December 18, 2018

রিজার্ভ চুরিঃ শ্রীলংকার শালিকা সত্য, না জাইকা, নাকি উভয়ই?

01 Apr, 2016, ঢাকাঃ শ্রীলংকার একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হাগোদা গ্যামেজ শালিকা পেরেরা। তার পরিচালিত এনজিও শালিকা ফাউন্ডেশন। বাংলাদেশের রিজার্ভ থেকে চুরি যাওয়া অর্থের মধ্য থেকে ২ কোটি ডলার তার অ্যাকাউন্টে যায়। অর্থপ্রাপ্তির বিষয়টি তার জানা থাকলেও তা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চুরি করা অর্থের অংশ কিনা, এ বিষয়ে কোনো ধারণা ছিল না বলে তিনি জানান। গতকাল রয়টার্সে প্রকাশিত এক সংবাদে এমন তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেম হ্যাক করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রক্ষিত ব্যাংকটির হিসাব থেকে গত ৪ ও ৫ ফেব্রুয়ারি অজ্ঞাত কিছু অপরাধী প্রায় ১০০ কোটি ডলার চুরির চেষ্টা করে। অধিকাংশ প্রচেষ্টাই রোধ করা সম্ভব হয়। তবে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের আগেই ২ কোটি ডলার শালিকা ফাউন্ডেশনের নামে স্থানান্তর করা হয়। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দেয়া তথ্যমতে, সংশ্লিষ্ট এনজিওর নামের বানানে ভুল করায় (ফাউন্ডেশনকে ফান্ডেশন লেখে অপরাধীরা) মধ্যস্থতাকারী ডয়সে ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অর্থ স্থানান্তর বিষয়ে অনুমোদন চায়। ফলে ওই অর্থ জব্দ করা সম্ভব হয়। এছাড়া আরো ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চলে যায় ফিলিপাইনে, যা কয়েকটি ক্যাসিনোর মাধ্যমে হারিয়ে যায়। ফিলিপাইনের সিনেট এ বিষয়ে একটি শুনানি গ্রহণ করছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ঘটনার শ্রীলংকা অংশ সম্পর্কে খুব কমই জানা গেছে।
এ বিষয়ে প্রথমবারের মতো রয়টার্সের সামনে মুখ খোলেন শালিকা ফাউন্ডেশনের প্রধান শালিকা পেরেরা। রয়টার্সকে তিনি জানান, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) থেকে তার কাছে ২ কোটি ডলার আসার কথা ছিল। শ্রীলংকায় একটি বিদ্যুেকন্দ্র ও অন্য কয়েকটি প্রকল্পের জন্য সহায়তা হিসেবে এ অর্থ আসার কথা ছিল। জাইকার সঙ্গে তার সরাসরি কোনো যোগাযোগ ছিল না। তবে জাপানে যোগাযোগ রয়েছে এমন এক শ্রীলংকান বন্ধুর মাধ্যমে চুক্তির বিষয়টি স্থির হয়েছিল।

শালিকা ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু ২০১৪ সালে। প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধনের সময় দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এটি কম খরচে গৃহনির্মাণ ও অন্যান্য সেবা প্রদান করে থাকে। শালিকা পেরেরা রয়টার্সকে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ওই বন্ধুর নাম, ফোন নাম্বার এবং ই-মেইল ঠিকানা দিয়েছেন। তবে রয়টার্সের একার পক্ষে শালিকার দেয়া তথ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি।
এদিকে জাপান সরকারের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা জানিয়েছে, শালিকা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে তাদের কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই। এমনকি কোনো মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমেও নয়। জাইকার মুখপাত্র নাওইউকি নেমোতো বলেন, আমাদের সঙ্গে তাদের কোনো লেনদেন নেই। তাদের সঙ্গে ঋণ বা অনুদান-বিষয়ক কোনো সম্পর্কও আমাদের নেই। এদিকে তদন্ত চলমান থাকায় শ্রীলংকান পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ এ সম্পর্কে কোনো ধরনের মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

শ্রীলংকার রাজধানী কলম্বোয় শালিকা পেরেরা বিষয়টি নিয়ে রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় ৩৬ বছর বয়স্ক এ নারীর জীবনসঙ্গী রামনায়ক আরাচিগে ডন প্রদীপ রোহিতা ধামকিন উপস্থিত ছিলেন। রোহিতা ধামকিন শালিকা ফাউন্ডেশনের একজন পরিচালক। সাক্ষাত্কারে শালিকা পেরেরা বলেন, আমরা খাঁটি মানুষ। আমরা কোনো ধরনের বেআইনি কাজ করছি না।

