September 21, 2018

লিবিয়ায় কেমন আছেন বাংলাদেশিরাঃ খোলা হয়েছে হটলাইন

Bangladeshi in Libya

28 Mar, 2016, লিবিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকলিবিয়ায় অবস্থানরত ২০ থেকে ২৫ হাজার বাংলাদেশি চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবনযাপন করছে। ত্রিপোলিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রতি সপ্তাহে তিন থেকে চারটি বাংলাদেশি অপহরণের খবর আসছে এবং যতটা সম্ভব তারা মধ্যস্থতা করে তাদের ছাড়িয়ে আনছে। এমনকি দূতাবাসের কর্মকর্তাদেরও একাধিকবার অপহরণ করার পরে মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে আনা হয়েছে। ত্রিপোলি বা বেনগাজি যেখানে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশিরা থাকেন, সেখানে সরকার ব্যবস্থা অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং পুলিশ বা আর্মি প্রশাসন কাজ করে না।

বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে লিবিয়ার এমন ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন গত দুই বছর ধরে ত্রিপোলি দূতাবাসে কর্মরত প্রথম সহকারী মোজাম্মেল হক।

লিবিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি
লিবিয়াতে বর্তমানে চার থেকে পাঁচটি সরকার শাসন করছে। মিলিশিয়া বাহিনীর দখলে ত্রিপোলি। ত্রিপোলির নির্বাচিত সরকার ত্রিপোলি থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। বেনগাজিতে আরেকটি সরকার শাসন করছে। আর তিউনিশিয়াতে অবস্থান করছে জাতিসংঘ সমর্থিত সরকার।

মোজাম্মেল হক বলেন, বর্তমানে এশিয়ার মধ্যে শুধু বাংলাদেশ ত্রিপোলিতে তার পূর্ণ দূতাবাস খোলা রেখেছে। এখানে রাষ্ট্রদূত ও চার কর্মকর্তাসহ ১৯ জন কর্মরত আছেন। এর বিপরীতে ভারতীয় দূতাবাসে একজন কর্মকর্তা শুধু বাসা থেকে কাজ করেন। পাকিস্তানের একজন কর্মকর্তা মাঝে মাঝে ত্রিপোলিতে আসেন। মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশ, ইউরোপের সব দূতাবাস, জাতিসংঘ, রেডক্রসসহ সব বৈশ্বিক সংস্থার অফিস লিবিয়াতে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া আছে যে, অফিস ও বাসা ছাড়া অন্য কোথাও না যাওয়ার জন্য।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমরা এখানে কাজ করছি। আমাদের অনুবাদককে দুবার অপহরণ করার পর মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে আনা হয়েছে বলে মোজাম্মেল হক জানান।

বাংলাদেশি শ্রমিকদের অবস্থা

এখানে বিদেশি শ্রমিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় আছে বাংলাদেশিরা। এখানকার অর্থনীতির অবস্থা অত্যন্ত খারাপ এবং বেশির ভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ।

মোজাম্মেল হক বলেন, দুই বছর আগে ১২০০ দিনার দিলে ১ হাজার ডলার পাওয়া যেত কিন্তু বর্তমানে ৩ হাজার ৮০০ দিনারে ১০০০ ডলার পাওয়া যায়।

এখানে সাধারণভাবে বাংলাদেশিদের বেতন ৫৫০ থেকে ৬০০ দিনার এবং ফরমাল চ্যানেলে তাদের টাকা পাঠানোর কোনও সুযোগ নেই।

শুধু শ্রমিকরা নন, দূতাবাসের কর্মকর্তারাও তাদের পরিবারের জন্য কোনও টাকা পাঠাতে পারছেন না বলে জানান মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, প্রতি সপ্তাহে তিন থেকে চারটি অপহরণের খবর তাদের কাছে আসে এবং তারা তাদের সাধ্যমতো সাহায্য করার চেষ্টা করেন।

এখানে নিয়মিত পুলিশ বাহিনী নেই, ফলে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করে অপহরণের সুরাহা করা সম্ভব হয় না।

বাংলাদেশি শ্রমিকদের একটি বড় অংশ বেনগাজিতে থাকে এবং সেখানকার পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। গত শনিবার রাতে চারজন বাংলাদেশিকে সেখানে ব্রাশ ফায়ার করে মেরে ফেলা হয়।

মোজাম্মেল হক জানান, লিবিয়াতে তার দুই বছরের কর্মজীবনে সেখানকার সরকারের কাছ থেকে তিনি বেনগাজিতে যাওয়ার অনুমতি পাননি।

শ্রমিকরা বাংলাদেশে ফেরত আসে না কেন?

