রাশিক হিযবুত তাহরীরের সদস্য।

একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, এই দুই ঘটনায় বাকি নিহতরা জেএমবি’র সদস্য। হলি আর্টিজান ও কল্যাণপুরের ঘটনায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলোর মধ্যে হিযবুত তাহরীর ও জেএমবি’র সরাসরি সংশ্লিষ্টতা মিলেছে। টার্গেট কিলিংয়েও তাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।ইত্তেফাক

Related posts