November 14, 2018

লন্ডনে ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় রাশিদ ঘান্নুশীর দর্শন’ নিয়ে সেমিনার

4

মুহাম্মদ নূরে আলম বরষণ লন্ডন থেকে: প্রগ্রেসিভ ইউনিয়ন অব জার্নালিস্ট ইউকের উদ্যোগে আয়োজিত এক সেমিনারে সমকালীন ব্রিটিশ বাংলাদেশী গবেষক ড. মুহম্মদ কামরুল হাসান বলেন, তিউনিশিয়ার বিখ্যাত রাজনীতিবিদ দার্শনিক রাশিদ ঘান্নুশি ছিলেন সমসাময়িক মুসলিম বিশ্বের একজন মেধাবী ও সৃজনশীল চিন্তাবিদ। তিউনিশিয়া মূল ধারার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শীর্ষ নেতা, ঘান্নুশি মনে করেন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষকে সেকুলার হতে হবে তা নয়, বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক উন্নয়নের পাশাপাশি আইনের শাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়নে ও আর্থ- সামাজিক উন্নয়নের জন্য সেকুলার, বাম, জাতীয়তাবাদী এবং ইসলামপন্থীদের সাথে সমন্বয় করা খুবই জরুরী ।

গতকাল রোববার রাতে লন্ডন মুসলিম সেন্টারে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারে মুসলিম চিন্তাবিদ দার্শনিক রাশিদ ঘান্নুশির চিন্তার দর্শনের উপর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন ।

প্রগ্রেসিভ ইউনিয়ন অব জার্নালিস্ট ইউকের সম্বনয়কারী সাংবাদিক নূরে আলম বরষণের পরিচালনায় সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন, আব্দুল হান্নান মিয়াজী, দ্যা গ্লোবাল নিউজের সম্পাদক নাজমুল হোসাইন, সাংবাদিক মাহবুব আলী খানশূর, মানবাধিকার কর্মী মনিরুল হক, সাইদ মুহম্মদ বাকী, মাহমুদ আহমদ, জাবেদ হোসাইন, আব্দুল আউয়াল তারেক, আদিল মিয়া প্রমুখ।

বুদ্ধিজীবী ড. মুহম্মদ কামরুল হাসান বলেন, মুসলিম বিশ্বের অবিসাংবাদিত নেতা এবং তিউনিশিয়া বিরোধীদলীয় “আন নাহাদা পার্টির সহ-প্রতিষ্ঠাতা দার্শনিক রাশিদ ঘান্নুশির গণতান্ত্রিক ভাবে রাষ্ট্রে ইসলাম ও জনগণের কল্যাণের কথা চিন্তা করেন। তাঁর যৌথ প্রতিষ্ঠিত দল ১৯৭২ সালে ‘ইসলামী দল’ (আল জামায়াহ আল ইসলামিয়্যাহ) নাম দিয়ে তিউনিশিয়ায় প্রথম ইসলামী আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর ১৯৮১ সালে এটি ‘ইসলামী ধারার আন্দোলনে’ (হারাকাত আল ইতিজাহ আল ইসলামী) পরিণত হয়। সর্বশেষ, ১৯৮৯ সালে এটি ‘রেনেসাঁ আন্দোলনে’ (হারাকাত আন নাহদা) পরিণত হয়।

মোটাদাগে, এই তিনটি সংগঠন ইসলামী আদর্শের তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ধরনকে ধারণ করে। প্রথম দলটি ছিল পুরোপুরি একটি ধর্মীয় আন্দোলন। তারা মসজিদগুলোতে ইসলামী আদর্শের প্রচার করতো। ‘আল মারিফা’ (জ্ঞান) নামে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ করতো। পরিবার ও শিক্ষা ইত্যাদি সামাজিক ও ধর্মীয় বিষয়গুলো ছিল এর বিষয়বস্তু। এছাড়া আন্দোলনটির তরুণদেরকে তারা ইসলামী নৈতিকতা শিক্ষা দিতো। এইসব পরিবর্তনে প্রজ্ঞ দার্শনিক রাশিদ ঘান্নুশির সুদুর প্রসারি চিন্তা ছাপ প্রমাণিত হয় আন নাহাদা ক্ষমতায় আসার মধ্যে।

