September 22, 2018

রেনুর অপেক্ষায় পরিবার

ঢাকাঃ  লাল মিয়া-রেনু আক্তার দম্পতি। সহায় সম্বলহীন। ঘরে দুই সন্তান। তারপরও দিন চলে যেতো তাদের। লাল মিয়া দিনমজুরি করতেন। নিজেরা কষ্ট করলেও স্বপ্ন ছিল সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করার। কিন্তু হঠাৎ করেই বছর দেড়েক আগে প্যারালাইজড হয়ে শয্যাশায়ী হন লাল মিয়া। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে তাদের। লাল মিয়ার স্ত্রী রেনু আক্তার সিদ্ধান্ত নেন বিদেশে গিয়ে ভাগ্য পরিবর্তনের। এ জন্য ধার-দেনা করে তাদের নিকট আত্মীয় লোকমানের মাধ্যমে একটি রিক্রুটিং এজেন্সিকে ৬০ হাজার টাকা দেন। সেই মোতাবেক গত বছরের ২৫শে সেপ্টেম্বর দেশ ছাড়েন কিশোরগঞ্জের সদর উপজেলার রশিদাবাদ গ্রামের রেনু আক্তার। কিন্তু সেই রেনু আক্তারের খোঁজ নেই প্রায় দুই মাস। তার দুই সন্তান এবং কর্ম অক্ষম স্বামী মানবেতর জীবনযাপন করছেন। হতাশা নেমে এসেছে তার পরিবারে। অন্যদিকে রেনু আক্তার মানসিক রোগী হয়ে গেছেন এমন কথা বলে তাকে গত ১৭ই মার্চ দেশে পাঠানোর কথা ছিল বলে পরিবারিক সূত্রে জানা গেছে। তাকে নিতে ওইদিন রাতভর এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করেন পরিবারের লোকজন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ফিরে আসেননি। এদিকে রেনুর ননদের স্বামী লোকমান হোসেন তাকে ফেরত পাঠানোর কথা বলেও ৫০ হাজার টাকা দাবি করেছেন। যদিও আজ পর্যন্ত রেনু আক্তার কোথায় আছেন তার সুনির্দিষ্ট সন্ধান দিতে পারেননি তিনি।

পারিবারিক সূত্র জানায়, পরিবারের অসহায় অবস্থার মধ্যে লাল মিয়ার ভাতিজির স্বামী ভোলার চর বোরহানউদ্দিন উপজেলার টকবগি গ্রামের লোকমান রেনুকে বিদেশ যাওয়ার পরামর্শ দেন। সেই মোতাবেক ৬০ হাজার টাকা ধার-দেনা করে লোকমানের হাতে তুলে দেয়। মেসার্স বিডেক্স ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে ভিসা প্রসেসিং করে। এরপর গত বছরের ২৫শে সেপ্টেম্বর ওমানের উদ্দেশে দেশ ছাড়েন। এর কিছুদিন পরে লোকমানও ওমান চলে যান। রেনু দেশটিতে একটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজ নেন। সেখানে কাজ করার ৫ মাস পরিবারের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ওই সময় কিছু টাকাও পাঠিয়েছিলেন রেনু। কিন্তু এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় লোকমানের কাছে তার খবর জানতে চাইলে তিনি বলেন, রেনু মানসিকভাবে অসুস্থ, তিনি মালিকের ছেলে এবং স্ত্রীকে মারধর করেছেন। তাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হবে।

কিছুদিন পর রেনুও ফোন করে। এসময় তিনি বাড়ির লোকজনকে বলেন যে, তিনি ভালো আছেন। পরিবারের ধারণা টাকা-পয়সা সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে রেনুর সঙ্গে লোকমানের কোনো ধরনের ঝামেলা হয়েছে। এর দুইদিন পর রেনু বাড়িতে ফোন করে বলে দু’একদিনের মধ্যে তিনি বাড়ি ফিরবেন। লোকমানও একই কথা বলেন। সেই মোতাবেক গত ১৭ই মার্চ টিকিট বুকিংয়ের কথা জানায়। এর বিস্তারিত মোবাইলে মেসেজ করে পরিবারের লোকজনের কাছে পাঠানো হয়। ওই মেসেজে দেখা যায় ১৭ই মার্চ রেনু আক্তারের এয়ার এরাবিয়া’র জি-৯ ফ্লাইটে করে ঢাকা পৌঁছানোর কথা। বুকিং রেজিস্ট্রেশন নং ৪৩৫৮০৭৯৭। রাতে ফ্লাইটটি ঢাকা পৌঁছানোর কথা। রেনু আক্তারও পরিবারের লোকজনকে এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করতে বলেন। পরিবারের দাবি রেনু আক্তারকে কোনো অবস্থাতেই তাদের অস্বাভাবিক মনে হয়নি। বরং তিনি সুস্থ ছিলেন। তাকে রিসিভ করতে বিমানবন্দরেও আসতে বলেন তিনি। সেই মোতাবেক পরিবারের লোকজন রাতভর ঢাকার হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অপেক্ষা করেন। কিন্তু রেনু আক্তার ফেরেননি।

পরে লোকমানের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন রেনু আক্তারের মানসিক সমস্যা দেখা দেয়ায় তিনি ফিরতে পারেননি। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কিন্তু কোন্‌ হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়েছে তা আজও পর্যন্ত বলেননি লোকমান। এমন কি তার সঙ্গে যোগাযোগও হয়নি। উল্টো লোকমান পরিবারের কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেছেন। বলেছেন ওই টাকা দিলে তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হবে। এদিকে রেনু আক্তার যে বাসায় কাজ করতেন একই বাসায় ড্রাইভারের চাকরি করতেন আরেক বাংলাদেশি। আগে তার সঙ্গে যোগাযোগ হলেও এখন আর তিনি ফোন রিসিভ করেন না। এদিকে আজও পর্যন্ত রেনু আক্তারের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন তার অসুস্থ স্বামীসহ পরিবারের লোকজন। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে এবং দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েরও লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। এদিকে বিদেশ যেতে গিয়ে এবং সংসার চালাতে গিয়ে অনেক ধার-দেনা করেছেন লাল মিয়া। পাওনাদারদের কাছ থেকেও চাপ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে দিশাহারা প্যারালাইজড্‌-এ আক্রান্ত লাল মিয়া। এদিকে রেনু আক্তারকে বিদেশে পাঠানো এজেন্সি মেসার্স বিডেক্স ইন্টারন্যাশনালের ম্যানেজার ইনাম আবদুল্লাহ মহসীন বলেন, আমরা ওমানের কোনো ভিসা দিই না। তবে মাঝে মধ্যে প্রসেসিং করে দিই। রেনু আক্তার সম্পর্কে তাদের কিছু জানা নেই বলেও তিনি জানান। এ ব্যাপারে কেউ তাদের কাছে আসেও নি।মানবজমিন

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন ডেরি/৯ মে ২০১৬

Related posts