November 20, 2018

লুটপাটে সর্বসান্ত, সত্যিই বেমানান দক্ষিণ সুদান!

400
আফ্রিকান কোনো দেশের রাজধানীর এমন চিত্র সত্যিই বেমানান। হাতে গোনা কিছু দামি হোটেল এবং রেস্টুরেন্টের সামনে পার্ক করে রাখা আছে কালো এসইউভি। অথবা দামি গাড়িগুলো ছুটে চলছে শহরের সবচেয়ে নামী-দামি এলাকার দিকে যেখানে আছে মূলত সরকারি মন্ত্রণালয় এবং সেনাবাহিনীর বিশাল সব কম্পাউন্ডগুলো। ক্যাডিলাক, মার্সিডিজ জিএল এবং বিলাসবহুল হ্যামারগুলো ব্লেগরাভিয়া অথবা নাইটব্রিজ স্কয়্যারের সামনে অপেক্ষা করছে।

উল্লিখিত এই জায়গাটি হলো যুদ্ধবিধ্বস্ত দুক্ষিণ সুদানের রাজধানী জুবা। ঐর্শ্বয্য আর চকচকে প্রশাসনিক চেহারার মোড়কে ঢাকা তেল সম্পদে ধনী এই দেশটি বিশ্বের অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনুন্নত ২৫টি দেশের মধ্যে একটি। চার মিলিয়ন জনগোষ্ঠির দেশটির চারভাগের তিনভাগই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। খাদ্যসঙ্কটে ইতোমধ্যেই দেশটির দশ সহস্রাধিক মানুষ দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি দাড়িয়ে আছে। দক্ষিণ সুদানের এই অবস্থা যদি দীর্ঘদিন চলতে থাকে তাহলে গননাতীত সংখ্যক মানুষ অনাহারে মারা যেতে পারে বলে ইতোমধ্যেই জাতিসংঘের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

দেশ হিসেবে দক্ষিণ সুদানের ডলার রিজার্ভ একেবারেই শূণ্য। এতদিন পর্যন্ত ডলার রিজার্ভ মানেই দক্ষিণ সুদানে বোঝানো হতো শুধু খাবার এবং পণ্য কেনার সক্ষমতা, অর্থাৎ ডলারের রিজার্ভ এতটাই কমে গিয়েছিল যে সাধারণ চাহিদা মেটাতেই সব টাকা শেষ। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটির প্রশাসন আশা করছে যে, হয়তো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল কোনো একটা পদক্ষেপ গ্রহন করবে। আর যদি মুদ্রা তহবিল দুক্ষিণ সুদান প্রশ্নে সহায়তার হাত বাড়াতে চায় তাহলে দেশটির ধনীক শ্রেণি নিঃসন্দেহে জনসমক্ষে তাদের কৃতকর্মের জন্য উন্মোচিত হয়ে যাবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্ণীতি আর স্বজনপ্রীতির কারণে দেশটির ধনীক শ্রেণি প্রায় চার বিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিয়েছে গত পাঁচ বছরে।
399
সেই অর্থ কোথায় গেল?

পার্শ্ববর্তী দেশ কেনিয়া এবং উগান্ডার সম্পদের তালিকার দিকে তাকালে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। দেশ দুইটিতে দক্ষিণ সুদানের অনেক ধনী ব্যক্তি নিজের নামে বিশাল সব সম্পদ ক্রয় করে রেখেছেন। এই সম্পদ কিনে রাখার তালিকায় শুধু ধনীরাই নয়, রাজনীতিবিদ এবং আমলারাও আছেন। অনেকের কাছে এমনও বিলাসবহুল বাড়ি আছে যার দাম এক মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর কথা বাদ দেয়া যাক আপাতত। খোদ ওয়াশিংটন ডিসিতে বিশ্ব ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ভবনের কাছাকাছিই দক্ষিণ সুদানের কয়েকজন নাগরিকের নামে রয়েছে বিশাল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি। ওয়াশিংটন ডিসিতে থাকা বাড়িটিরই দাম প্রায় তিন মিলিয়ন ডলার। কলোরাডো এবং অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে বিশাসবহুল শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটা এখন আর কোনো গোপন বিষয় নয় যে, এই দুটি শহরেও দক্ষিণ সুদানের কিছু ধনীদের ব্যবসা এবং প্রতিষ্ঠান আছে।

জাতিসংঘের তদন্তকারী দলের অনুসন্ধানে দক্ষিণ সুদানের ধনীদের এই গোপন সম্পদের পরিমাণ জানা গেছে। সম্প্রতি দক্ষিণ সুদানের রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে ধনীক শ্রেণির এই বিপুল সম্পদের খবর জাতিসংঘের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত পৌছে যায়। আর এই তথ্যের ভিত্তিতে বর্হিবিশ্বে থাকা দক্ষিণ সুদানের ধনীদের সকল সম্পদ অনতিবিলম্বে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রেসিডেন্ট সিলভা কিরের বর্হিদেশ ভ্রমনের উপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট সিলভা কিরের অভিযোগ হলো, ২০১৩ সালে সাবেক সেনাপ্রধান রিয়েক ম্যাচার একটি সংঘবদ্ধ ক্যু করে। স্বাধীন দেশ হিসেবে জন্মলাভের মাত্র দুই বছরের মাথায় এই ঘটনা ঘটানো হয় এবং ওই ঘটনা দেশটিকে আবারও অশান্তির দিকে নিয়ে যায়। গত সপ্তাহেই হঠাৎ করে ঘোষণা আসে যে, রিয়েক ম্যাচার আবারও ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং তাকে জুবায় আসতে বলা হয়েছে। ধারনা করা হচ্ছে, এরফলে দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধপরিস্থিতির অবসান হবে।

কিন্তু এই ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পেছনে রয়েছে দেশটির চূড়ান্ত অর্থনৈতিক দুরাবস্থা। বাস্তবতা হলো, দক্ষিণ সুদান বর্তমানে মুদ্রা শূণ্য। দেশটির তেল সম্পদ তছনছ হয়ে গেছে এবং প্রায় প্রতিটি প্রশাসনিক ক্ষেত্রই ভয়াবহ মাত্রার দুর্ণীতিতে আক্রান্ত। এখন, তেল সম্পদে ধনী এই তরুণ দেশটিকে আন্তর্জাতিক ডোনাররা ফিরে দাড়ানোর সুযোগ দেবে কিনা সেটাই দেখার বিষয়। জাতিসংঘে দক্ষিণ সুদানের প্রতিনিধি টবি ল্যাঞ্জার গত বছর বলেছিলেন যে, সরকার তার দেশের জনগণের একেবারে বাহ্যিক চাহিদাগুলো মেটানোর জন্যও অর্থ পাচ্ছে না। দক্ষিণ সুদানের নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল গৃহযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সরকারকে সহায়তা করতে পারে না।

দক্ষিণ সুদানের সরকারি পর্যায়ে দুর্ণীতি এতটাই প্রকট যে প্যারিস ক্লাব গ্রুপ দেশটিকে যে চার বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছিল তার কাগজপত্রও গায়েব হয়ে গেছে। মূলত ২০০৫ সাল থেকে দেশটির তেলক্ষেত্রের উপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা হলেও কার্যত তেল থেকে প্রাপ্ত বিশাল অংকের অর্থ পুরোটাই দেশিয় ধণীক শ্রেণির মধ্যে ভাগাভাগি হয়েছে।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি

Related posts