September 21, 2018

শফিক রেহমানের স্বীকারোক্তি: পুলিশ বনাম তাঁর আইনজীবীর বক্তব্য

ঢাকা থেকে রিপন সরকারঃ ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মো. মনিরুল ইসলাম বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ও তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ করে হত্যা চক্রান্তে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শফিক রেহমান যুক্ত ছিলেন বলে রিমান্ডে স্বীকার করেছেন।

তিনি এ কথাও্ জানিয়েছেন যে, জয়কে হত্যার ষড়যন্ত্রে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত একাধিক বৈঠকে তিনি নিজেও উপস্থিত ছিলেন।

সজীব ওয়াজেদ জয় সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সংরক্ষিত তথ্য পেতে ঘুষ লেনদেনের ঘটনায় দণ্ডিতদের সঙ্গে এসব বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
মনিরুল ইসলাম বলেন, তিনি (শফিক রেহমান) নিজে যে বৈঠক করেছেন এ সংক্রান্ত কিছু দালিলিক প্রমাণাদি এরই মধ্যে তার হেফাজত থেকে সংগ্রহ করেছে পুলিশ।

‘তিনি (শফিক রেহমান) নিজে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে এ ষড়যন্ত্রে অংশ নেন এবং পরবর্তীতে প্রবাসী একজনের মেইলের মাধ্যমে জয়ের যাবতীয় তথ্যাদি সংগ্রহ করেন। এঘটনায় ইতিমধ্যে ৩০ হাজার মার্কিন ডলার লেনদেনও হয়েছে।’

পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, এছাড়া আরেক সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ফেডেক্স এক্সপ্রেসের মাধ্যমে জয়ের যাবতীয় তথ্যাদি হাতে পান। তবে মাহমুদুর রহমানের কাছে আর কি ধরণের তথ্য আছে তা জানতে তাকে রিমান্ডে আনার জন্য আদালতে আবেদন করা হয়েছে। আদালত আগামী ২৫ এপ্রিল এ বিষয়ে শুনানির দিন ধায করেছেন।

মঙ্গলবার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে শফিক রেহমানের গ্রেফতার, রিমান্ড ও মামলার সর্বশেষ তথ্য জানাতে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।

সাংবাদিকদের বলা হয়, শফিক রেহমান রিমান্ডে তথ্য দিচ্ছেন।

‘যুক্তরাষ্ট্রে দণ্ডিত রিজভী আহমেদ সিজার, এফবিআই এজেন্ট রবার্ট লাস্টিক এবং এই দুজনের মধ্যস্ততাকারী লাস্টিকের বন্ধু জোহানেস থালের সঙ্গে বৈঠকের কথা তিনি ‘স্বীকার করেছেন’।’

তিনি বলেন, এ (হত্যা ষড়যন্ত্র) মামলায় দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানও জড়িত রয়েছেন। তার দালিলিক প্রমাণও আমাদের কাছে রয়েছে।

বিএনপির সিনিয়র নেতারাও এ ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত বলে মনিরুল ইসলাম জানান।

মনিরুল ইসলাম জানান, শফিক রেহমানকে সুনির্দিষ্ট মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। ২০১৫ সালের ৩ আগাষ্ট পল্টন থানার মামলায়। মামলার আগে রমনা থানায় একটি জিডি হয়েছিল। সেই জিডির প্রেক্ষিতে মামলা হয়। প্রথম দিকে মামুন ও রিজভি আহমেদ সিজারের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এছাড়া এ ঘটনায় আরও দুজন এফবিআই সদস্যের দণ্ড হয়। ২০১২ সালে শফিক রেহমান যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে অপহরণ ও হত্যা চেষ্টা পরিকল্পনার এক পর্যায়ে সেখানে গিয়ে বৈঠক করেন। তারা কয়েক দফা বৈঠক করার কথা স্বীকার করেছেন রিমান্ডে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি পুলিশের কাছে আছে।
‘সিজার এফবিআই সদস্যের মাধ্যমে জয় কোথায় থাকতো, তার গাড়ি নম্বর, গাড়ির ধরণ ও কোথায় কোথায় যেত তা সংগ্রহ করে বাংলাদেশে থাকা ফেডারেল একপ্রেস কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে মাহমুদুর রহমানের কাছে পাঠায়।’

মনিরুল ইসলাম বলেন, ঘটনাস্থল যুক্তরাষ্ট্র। তাই অধিকতর তদন্তের জন্য সেখানে গিয়ে তদন্ত করলে আরো বিস্তারিত কিছু পাওয়া যাবে। খুব শিগগিরেই তিন সদস্যর একটি টিম তদন্ত করতে সেখানে যাচ্ছে।

হত্যা পরিকল্পনার এজাহারে বিএনপির হাই কমান্ড র্পযায়ের কেউ জড়িত রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই হাইকমান্ড নেতা তারেক রহমান কি না জানতে চাইলে ডিএমপির এই মুখপাত্র বলেন, হাই কমান্ড বলতে কার কথা বোঝানো হয়েছে, তা তদন্ত করে বের করা হবে ও তারেক রহমানের জড়িত থাকা না থাকার বিষয়ে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

‘তারেকের সঙ্গে সিজার অথবা দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য কারো সঙ্গে যোগাযোগ ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া লন্ডন, যুক্তরাষ্টে ও বাংলাদেশের আর কেউ জড়িত আছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

এদিকে, গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার মাশরুকুর রহমান খালেদের নেতৃত্বে তিন সদস্যের গোয়েন্দা দল তদন্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছে বলেও জানিয়েছে ডিবি।

শফিক রেহমানের আইনজীবীর বক্তব্যঃ  

তবে রিমান্ডকে ‘টর্চার’ সেল হিসেবে দাবি করে তার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেছেন, রিমান্ডে নির্যাতনের কারণে তিনি এরকম কিছু বলে থাকলেও এটা কোনো স্বীকারোক্তি না। রিমান্ড শেষে তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে কী জবানবন্দি দেন আইনের চোখে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।

‘বিশিষ্ট সাংবাদিক শফিক রেহমানকে গোয়েন্দারা তাদের হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। এখন তারা কীরকম আচরণ করছেন এবং ওই আচরণের প্রেক্ষাপটে তিনি কী বলেছেন তা আমরা কীভাবে জানবো!’ উল্লেখ করে তিনি বলেন: টর্চার করে কোনো স্বীকারোক্তি আদায় করা হলে আইনের চোখে তার কোনো মূল্য নেই। তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে তার যে বক্তব্য উপস্থাপন করবেন সেটাই হবে তার স্বীকারোক্তি।

রিমান্ডে থাকা অবস্থায় একজন অভিযুক্তের সাধারণভাবে তার আইনজীবী বা পরিবারের সঙ্গে দেখা করার কোনো সুযোগ নেই।

‘তাই আমাদের পক্ষে তার বক্তব্য যেমন জানা সম্ভব না তেমনি তার পক্ষেও আমাদেরকে কোনো কিছু জানানো সম্ভব না। এখন পুলিশ তাদের মতো বক্তব্য দিচ্ছে, শফিক রেহমান সাহেব নিশ্চয়ই রিমান্ড শেষে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে তার বক্তব্য তুলে ধরবেন,’ বলে মন্তব্য করেন অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া।

 

Related posts