November 17, 2018

লেজেগোবরে ট্রাম্প, ফুরফুরে হিলারি, মধ্যিখানে গাঁজার কল্কে


আব্দুল মালেক

রিপাবলিকান পার্টির কনভেনশনে মনোনয়ন পাওয়ার পর প্রার্থী ডোনাল্ড জে ট্রাম্প জনপ্রিয়তায় অতিক্রম করেছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনকে। কিন্তু সেই উত্থান সূচকে ধ্বস নামতে লাগল ডেমোক্র্যাট কনভেনশনের পর থেকেই। কারণ ভোটের ময়দানে একের পর এক আপত্তিকর প্রলাপ বকে তিনি যেসব বিতর্ক সৃষ্টি করে চললেন তাতে ক্রোড়পতি প্রার্থীর দশা তখন হয়ে দাঁড়াল এক কথায় লেজেগোবরে। এর ওপর জাতীয় পর্যায়ে ওয়াশিংটন রিপাবলিকানদের সঙ্গে বিস্ফোরণোন্মুখ দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হয়ে নিজ দলের অভ্যন্তরেও ডোনাল্ডকে জড়িয়ে পড়তে হলো শত্রুতামূলক সম্পর্কে। এমন এক পরিস্থিতির উদ্ভবের পর যখন তার প্রচার-প্রচারণা সত্যিকার অর্থে হয়ে পড়েছে অস্থিতিশীল সেই সময়টিতে ট্রাম্প যুদ্ধফেরত অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের সঙ্গে বাঁধিয়ে বসলেন বিশাল এক গোল। ডেমোক্র্যাটিক কনভেনশনে ইরাক যুদ্ধে আত্মদানকারী ক্যাপ্টেনের পিতা খিজির খান তার স্ত্রী গাজালা খানকে পাশে নিয়ে ট্রাম্পের মুসলিম বিদ্বেষকে নিয়ে কটাক্ষ করেন। আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্র কর্তৃক গোল্ড স্টার উপাধিতে ভূষিত হওয়া মুসলিম সেনার পিতা কনভেনশনে ট্রাম্পের সমালোচনা করে বলেছিলেন দেশের জন্য ট্রাম্পের কোন ত্যাগ নেই।

তাতে করে প্রচন্ডভাবে খেপে গিয়ে তার প্রতি অশালীন ব্যঙ্গবিদ্রুপের সঙ্গে অপমানজনক মন্তব্য করে বসলেন রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থী ট্রাম্প সাহেব। এমন বক্তব্যে যুদ্ধ ফেরত সৈনিকরা যেমন ডোনাল্ডের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়েছে তেমনি সেটা অপছন্দ করেছে জনগণের অনেকাংশই। এসব অবাঞ্ছিত কথাবার্তায় তার নিজ দল-সমর্থকদের অনেকেই ত্যক্তবিরক্ত হয়ে ট্রাম্পের দিক থেকে মুখ ফেরাতে শুরু করেছেন। হাতেনাতে ফল হওয়ার মতো সেই সপ্তাহেই ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারির তুলনায় তার জনপ্রিয়তা কমল ১৫ শতাংশ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার মেজাজ, মর্জি ও যোগ্যতা এখন দলের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ।