আমার পরিচিত ব্যক্তি হয় অপরাধীদের শিকার, নয়তো তিনি নিজেই এর সঙ্গে জড়িত। তারা এ কাজে আমাদের ধোঁকা দিয়ে সংযুক্ত করেছে। তিনি এ সময় সুইফট ম্যাসেজিং সিস্টেম থেকে আসা বার্তার একটি অনুলিপি প্রদর্শন করেন। এতে ২ কোটি ডলার বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যুত্ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তার কোম্পানির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানোর কথা উল্লেখ রয়েছে। এতে দেখা গেছে, বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যুত্ কর্তৃপক্ষ ২০১০ সালে ওই পরিমাণ অর্থ একটি বিদ্যুত্ প্রকল্পের জন্য জাইকা থেকে ঋণ হিসেবে নিয়েছিল।

বাংলাদেশ সরকারের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড বিষয়টিকে ‘হাস্যকর’ বলে উল্লেখ করেছে। সরকারি এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মইন উদ্দিন বলেন, এ অর্থ বোর্ড থেকে গেছে— এ ভাবনাই ‘হাস্যকর’। সম্ভবত অপরাধীরা বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানটির নাম ব্যবহার করেছে।

শ্রীলংকার পুলিশ এরই মধ্যে শালিকা পেরেরার ওই পরিচিত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। কলম্বো ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে প্রদান করা তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন, একজন জাপানি মধ্যস্থতাকারী তহবিলটি পাওয়ার বিষয়ে সহায়তা করেছে। প্রতিবেদনে পেরেরার ওই পরিচিত ব্যক্তির নামও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে রয়টার্সের পক্ষ থেকে তাকে এবং তার কথিত জাপানি মধ্যস্থতাকারীর অবস্থান জানা সম্ভব হয়নি। জাপানি মধ্যস্থতাকারীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি এখন ভ্রমণে আছেন এবং এ মুহূর্তে তার পক্ষে এ-বিষয়ক কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়।

এদিকে শ্রীলংকার আদালত পেরেরা, তার পরিচিত ব্যক্তিসহ আরো চারজনের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকা বাকি চার ব্যক্তির সবাই শালিকা ফাউন্ডেশনের পরিচালক। শালিকা নিজেকে নির্দোষ দাবি করার পাশাপাশি সরকারের গৃহীত এ পদক্ষেপকে ‘অবিচার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

শালিকা পেরেরার ভাষ্যমতে, তিনি নিজে জীবন-সংগ্রামে লিপ্ত। তার আরো চারটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, একটি গাড়ির যন্ত্রাংশের কোম্পানি, একটি নির্মাণ শিল্প প্রতিষ্ঠান ও অন্যটি ক্যাটারিং ফার্ম। ২০১৪ সালে তার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে এত বেশি লোকসান হয়েছে যে, তিনি প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। তার মূল ব্যবসা এখন ইন্টারনেট ক্যাফেকেন্দ্রিক। বর্তমানে তিনি পিত্জা হাটের মতো কিছু রেস্টুরেন্টে
বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত বিনিয়োগকারীর সঙ্গে আলোচনা করছেন।
শালিকা জানান, তার পরিচিত ওই ব্যক্তি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে দেখা করতে তাকে সহায়তা দিয়ে আসছেন। ফেব্রুয়ারির শুরুতে তিনি পেরেরাকে জানান, জাইকা থেকে ২ কোটি ডলারের একটি তহবিল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের মধ্যে থাকা চুক্তি অনুযায়ী তহবিলটি শালিকার বিদ্যুকেন্দ্র প্রকল্প ও ওই ব্যক্তির আবাসন প্রকল্পে ভাগ করে নেয়ার কথা।

গত সপ্তাহে পাওয়া শ্রীলংকার পুলিশের একটি তদন্ত প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে রয়টার্স জানিয়েছে, পেরেরা প্যান এশিয়া ব্যাংকের কলম্বো শাখাকে জানিয়েছিল যে, জাপান থেকে ২ কোটি ডলারের একটি তহবিল আসতে পারে। ওই অর্থের মধ্য থেকে ৭৭ লাখ ২০ হাজার ডলার তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে এবং বাকি ১ কোটি ১১ লাখ ২০ হাজার ডলার তার পরিচিত ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছিলেন পেরেরা। তবে এ বিষয়ে ওই ব্যাংকের এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এদিকে আদালতে জমা দেয়া ওই প্রতিবেদন সম্পর্কে পেরেরা কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন। তবে তিনি ব্যাংকের কাছে পাঠানো তার নির্দেশনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তার মতে, দুটি প্রকল্পের বিপরীতে তহবিল ও তার কমিশন হিসাব করেই ওই নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। বাদবাকি অর্থ কর বাবদ রাখা হয়েছিল।

পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শালিকা ফাউন্ডেশনের জন্য প্যান এশিয়া ব্যাংকে ওই অর্থ ৪ ফেব্রুয়ারি এসেছিল। কিন্তু তহবিলটি অস্বাভাবিক রকমের বড় হওয়ায় এবং তা পুনঃনিরীক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে— এমন বিবেচনায় ব্যাংকটি ওই অর্থছাড়ে অস্বীকৃতি জানায়। ৯ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকের পক্ষ থেকে পেরেরাকে জানানো হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ওই অর্থ ফেরত দিতে বলেছে।

Related posts