November 17, 2018

শিক্ষা ক্যাডারে সাড়ে ৩ হাজার শূন্য পদ প্রসঙ্গে

শিক্ষা ক্যাডারে সাড়ে ৩ হাজার পদ শূন্য

দেশে শিক্ষা ক্যাডারে অন্তত সাড়ে তিন হাজার পদ শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া ওএসডি অবস্থায় রয়েছেন এক হাজার ৩০০ জন। শিক্ষার্থীর তুলনায় পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। তাই মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ এস এম এ কে সাবরি জানান, সারা দেশে ৩১৬টি সরকারি কলেজে শিক্ষকের পদের সংখ্যা ১৫ হাজার ২৮৯। এর মধ্যে ২০১৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী ৩ হাজার ৬৬০টি পদ শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া ওএসডি রয়েছেন প্রায় এক হাজার ৩০০ জন।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, চার ক্যাটাগারিতে শিক্ষা ক্যাডারের পদ রয়েছে। প্রভাষকের ৭ হাজার ৮১১ পদ, শিক্ষা কর্মকর্তা (মাউশি) ৭টি ও গবেষণা কর্মকর্তা (মাউশি) পদ চারটি। মোট পদ ৭ হাজার ৮২২। এরমধ্যে পূরণকৃত পদের সংখ্যা ৪ হাজার ৯২১ । শূন্য রয়েছে ২ হাজার ৯০১টি পদ।

সহকারী অধ্যাপকের পদ ৪ হাজার ২১১, অধ্যক্ষের পদ একটি ও সহকারী পরিচালক (মাউশি) পদ ১৫টি। মোট পদের সংখ্যা ৮ হাজার ২২৭। এর মধ্যে পূরণকৃত পদের সংখ্যা ৩ হাজার ৮৮৭। শূন্য রয়েছে ৩৪০ পদ।

সহযোগী অধ্যাপকের পদ ২ হাজার ১৮৬, উপাধ্যক্ষের পদ ১৮৫ টি,  অধ্যক্ষের পদ ২৭ টি এবং উপপরিচালক (মাউশি) পদ ৮ টি। মোট পদের সংখ্যা ২ হাজার ৪০৬। এর মধ্যে পূরণকৃত পদ ২ হাজার ১৬৭ । শূণ্য রয়েছে ২১৯ পদ।

মহাপরিচালকের একটি পদ, অধ্যাপকের ৫০৯ পদ, উপাধ্যক্ষের পদ ৪৪ টি, অধ্যক্ষের ২৭৬ পদ ও পরিচালক (মাউশি) ৪ টি পদ রয়েছে। এই ক্যাটাগারিতে মোট পদ ৮৩৪ টি। এরমধ্যে পূরণকৃত পদ ৬৩৪। শূণ্য রয়েছে ২০০ পদ।

খোজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিটি অনার্স বিভাগে ১২ জন করে শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও অনেক কলেজে রয়েছে ৪ জন করে। কোন কোন কলেজে কোন বিভাগে শিক্ষকই নেই। ধার করা শিক্ষক দিয়ে চলে শিক্ষা কার্যক্রম। রাজধানীর বাইরে বেশির ভাগ কলেজেই অনার্স বিভাগে দুই/চার জন করে শিক্ষক রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পাবলিব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষক বেশি। কিন্তু সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক কম। সরকারি কলেজে অনার্সে প্রতি বিভাগে ১২ জন করে শিক্ষক থাকার কথা। কিন্ত এই ১২ জন শিক্ষক পর্যাপ্ত নয়। তিনি বলেন, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক দিনে একটা ক্লাস নেন। এবং তিনি সেই বিষয়ে খবুই অভিজ্ঞ থাকেন। কিন্তু সরকারি কলেজের একজন শিক্ষককে দিনে ৪/৫টা ক্লাস নিতে হয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা এক বিষয়ে ক্লাস নেওয়ার ফলে তারা ওই বিষয়টি শিক্ষার্থীদের ভালভাবে বুঝাতে পারেন। কিন্তু ৪/৫ টা ক্লাস নেওয়ার কারণে সরকারি কলেজের শিক্ষকরা অতোটা সময় নিয়ে অতোটা ভাল বোঝাতে পারেন না।। সরকারি কলেজে মানসম্মত শিক্ষার বিষয়ে সরকারের গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘মানসম্মত শিক্ষার জন্য সবকিছু নতুন করে ঢেলে সাজানো দরকার।’