একজন মুসলিম অধিনায়কের আত্মত্যাগকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্কের মাঝে নতুন করে ট্রাম্প আবার টেনে আনলেন ভিয়েতনামের যুদ্ধবন্দী সম্মানীয় রিপাবলিকান সিনেটর জন ম্যাককেইনকে। অতি কঠোর সমালোচনার মাধ্যমে ম্যাককেইনের বন্দীদশা নিয়ে ইতোপূর্বে ডোনাল্ড নানাবিধ কৌতুক করেছিলেন এবং যুদ্ধকালীন তার সামরিক কর্মকানন্ড সম্পর্কে মেতেছিলেন উপহাস্য মন্তব্যে। ম্যাককেইনের হৃদয়ের সেই ক্ষত এখনও তাজা। তার মধ্যেই কংগ্রেসের স্পীকার পল রায়ান ও সিনেটর জন ম্যাককেইনের পুনর্নির্বাচন সমর্থন করবেন না বলে সদম্ভে ঘোষণা দিলেন ট্রাম্প। দলকে সুসংহত করে প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারির বিরুদ্ধে তার আক্রমণ শানানোর যথার্থ সময়টাতেই তিনি নেমে পড়লেন নিজ দলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সংঘাতে। এর ফলে রিপাবলিকান দলের কিছু সিনেটর, কংগ্রেসম্যান তাকে সমর্থন ও ভোট দেবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির চেয়ারম্যান প্রিভিস রেনে পরিস্থিতি সামলাতে দফায় দফায় ট্রাম্পকে ফোন করলেও তিনি অনড় হয়েই জানালেন বর্তমানে দল আগের যে কোন সময়ের চেয়ে ঐক্যবদ্ধ। অথচ গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টিটি তখন সম্মুখীন হয়েছে চরম অবমাননাকর দলত্যাগ আশঙ্কায়। পার্টি নেতৃত্ব তাই তাকে বাদ দিয়ে নতুন কাউকে মনোনয়ন দেয়ার ইতিহাসে অভূতপূর্ব এমন বিষয়টি নিয়েও ভাবতে শুরু করেছিল। ইতিহাসে কেবল একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর মৃত্যুর পরই এমনটি ঘটেছিল।

অবস্থার প্রেক্ষিতে ট্রাম্পকে উপেক্ষা করে স্পীকার পল রায়ান ও সিনেটর জন ম্যাককেইন উভয়কেই সমর্থনদানের কথা জানিয়ে এগিয়ে গেলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে ডোনাল্ডের পছন্দ করা রানিংমেট পেন্স। অবশেষে গলদঘর্ম দলীয় চেয়ারম্যান প্রিভিস রেনে ট্রাম্পকে বোঝাতে সক্ষম হলেন যে তার বর্তমান কর্মকান্ডের কারণে বিভক্ত ও ভঙ্গুর দল নিয়ে নির্বাচনে জেতা সম্পূর্ণ অসম্ভব। অবশেষে অবস্থা বেগতিক দেখে তিন দিন পর ৬ আগস্ট তারিখে যথার্থই নিজ লেজটাকে গোবরে মাখামাখি করে ডোনাল্ড এন্ডোর্স করলেন স্পীকার পল রায়ান ও সিনেটর ম্যাককেইনের নির্বাচনকে। কিন্তু পরিস্থিতি এতটা ঘোলাটে করে জল খাওয়ার পরিণতিতে এসব ভবিগণ ভুলবেন কিনা সেটা ভবিষ্যতই বলে দেবে।

প্রতিদ্বন্দ্বী দলের এমন দ্বন্দ্ব-কোলাহল যে হিলারি ক্লিনটনের নির্বাচনী বাগান ভরিয়ে ফেলল কুসুমে কুসুমে সেটা বলাই বাহুল্য।ইতোপূর্বে ডোনাল্ড শুধু রেটিংয়ে হিলারির থেকে এগিয়ে ছিলেন তাই নয় কনভেনশনে তার বক্তৃতাও টেলিভিশনে দেখেছে ৪০ মিলিয়ন আর ক্লিনটনের ৩৭ মিলিয়ন আমেরিকান। অর্থাৎ প্রতিদ্বন্দ্বীর চাইতে তিন মিলিয়ন কম মানুষ হিলারির ভাষণ প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

কিন্তু ডিএনসির পরেই চিত্রপট বদলে যেতে লাগল দ্রুত। সংখ্যালঘু মানুষ বিশেষ করে কৃষ্ণবর্ণরা বরাবরই ডেমোক্র্যাট ভাবাপন্ন। হিস্পানিক সম্প্রদায় ও সঙ্গে নারীদের মধ্যেও তুঙ্গে উঠল হিলারির জনপ্রিয়তা।

