November 21, 2018

‘লিভ’ না ‘রিমেইন’

ঢাকাঃ  ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা না থাকা নিয়ে ঐতিহাসিক গণভোট হয়ে গেলো বৃটেনে। সাড়ে চার কোটি ভোটার ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন তাদের রায়। এখন শুধু তা প্রকাশের অপেক্ষা। বাংলাদেশ সময় বেলা ১২টায় পাওয়া যাবে ভোটের পুরো ফল। আর এ ফলাফলেই নির্ধারিত হবে তিন শ’ বছরের কিংডম অব বৃটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকবে কি থাকবে না। গতকাল বৃটিশ সময় সকাল ৭টা থেকে শুরু করে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে ভোটগ্রহণ। ইউরোপীয় ইউনিয়নে বৃটেনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণী এই গণভোটে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ৪ কোটি ৬৪ লাখ ৯৯ হাজার ৫৩৭ জন। এ যাবৎ কালের ইতিহাসে যা রেকর্ডসংখ্যক। বৃটেনের ইতিহাসে এটা তৃতীয় গণভোট। ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা না থাকা নিয়ে লিভ ও রিমেইন শিবিরের মধ্যে চার মাসের ব্যাপক প্রচারণা লড়াইয়ের পর গতকাল অনুষ্ঠিত হলো ঐতিহাসিক এই গণভোট। ব্যালট পেপারে ভোটারদের প্রতি প্রশ্ন ছিল: ‘যুক্তরাজ্যের কি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য থাকা উচিত নাকি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করা উচিত?’ লিভ বা রিমেইন যে পক্ষ অর্ধেকের বেশি ভোট পাবে তারাই জয়ী বলে বিবেচিত হবে।

বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন সস্ত্রীক ভোট দেন লন্ডনে। লেবার দলের নেতা জেরেমি করবিন ভোট দেন ইসলিংটনে। গ্ল্যাসগোতে ভোট দেন স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার নিকোলা স্টারজন। জাস্টিস সেক্রেটারি মাইকেল গোভ ও তার স্ত্রী সারাহ ভাইন কেনসিংটনের ভোটকেন্দ্রে ভোট প্রদান করেন। ইউকিপ দলের নেতা নাইজেল ফারাজ কেন্ট শহরের বিগিন হিলের নিকটস্থ একটি ভোট কেন্দ্রে ভোট দেন। গতকাল ভোটগ্রহণ চলাকালে ভোটের সম্ভাব্য ফল বা এক্সিট পোল ঘোষণার ক্ষেত্রে বৃটিশ গণমাধ্যমগুলোকে সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ। শুধুমাত্র ভোটগ্রহণ শেষ হবার পরই ফল প্রচারের কথা বলা হয়।

ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর সিল করা ব্যালট বাক্সগুলো পাঠানো হবে বৃটেন জুড়ে ৩৮২টি স্থানীয় ভোটগণনা এলাকার গণনাকেন্দ্রে। এর মধ্যে ৩৮০টি হলো ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের স্থানীয় সরকারগুলোর এলাকা। আর নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ও জিব্রাল্টারের জন্য একটি করে। পরে স্থানীয় ভোট গণনা কর্মকর্তারা ১২টি নির্বাচনী অঞ্চলের আঞ্চলিক ভোট গণনা কর্মকর্তাদের কাছে ফল জানাবেন। সব এলাকার ভোট গণনা সম্পন্ন হওয়ার পর ফল ঘোষণা করা হবে। ম্যানচেষ্টার টাউনহল থেকে ভোটের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করবেন গণভোটের চিফ কাউন্টিং অফিসার এবং ইলেক্টরাল কমিশনের চেয়ারম্যান জেনি ওয়াটসন। নির্বাচন কমিশন ধারণা করছে, আজ বৃটিশ সময় সকাল সাতটার (বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টা) দিকে চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করা সম্ভব হবে।

এদিকে, গতকাল ইউরোপীয় ইউনিয়ন জুড়ে সব দেশের পত্রিকার শিরোনাম ছিল বৃটেনের গণভোট। বেশির ভাগ পত্রিকাতেই ইইউতে থাকার জন্য বৃটিশ নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। জার্মান পত্রিকা বিল্ডের ১৯৬৬’র বিশ্বকাপের গোল মেনে নেয়ার প্রতিশ্রুতি থেকে শুরু করে বেলজিয়ামের লে সয়্যার পত্রিকায় ‘আমাদের সঙ্গে থাকো’ আহ্বান। ইউরোপ জুড়েই সংবাদপত্রের শিরোনাম ছিল গণভোট।