লিবিয়াতে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা চরম দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে দিনযাপন করলেও তারা দেশে ফেরত আসতে আগ্রহী নন। কয়েক মাস আগে একজন বাংলাদেশির একটি দুর্ঘটনায় তার একটি হাত কেটে ফেলতে হয়। আমি তাকে দেশে ফেরত চলে যেতে বললে তিনি জানান, পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে তিনি লিবিয়ায় এসেছেন। তিনি ফেরত গেলে ধার শোধ করবেন কিভাবে।
আরেকটি ঘটনার কথা জানাতে তিনি বলেন, আরেকজন শ্রমিকের বাসায় আগুন লেগে গেলে তিনি তিনতলা থেকে লাফ দেওয়ার পরে তার একটি পা নষ্ট হয়ে যায়। মোজাম্মেল হক বলেন, আমাদের এক কর্মকর্তা তার সঙ্গে দেখা করে তাকে বলা হয়, দূতাবাস তার টিকিটের টাকা দেবে কিন্তু তারপরেও সে দেশে ফেরত যেতে চাননি। কারণ তিনি চার লাখ টাকা খরচ করে এসেছেন।

লিবিয়াতে অবস্থিত বাংলাদেশিদের চিত্র কমবেশি এ ধরনের এবং সেজন্য তারা দেশে ফেরত যেতে আগ্রহী নয়।

সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ
লিবিয়া ও ইতালির মাঝখানে ভূমধ্যসাগর এবং এটি পাড়ি দিয়ে অনেক বাংলাদেশি ইউরোপে ঢুকে পড়ছে।

মোজাম্মেল হক বলেন, এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক যাত্রা এবং অনেক বাংলাদেশি এভাবে সাগর পাড়ি দেওয়ার সময়ে মারা গেছেন বলে তাদের কাছে বিভিন্ন সূত্র থেকে খবর এসেছে।

ইতালির ইন্টেরিয়র মন্ত্রণালয় আমাদেরকে জানিয়েছে, গত এক বছরে ৯ হাজার ৯৯৭ বাংলাদেশিকে তারা নিবন্ধিত করেছে যারা সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পৌঁছেছেন।

মোজাম্মেল হক বলেন, আমরা জানি ঢাকায় একটি সংস্থা এখানে বাংলাদেশি পাঠানোর জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে এবং লিবিয়ার বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় তারা এখানে চাকরির জন্য আসছেন না বলেই মনে হয়। তিনি বলেন, ইউরোপে যাওয়ার জন্য তারা যদি এখানে আসে তবে সেটি সুইসাইডাল হবে, কারণ আমরা জানি না ভূমধ্যসাগরের নীল পানির নিচে কত বাংলাদেশি ডুবে মারা গেছেন।

খোলা হয়েছে হটলাইন

লিবিয়ায় গোলাগুলিতে চার বাংলাদেশি নিহতের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসকে সব দিকে খোঁজ-খবর রাখতে বলা হয়েছে। সেখানে একটি হটলাইন (+২১৮৯৪৪৬৪২১৫৪) খোলা হয়েছে। লিবিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশিদের এ নম্বরে সবসময় যোগাযোগ এবং কোনো ধরনের সমস্যা হলে দূতাবাসে খবর জানাতে বলা হয়েছে।

উল্লেখ্য, লিবিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বেনগাজিতে বিবদমান দুটি গ্রুপের সংঘর্ষের কবলে পড়ে রোববার চার বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।
শাহরিয়ার আলম ফেসবুকের মাধ্যমে নিহতদের নাম উল্লেখ করেন, ‘ময়মনসিংহের হুমায়ুন কবির, রাজবাড়ীর জসিমউদ্দিন ও মো. হাসান। আরেকজনের পরিচয় এখনও জানা যায়নি।

শাহরিয়ার বলেন, নিহত চারজনের মরদেহ দেশে পাঠাতে সব ব্যবস্থাও নিতে তাদের বলা হয়েছে।

Related posts