ড. কামরুল হাসান বলেন, ১৯৮৯ সালে ‘আন নাহদা মুভমেন্ট পার্টি’ নাম নিয়ে নতুনভাবে কাজ শুরু করে। এর পেছনে একটা প্রেক্ষাপট রয়েছে। ১৯৮৭ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাবিব বুরগিবাকে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে হঠিয়ে ক্ষমতায় আসেন যাইন আল আবেদিন বেন আলী। তার সময়ের গণমুখী রাজনীতির সুযোগ গ্রহণ করা ছিল এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য। বেন আলী শুরুর দিকে গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং একটি বহুত্ববাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল নিজের ক্ষমতার বৈধতাকে আরো শক্তপোক্ত করা। পরবর্তীতে তিনি এই প্রতিশ্রুতি আর রক্ষা করেননি। নয়া সরকারকে আশ্বস্ত রাখা এবং এবং রাজনৈতিক দল সংক্রান্ত তিউনিশিয়ার নতুন আইন অনুযায়ী (যে আইনে ধর্মীয় দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে) নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা তখন প্রয়োজনীয় ছিল। তাই দার্শনিক রাজনৈতিক নেতা ঘান্নুশি এবং ইসলামপন্থী অন্যান্য নেতৃবৃন্দ সংগঠনের নাম পরিবর্তন, নাম থেকে ‘ইসলামী’ শব্দটি বাদ দেয়া এবং সংগঠনের আদর্শের পুনর্মূল্যায়ন করার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে নতুন নাম হয় ‘আন নাহদা মুভমেন্ট’। এই প্রেক্ষাপটে দাবি করা হয়েছিল, রাজনৈতিক ইসলাম সম্পর্কে ক্লাসিকাল ইসলামী আন্দোলনগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে তিউনিশিয়ার ইসলামী আন্দোলনের জন্য আন নাহদা নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দিয়েছে।

ড. কামরুল হাসান বলেন, সর্বশেষ কংগ্রেসে ঘানুশী তার বক্তব্যে বলেছেন, “নিছক মতাদর্শ, বড় বড় শ্লোগান আর রাজনৈতিক ঝগড়া-বিবাদ দিয়ে আধুনিক রাষ্ট্র চলে না। বাস্তব কর্মসূচির আলোকেই রাষ্ট্র চালাতে হয়। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক ইসলামী আন্দোলনগুলোর প্রচলিত প্যান-ইসলামিক এজেন্ডা থেকে আন নাহদা সরে এসে শুধু জাতীয় এজেন্ডা অর্থাৎ তিউনিশিয়ার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিয়োজিত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কাঠামোগত অর্থে এই সিদ্ধান্তের মানে হলো, আন্দোলনটি একটি গতানুগতিক দলে পরিণত হবে এবং ধর্মীয় দাওয়াতী কার্যক্রম থেকে নিজেদেরকে গুটিয়ে নেবে। এ বিষয়টি নিশ্চিত করে ঘানুশী বলেন, “আমরা ধর্মকে রাজনৈতিক বিবাদ থেকে দূরে রাখতে চাই। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থেকে দূরত্ব বজায় রেখে, দলীয়করণ থেকে মুক্ত রেখে মসজিদগুলোর পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য আমরা আহ্বান জানাই।

ড. কামরুল হাসান তাঁর প্রবন্ধে আরও বলেন, আজ থেকে তিরিশ বছর পূর্বে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বুরগিবা বিরোধী দলের একজন শীর্ষনেতাকে পুনরায় বিচারের আওতায় আনার নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। ওই নেতার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে বুরগিবা যথেষ্ট মনে করেননি। তাই তিনি তাকে ফাঁসিতে ঝুলাতে চেয়েছিলেন। মৃত্যুদণ্ডের জন্য অপেক্ষমান এই ব্যক্তিটি ছিলেন শায়খ রশিদ ঘানুশী। আরব বসন্তের আধ্যাত্মিক নেতা। বিপ্লবোত্তর তিউনিশিয়ার জনক বলে অনেকে যাকে সম্মান করে থাকেন। বুরগিবার পর ক্ষমতায় আসেন আরেক স্বৈরশাসক বেন আলী।

ড. কামরুল হাসান আরও বলেন, ১৯৮১ সালের ৬ জুন এটি ‘ইসলামী ধারার আন্দোলন’ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। নতুন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাকালীন দলিলপত্র অনুযায়ী এর মধ্যে রাজনৈতিক ইসলামী আন্দোলন গুলোর চারটি গতানুগতিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়:

১. সংগঠনটি ধর্ম ও রাজনীতিকে অবিচ্ছেদ্য দুটি সত্ত্বা হিসেবে বিবেচনা করে। ইসলামের সামগ্রিক রূপকে গ্রহণ করার ঘোষণা দেয়। সেক্যুলারিজম এবং প্রাগম্যাটিজম হতে মুক্ত থেকে রাজনীতি করার ব্যাপারে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে। ধর্ম ও রাজনীতির পৃথকীকরণের চিন্তাকে তারা খ্রিস্টীয় ধারণার অনুপ্রবেশ এবং ‘আধুনিকতা’র নেতিবাচক প্রবণতা হিসেবে সাব্যস্ত করে।

২. এই সংগঠন আত্মপরিচয়ের রাজনীতির উপর গুরুত্বারোপ করে। এ জন্য তারা দুটি কাজকে প্রাধান্য দেয়: তিউনিশীয় ইসলামী ব্যক্তিত্বদের যথাযথ মূল্যায়ন এবং ইসলামী চিন্তার সংস্কার।