ফরাসি দৈনিক লিবারেশন দুটো ইস্যু ছেপেছে। একটির শিরোনাম ‘হু’জ ইন’ অপরটির ‘হু’জ আউট’। দৈনিকটির সম্পাদক লঁরা জফ্রিন সতর্কবার্তা দিয়েছে বলেছেন, বৃটেন ইইউ থেকে বের হয়ে এলে এমন এটা নজির সৃষ্টি হবে যা অন্য দেশগুলোর মধ্যে জাতীয়তাবাদী মনোভাব তীব্র করে তুলতে পারে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ফরাসি মিডিয়াগুলোর শিরোনাম ছিল ‘ব্রেক্সিট অর নট ব্রেক্সিট’।

ইতালির পত্রিকার গুলোর প্রথম পাতায় গতকাল আধিপত্য ছিল গণভোট ইস্যু। লা রিপাবলিকা শিরোনাম করেছে ‘ইইউরোপের দীর্ঘতম দিন’।

স্পেনের এল পাইস দৈনিকের শিরোনামে আবেগি ভাষায় ইউরোপে থাকতে আহ্বান জানানো হয়েছে বৃটিশদের। বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবারের ভোট ইউরোপের প্রতিটি নাগরিকের ওপর প্রভাব ফেলবে। শিরোনাম ছিল ‘বেটার ইন দ্যান আউট, প্লিজ।’ একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন এল মুন্ডো।

নরওয়ের আফটেনপস্টেন দৈনিকের শিরোনাম ছিল ‘আজ ইউরোপকে ভাগ করে দিতে পারে বৃটেন’। দাগেন্স নারিংস্লিভ সংবাদপত্রের শিরোনাম ছিল ‘শঙ্কা হলো আবেগ বৃটেনকে ইউরোপের বাইরে নিয়ে যেতে পারে’

বেলজিয়ামের দৈনিক লে সয়্যারের প্রথম পাতায় একটি সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল ‘স্টে উইথ আস’ বা আমাদের সঙ্গে থাকো।

শেষ জরিপে ১০ পয়েন্ট এগিয়ে ‘রিমেইন’

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে (ইইউ) বৃটেনের থাকা কিংবা না থাকা নিয়ে গণভোটের পূর্বে সর্বশেষ অনলাইন জনমত জরিপে ১০ পয়েন্টে এগিয়ে আছে ‘রিমেইন’। বৃটিশ দৈনিক দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট এ খবর দিয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, দ্য পপুলাস ভোটাভুটি শুরু হওয়ার আগে অনলাইনে এ জনমত জরিপ চালায়। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ৫৫ শতাংশ মানুষই ইইউতে থেকে যাওয়ার পক্ষে। বাকি ৪৫ শতাংশ ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে। শেষ মুহূর্তে অনেক জনমত জরিপ হয়েছে। প্রায় সব বড় জনমত জরিপেই দেখা গেছে বেশিরভাগ মানুষ ইইউতে থেকে যাওয়ার পক্ষে। তবে পপুলাসের জরিপে সবচেয়ে বেশি ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে ‘রিমেইন’ ক্যাম্পেইন।

এ জনমত জরিপ পর অনেক জরিপ বিশেষজ্ঞ বলছেন গণভোটে মানুষ রয়ে যাওয়ার পক্ষেই রায় দেবেন, এমন সম্ভাবনা এখন অনেক বেশি। নির্বাচন বিশ্লেষক মাইক স্মিথসন বলেন, এখন যদি দেখা যায় মানুষ শেষ পর্যন্ত ‘লিভ’ বা সরে যাওয়ার পক্ষে রায় দিয়েছেন, তাহলে সাধারণ নির্বাচনের চেয়েও জনমত জরিপের জন্য এটা হবে আরো বড় ধরনের বিব্রতকর অবস্থা। কেননা, গত সাধারণ নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করবে, এমনটা জনমত জরিপে উঠে আসেনি।

আবার অনেকে খারাপ আবহাওয়ার দরুন ভোটে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন। বিশেষ করে, যেসব বড় বড় এলাকায় রয়ে যাওয়ার পক্ষের মানুষজন বেশি, সেসব অনেক এলাকায় ব্যাপক বৃষ্টি হয়েছে। কিছু এলাকায় দেখা দিয়েছে বন্যা। তাই মানুষ কম ভোট দেবে। আর তাতে গণরায় ‘লিভ’ বা ছেড়ে যাওয়ার দিকে ঝুঁকে যেতে পারে। আবার অনেকে জরিপের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। কেননা, অস্বাভাবিক সংখ্যক মানুষ বলেছেন যে, তারা শেষ মুহূর্তে হয়তো মর্জি পাল্টাতে পারেন।মানব জমিন

Related posts