কট্টর মনোভাবের শ্বেতাঙ্গ রক্ষণশীল মানুষজনই সমর্থক রিপাবলিকান পার্টির। কিন্তু সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা রিপোর্টে দেখা গেল রক্ষণশীলরা এবারে ভাগ হয়েছেন দু’দলে। এদের মধ্যে যারা শিক্ষা লাভের জন্য কলেজ যাননি তারা তাদের পূর্বতন অবস্থানে রয়ে গেছেন। প্রার্থীর যোগ্যতা-অযোগ্যতা, ভুলভ্রান্তি সবকিছুর মধ্য দিয়ে তারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের একনিষ্ঠ সমর্থক হয়ে আছেন ও থাকবেন। কিন্তু যারা কলেজ শিক্ষিত তারা এবার ঝুঁকে পড়েছেন ক্লিনটন শিবিরের দিকে। মজার কথা, ১৯৭৬ সাল থেকে কোন এক্সিট পোলে এরা ডেমোক্র্যাটকে কখনও ভোট দেয়নি। তাছাড়া সামরিক ঘাঁটির শহরগুলো যে সমস্ত সুইং স্টেটে অবস্থিত যেমন উত্তর ফ্লোরিডা, উপকূলীয় ভার্জিনিয়া, নিউ হ্যাম্পশায়ার এবং উত্তর ক্যারোলিনা, কলোরাডো এবং আরিজোনা সেখানে ট্রাম্পের মন্তব্যের পর অনেকেই তাকে ভোট না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এবিসি ও ওয়াশিংটন পোস্টের এই যৌথ সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে সাধারণভাবে নমিনেশন পাবার পর থেকে ট্রাম্পের যে রেটিং সেটা বর্তমানে হিলারির চেয়ে কমেছে ৮%। এসব সমীক্ষায় ট্রাম্পের সমস্যার তালিকাটিকে দীর্ঘই বলতে হবে। যেমন ৭৫% মার্কিনী মনে করেন তিনি যাদের সঙ্গে সহমত পোষণ করেন না তাদের প্রতি তার কোন শ্রদ্ধাবোধ নেই ও ৭০% তার প্রেসিডেন্সি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ৬৭% পার্সেন্ট তাকে সৎ ও বিশ্বাসযোগ্য ভাবেন না, ৬৩% তাকে সবদিক দিয়েই অযোগ্য ভাবেন ও ৬০% তাকে মহিলা ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বায়াস্ট মনে করেন

অন্যদিকে পাল্লাটা ক্রমশ ভারি হচ্ছে হিলারির। বার্নি সাপোর্টারদের মধ্যে অনেক তরুণ হিলারিকেই ডেমোক্র্যাট হিসেবে অবশেষে ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন। গত সপ্তাহে হিলারি ক্লিনটনের প্রতি মহিলাদের সমর্থন বেড়েছে ২৩ পয়েন্ট। ইমেইল কেলেঙ্কারি নিয়েও শোরগোলটাও তেমন বাধা হলো না উঁচু তারে। সুতরাং হিলারি ক্লিনটন হাসছেন স্বস্তির ফুরফুরে হাসি। হঠাৎ করে এলো শটসার্কিট। সেটাও হালে তেমন হলে পানি পাবে বলে মনে হয় না।

প্রসঙ্গক্রমে একটা কথা বলতে হয়, আমেরিকার নির্বাচন বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ব্যবস্থা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সে কারণে প্রতিটি দলের প্রার্থীদের এই ব্যয় মেটানোর জন্য এই নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহের বিধান আইনগতভাবে প্রদান করা হয়েছে। বলাবাহুল্য, ১৬ সালের নির্বাচনের সময় ঘটনার দুর্বিপাকে ও প্রার্থী অপছন্দের কারণে পিছুটান দিয়েছে অনেক রিপাবলিকান ডোনার। তারপরেও ধনপতি ট্রাম্প গত জুলাই মাসে ৮২মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করতে পেরেছেন এবং ইতোপূর্বে সংগৃহীত অর্থের মধ্যে তার হাতে রয়েছে ৭৪ মিলিয়ন ডলার। এই বিলিওনেয়ার রিয়্যাল স্টেট মুঘল প্রাইমারি ভোটের সময় নিজ পকেট থেকে ব্যয় করেছেন ৫৫ মিলিয়ন ডলার। এর বিপরীতে হিলারি ইতোমধ্যে মোটা অঙ্কের তহবিল সংগ্রহ করেছেন। শুধু ‘সুপার প্যাক’ অর্থাৎ আগস্ট-নবেম্বর মিডিয়া বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যয় করছেন ১৪৮ মিলিয়ন ডলার।