৩. স্থানীয়, আঞ্চলিক, আরব বিশ্ব এবং আন্তর্জাতিক অর্থাৎ সকল পর্যায়ে ইসলামের রাজনৈতিক ও সামাজিক উপাদানগুলোকে ফিরিয়ে আনার তৎপরতা’য় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা স্পষ্টতই প্যান-ইসলামী ভাবাদর্শকে গ্রহণ করেছে।

৪. লক্ষ্য অর্জনের জন্য সংগঠনটি ধর্ম ও রাজনীতির এক ধরনের মিশ্র পদ্ধতি ব্যবহার করে। এরমধ্যে রয়েছে ‘ইবাদত ও জনসমাগমের কেন্দ্র হিসেবে’ মসজিদের প্রকৃত ভূমিকা ফিরিয়ে আনা, ইসলামী ভাবধারাসম্পন্ন সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের সূচনা করা, স্বৈরতন্ত্রকে প্রতিরোধ করা, ইসলামী সরকারব্যবস্থার আধুনিক মডেল উপস্থাপন এবং এর উন্নয়ন সাধন করা, ইসলামের সামাজিক মূলনীতিগুলোর উন্নয়ন ও প্রয়োগ ইত্যাদি।

তিউনিশিয়া হচ্ছে আরব বসন্তের আঁতুড়ঘর। দেশটি আবারো আরব বিশ্বকে এক নতুন পথ দেখানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু এ প্রচেষ্টা কি সফল হবে? তিউনিশীয় গণতন্ত্র এখনো বেশ নাজুক। পর্যটন শহর সুসা’য় গতবছর সংঘটিত ব্রিটিশ পর্যটকদের উপর আইএসপন্থীদের নির্বিচার গুলিবর্ষণের ঘটনা থেকে এটি স্পষ্ট প্রমাণিত।

ড. কামরুল হাসান তাঁর প্রবন্ধে আরও বলেন, রাজধানী তিউনিসে ঘানুশীর সিদ্ধান্তকে বেশ সাদরেই গ্রহণ করা হয়েছে। তবে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। এ বিষয়টি আমরা বুঝতে পারি, যখন রাজধানী থেকে ২’শ কিলোমিটার দক্ষিণে দেশটির কেন্দ্রে অবস্থিত শহর সিদি বুজিদে পৌঁছি। এখানেই পাঁচ বছর আগে হতাশাগ্রস্ত ফল বিক্রেতা মোহাম্মদ বুআজিজি নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে মৃত্যুবরণ করার মাধ্যমে আরব বসন্তের সূচনা করে যান।

তিউনিশিয়ার জনগণ বার বার জোর দিয়ে বলার চেষ্টা করেছে যে, তাঁরা কট্টরপন্থা ও সহিংসতাকে সমর্থন করে না। আন-নাহদার রাজনীতিবিদ সাইয়্যেদ ফেরজানিসহ অনেকেই মনে করেন যে, মধ্যপন্থী মালিকি মাজহাবের প্রসারের ফলে ঐতিহাসিকভাবে তাঁরা চরমপন্থাকে পরিহার করেছেন। উল্লেখ্য, তিউনিশিয়ার ৯৮ শতাংশ মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে মালিকি মাজহাবের অনুসারী। এ ধরনের মধ্যপন্থী জাতীয়-মানস গঠনের পিছনে কেউ কেউ তিউনিশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরগিবার শাসনামল (১৯৫৭-১৯৮৭) এবং তাঁর আধুনিকায়ন প্রকল্পের সাংস্কৃতিক প্রভাবের কথা বলেন। এছাড়া তিউনিশিয়ায় তেমন কোনো জাতিগত, উপজাতীয় কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদী ধর্মীয় বিভেদ নেই বললেই চলে, যা অন্যান্য দেশে অনেক প্রকটভাবে দেখা যায়।

তিনি বলেন, আন-নাহদার নেতৃবৃন্দও বেন আলীর সময় বছরের পর বছর নির্বাসিত জীবন যাপন করেছেন। ১৯৯১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত আন-নাহদার নেতা রশিদ আল-ঘানুসী লন্ডনে নির্বাসিত ছিলেন। দলটির অন্যান্য শীর্ষনেতাদের অবস্থাও একই। এইসব অভিজ্ঞতার ফলে আন-নাহদার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার উপর এক ধরনের আধুনিকায়নের প্রভাব পড়ে। ফলে তাঁরা সমন্বয়মূলক আদর্শ ধারণ ও লালন করার সুযোগ পায়। তিউনিশিয়ার সেক্যুলাররা স্থিতিশীল নয় এবং আরব বিশ্বে তারা অতুলনীয়। বরগিবা এবং বেন আলীর অধীনে তিউনিশিয়া ছিল একমাত্র দেশ যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে হিজাব নিষিদ্ধ ছিল। রশিদ আল-ঘানুসীর মতামত ছিল আমরা নিষিদ্ধ বা জোর করার পক্ষে নয় বরং এটা নারীর নিজস্ব স্বাধীনতার ব্যাপার ।

Related posts