November 17, 2018

রায় ‘বদলাতে লেনদেনও’ হয়েছিল: বিচারপতি শামসুদ্দিন

অনলাইন ডেস্ক রিপোর্টঃ প্রধান বিচারপতির বিভিন্ন বক্তব্যের সমালোচনা করে আসা সাবেক বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক এবার মীর কাসেম আলীর যুদ্ধাপরাধ মামলার আপিলের রায় বদলাতে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ করেছেন।

যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে মঙ্গলবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে তিনি এ অভিযোগ তোলেন।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ গত ৮ মার্চ জামায়াত নেতা মীর কাসেমের যুদ্ধাপরাধ মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণার আগেই নানমুখী আলোচনা শুরু হয়। এক গোলটেবিল আলোচনায় খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হক রায় নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে নতুন বেঞ্চে পুনঃশুনানির দাবি তোলেন।

শেষ পর্যন্ত আপিলের রায়েও মীর কাসেমের ফাঁসির আদেশ বহাল থাকে এবং অবমাননার দায়ে দুই মন্ত্রীকে দণ্ড দেয় আপিল বিভাগ।

সেই প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান খান মঙ্গলবার ধানমন্ডিতে আয়োজিত আচোলনা সভায় বলেন, “গত এক দেড় মাস খুব যাতনায় ভুগেছি। দুজন মন্ত্রী দণ্ডিত হয়েছেন। এই দণ্ড আমাদের জন্য আশীর্বাদ। উনারা দণ্ডিত, আমরা গর্বিত। আই ওউন ইট।”

এর সূত্র ধরে মাইক্রোফোন নিয়ে সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী বলেন, “ওই ঘটনার জন্যই মীর কাসেমের এই রায় এসেছে। না হলে রায় অন্যদিকে চলে যেত। কত টাকার যে লেনদেন হয়েছে…।”

সার্ব নেতা রাদোভান কারাদজিচের যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের বিচার নিয়ে এই আলোচনায় তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ছিলেন প্রধান অতিথি। সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী তার বক্তব্যে কুমিল্লার কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রধান বিচারপতির সাম্প্রতিক মন্তব্যেরও সমালোচনা করেন।

“তনু হত্যা সম্পর্কে চিফ জাস্টিস যা বলেছেন, তা যদি রাস্তার কোনো লোক বলত- মানা যেত। প্রধান বিচারপতি বলেছেন- বর্তমান আইনে তনু হত্যার বিচার করা সম্ভব নয়। এটা কেমন কথা হতে পারে?”

চলতি মাসের শুরুতে এক অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছিলেন, তনু হত্যার ঘটনা একটি আধুনিক অপরাধ। পুরনো ফৌজদারি আইন দিয়ে এর সুষ্ঠু তদন্ত কিংবা বিচার সম্ভব নয়।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে গতবছর অবসরে যাওয়া বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, “দেশের সর্বোচ্চ বিচারকের কাছ থেকে এই ধরনের কথা আসায় তদন্ত প্রভাবিত হতে পারে। তদন্তাধীন বিষয় নিয়ে এ ধরনের বক্তব্য কোনো বিচারকের কাছ থেকে আশা করা যায় না।”

“আইনপ্রণেতারা অজ্ঞ- প্রধান বিচারপতির এই কথাটা সঠিক নয়” মন্তব্য করে বিচারপতি শামসুদ্দিন বলেন, “আমাদের সংসদে অনেকেই আছেন যারা বিশ্বমানের। সে কারণেই সিপিএ এবং আইপিইউতে বাংলাদেশ নেতৃত্ব দিচ্ছে। সংসদে কোনো আইন তৈরি হয় না। সংসদে আইন আসে খসড়া হিসাবে। এটা তৈরি করে আইন মন্ত্রণালয়ের ড্রাফটিং ইউনিটের বিশেষজ্ঞরা।

“সংসদ সদস্যদের বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নাই। উনি (প্রধান বিচারপতি) কীভাবে এটা বললেন! এটা বোঝার জন্য সংবিধানের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নাই।”

এর আগেও বিভিন্ন সময়ে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার সমালোচনায় মুখর হয়েছেন শামসুদ্দিন চৌধুরী।
আপিল বিভাগে থাকা অবস্থাতেই গতবছর সেপ্টেম্বরে প্রধান বিচারপতির অভিশংসন চেয়ে রাষ্ট্রপতির বরাবরে একটি চিঠি পাঠান তিনি। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, রায় লেখা শেষ না করায় তার পেনশন আটকে দিয়েছিলেন প্রধান বিচারপতি।
যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আপিলের রায়ের আগে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আরেক বিচারকের কথোপকথনের একটি অডিও টেপ প্রকাশ হয় এবং এ বিষয়ে জনকণ্ঠে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হলে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
ওই অডিও টেপের অপর কণ্ঠটি বিচারপতি শামসুদ্দিনের বলে সে সময় গণমাধ্যমে খবর আসে। আদালতের শুনানিতে জনকণ্ঠের আইনজীবী অডিও রেকর্ডের শ্রুতিলিখনের অংশবিশেষ তুলে ধরেন, যাতে দুই বিচারকের মতপার্থক্যের বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
এরপর চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে প্রধান বিচারপতি অবসরের পর রায় লেখা বন্ধ করতে বললে বিচারপতি শামসুদ্দিন তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজ করারও অভিযোগ তোলেন তিনি।
তার এসব কথায় ‘বিচার বিভাগ ও উচ্চ আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে’ অভিযোগ করে ফেব্রুয়ারিতে এক রিট আবেদনে বিচারপতি শামসুদ্দিনের বক্তব্য-বিবৃতি গণমাধ্যমে প্রকাশ-প্রচার বন্ধের আবেদন করা হলেও হাই কোর্ট তাতে সাড়া দেয়নি।
উৎসঃ bdnews24

Related posts