ডেমোক্র্যাট রিপাবলিকান বাদ দিয়ে এবার বলি এক তৃতীয় পক্ষের কথা। আমেরিকার প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান এই দুই পার্টি ছাড়া কোন তৃতীয় পক্ষের প্রার্থী বিজয়ী হওয়া অসম্ভব। তারপরও আমেরিকান লিবারেটারিয়ান পার্টি গত ১২ সাল থেকে ভোট বাজারে আসছে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে। কিন্তু নানা ঘটনার প্রেক্ষিতে এবারে এর উত্থানের লক্ষণ যেন কিছু জোরদার। কারণ গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টির মঞ্চে ট্রাম্প যেভাবে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন তাতে দেখা যাচ্ছে লিবারেটারিয়ান পার্টি সম্পর্কে অনেক নতুন ভোটদাতার মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের সূচনা হয়েছে। প্রাইমারি থেকে শুরু করে ক্রমবর্ধমান ট্রাম্পের নমিনি হয়ে ওঠা তর্ক, বিবাদবিসম্বাদে লিপ্ত দল থেকে কেউ কেউ মুক্তির পথ খুঁজেছেন তৃতীয় একটি দলে। এমনকি উচ্চ প্রোফাইল রিপাবলিকান স্ট্রাটেজিস্ট ম্যারি ম্যাটালিন পর্যন্ত দলের মনোনীত প্রার্থীর জুতায় পা গলাতে অস্বীকার করে সুইচ করে গেছেন লিবারেটারিয়ান দলে।

কিন্তু কারা এই লিবারেটারিয়ান দল? এই দল থেকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী গ্যারি জনসন। সাবেক রিপাবলিকান গবর্নর যিনি নিউ মেক্সিকো থেকে দু’বার নির্বাচিত হয়েছিলেন গবর্নর হিসেবে এবং লিবারেটারিয়ান পার্টি তাকে ২০১২ সালে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেছিল। বর্তমানে তিনি একজন কল্কি বা পট এন্টারপ্রেনার। ক্যানাবিজ স্যাটিভা ইনক নামে নেভাদা বেজড মারিজুয়ানা ফার্মের সিইও এবং প্রেসিডেন্ট। জনসন বলেন, ধূমপান এবং গাঁজায় দম দেয়া সম্পর্কে সমাজে একটি বিতৃষ্ণা রয়েছে। যেখানে ধূমপান মানুষকে অসুস্থতার পথে ঠেলে দেয় সেখানে গাঁজা কাজ করে ওষুধ হিসেবে। মৃগী রোগীদের ক্ষেত্রে, শিশুদের কাশির ড্রপ হিসেবে মিছরি গাঁজা ও আরও কিছু অসুখের ক্ষেত্রে একটি আনন্দদায়ক বিকল্প।’ আমি এমনই একটি পণ্য বিপণনের কাজ করে যাচ্ছি। ‘একথা অবগত করা প্রয়োজন, মারিজুয়ানা মার্কিন ফেডারেল আইন অনুযায়ী অবৈধ হলেও ২২টি রাজ্য ও ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়া ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের জন্য এই ড্রাগ বৈধ করেছে এবং কলোরাডো ও ওয়াশিংটন রাজ্যে সম্প্রতি বিনোদনমূলক ব্যবহারের জন্য গঞ্জিকা সেবন বৈধ করা হয়েছে।

জনসনের মতামত হলোঃ ‘বহু বছর যাবত আমাদের নিয়ে মানুষ হেসেছে যখন আমরা ড্রাগ যুদ্ধ বন্ধ করা কিংবা সমলিঙ্গ বিবাহ আইনসম্মত করার কথা বলেছি।’

তিনি আরও বলেনঃ ‘আমি মনে করি আগামী ১০ বছরের মধ্যে অধিকাংশ আমেরিকানের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গাঁজা বৈধ করা হবে’। তিনি এ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানান, ‘আর কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যা হবে তাই হবে বাকি দুনিয়াতেও।

লেখকঃ আমেরিকা প্রবাসী সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Related posts