রাজধানীর তিতুমীর কলেজের শিক্ষক পরিষদের সাবেক সাধারন সম্পাদক ও ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আফরোজ আরা বেগম বলেন, তাদের কলেজে ৫৫ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র ২১২ জন শিক্ষক রয়েছেন। এটা মোটেও পর্যাপ্ত না। ৫শ শিক্ষক হলেও এতো শিক্ষার্থীর জন্য যথেষ্ট না। সব বিভাগে ১২ টি পদ থাকার কথা থাকলেও ইংরেজি বিভাগে আছে ১০ টি পদ। আর সেই ১০ টি পদের মধ্যে ৪ পদ শূন্য রয়েছে। চার বছর ধরেই এই চারটা পদ খালি রয়েছে।

শিক্ষক সংকটকে মানসম্মত শিক্ষার অন্তরায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তিতুমীরে ইংরেজি বিভাগে অনার্স ১ম বর্ষে প্রায় সাড়ে তিনশ এবং মাস্টার্সে ৪ থেকে পাঁচশ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৫ জন নিয়ে একটি ক্লাস করানো হয়। ক্লাসের ধারন ক্ষমতা আশি জন থাকলেও আমার সাড়ে তিনশ শিক্ষার্থী নিয়ে ক্লাস করতে হয়। এক ক্লাসে এতো শিক্ষার্থীকে আমরা কি দিতে পারি আর শিক্ষার্থীরাই বা কতটুক পায় তা ভাবার বিষয়।’

সরকারি কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী অনুপাতে যে শিক্ষক আছে তা একেবারেই কম। এই শিক্ষক সংকট কাঠিয়ে ওঠার জন্য যে পরিমান শিক্ষা ক্যাডার নিয়োগ দেওয়া দরকার বিবিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সেই পরিমান নিয়োগ নেওয়া হচ্ছে না। প্রতিবছর বিসিএস পরীক্ষায় সাধারন শিক্ষা ক্যাডারে পদসংখ্যা বাড়িয়ে দিলেও সমস্যার অনেকটা সমাধান হতে পারে। তাছাড়া বিশেষ বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষা ক্যাডার নিয়োগ দিয়েও শিক্ষক সংকট সমাধান করা যেতে পারে।

রাজধানীর তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী জেসমিন আক্তার জানান, তিনি ইকোনোমিকস বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন। তাদের মাঝে মাঝে ক্লাস হয় আবার মাঝে মাঝে ক্লাস হয় না।

রাজধানীর কলেজগুলোর চেয়ে মফস্বলের অবস্থা আরো বেশি ভয়াবহ। যশোর এমএম কলেজের ফিনান্স বিষয়ে অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি জানান, তাদের কলেজে ফিনান্সের কোন শিক্ষক নেই। ধার করা শিক্ষকের মাধ্যমে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম চলে। যখন একাউনটিংয়ের শিক্ষকরা ফ্রি থাকেন তখন তারাই ফিনান্সের ক্লাস নেন। এতে অনেক সময় একাউন্টিংয়ের শিক্ষার্থীদেরেও অসুবিধা হয়।

খুলনা বিএল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর গুলশান আরা বেগম জানান, ২১ টি অনার্স ও ২ টি মাস্টার্স বিভাগের ২৩ হাজার শিক্ষার্থীকে পাঠদানের জন্য বিএল কলেজে শিক্ষক রয়েছে ১৬৭ জন। পদ রয়েছে ১৯৮ টি। খালি ৩১ টি পদ। তিনি বলেন, ‘শিক্ষক সংকটের বিষয়ে প্রতিমাসে প্রতিবেদন করে পাঠিয়েও দীর্ঘদীন ধরে ঊর্ধ্বতন মহলের সাড়া পাচ্ছি। তাই শিক্ষক সংকটও কাটছে না।

 

Related posts