September 24, 2018

রাশিয়ার সাথে কুস্তি, চীনের সাথে গলায় গলায় দোস্তি!

আবু জাফর মাহমুদ

চীন-রাশিয়া কৌশলগত জোট গড়ে এসেছে সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর রাশিয়ার ফিরে দাঁড়ানোর সূচনায়। অতীতে এই দুই কম্যুনিষ্ট রাষ্ট্র প্রতিক্ষনে একে অপরকে গালি দিলেও সোভিয়েট সমাজতান্ত্রিক ইউনিয়ন ছিন্ন ভিন্ন হবার ওসব গালিগালাজ হঠাৎ থেমে যায়। অতঃপর আমেরিকার একক সুপার পাওয়ার হবার পর ব্লাদিমির পুটিন রাশিয়াকে আবার মেরুদন্ডে দাঁড় করাতে গিয়ে চীনের সাথে গড়েছিলো এই গুরুত্বপূর্ণ জোট।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের সাথে চীনের নতুন উষ্ণতায় দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের অবকাঠামো নির্মান হচ্ছে।চীনের পিপলস লিবারেশান আর্মি এবং মার্কিণ প্রতিরক্ষাবাহিনী যৌথ মহড়া করেছে কয়েকবার।এতে বলা যায়,এশিয়ায়  যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথ সুগম হয়েছে।চীন বিশ্ব পরাশক্তি হবার পথে ঝুঁকিহীন পথ প্যেয়ে গেছে।
সিরিয়ার আকাশ সীমায় রাশিয়ার জেট ফাইটারকে গুলি করে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে তুরস্ক।এই আক্রমণ নিয়ে অনেক বিশ্লেষণ চালু হয়েছে,উঠছে নতুন নতুন কথা।মনে করা যায়,যুক্ত্ররাষ্ট্রের মিত্র এদেশটি নিজে থেকে একাজ করেনি।ওয়াশিংটনের মদত ছাড়া এমন ঘটনা হিসেবে নেয়া যায়না।নিশ্চয়ই পেন্টাগণ ও ব্রাসেলসের সবুজ সংকেতের ভিত্তিতেই হয়েছে এই আক্রমণ।

ধরে নেয়া যায়,যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্টপোষতায় গড়া ইসলামিক ষ্টেট বাহিনীর উপর তুরস্কে   রাশিয়ার বোমা বর্ষনের প্রতিশোধ নিতেই হয়েছে এই আক্রমণ।চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক উষ্ণতার কালে এরকম প্রতিশোধের মধ্যে বিশ্বধারায় দাপটের লড়াইয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানান দেয়া হয়েছে।মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্র নিজের একক নেতৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ দমনে কঠোর রয়েছে।রাশিয়াকে কোনভাবেই সামনে পা ফেলতে দিচ্ছেনা আপাততঃ।

আমেরিকা-ন্যাটোর সিরিয়ায় স্থলযুদ্ধকে রাশিয়া যে আমলে নেয়নি,আন্ডারমাইন করে এসেছিলো।সেখানে আলকায়েদা সমর্থিত জঙ্গি বাহিনীগুলি পশ্চিমা জোটের পদাতিক বাহিনীরূপে ব্যবহার হয়ে আসছে।কথিত ইসলামিক ষ্টেট এবং নুসরাত বিদ্রোহীরা মূলতঃ গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং পশ্চিমা বিশেষ বাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে।তথাকার বিভিন্ন বেসরকারী কোম্পানী যুক্তরাষ্ট্র-ন্যাটোর সাথে চুক্তির ভিত্তিতে এই অভিযানের দায়িত্ব নিয়েছে।রাশিয়ার যুদ্ধবিমান ধ্বংসের ঘটনা তর্কাতীতভাবেই উস্কানীমূলক।

তাই বলা যায়, রাশিয়ার সাথে এই যুদ্ধ এতোদিন ছদ্মবেশে হলেও তা এখন এসে গেছে প্রকাশ্যে।সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে ফেলার অনেক বছর পর এখন আবার চালু হচ্ছে রুশ-মার্কিণ ঠান্ডা যুদ্ধ।এতে রাশিয়ার মিত্রদেরকে ঝুঁকিতে দিন কাটাতে হবে।রাশিয়াও নতুন পথ খুঁজতে হবে অথবা আগের ধারায় ভাগ্যবরণের প্রস্তুতি নিতে হবে।

মার্কিণ বিশ্লেষকরা বলছেন,চীনের সাথে আমেরিকার সম্পর্কে উত্তেজনা থাকলেও ইতিমধ্যে উক্ত রাষ্ট্র দুটো নিজেদের সম্পর্ক উন্নত করে চলেছে।২০১৫সনের আগষ্টে চীন-রাশিয়া জয়েন্ট সি ২০১৫ নামের এক বিশাল যুদ্ধখেলা খেলেছে। ২২টি জাহাজ,২০টি এয়ারক্রাফট, ৪০টি আরমর্ড বেহাইকল এবং দুদেশের ৫০০মেরিন ফোর্স অংশ নিয়েছিলো মিশাইল ক্রুজার এবং রাশিয়ান প্যাসিফিক যুদ্ধজাহাজ বহরের ফ্ল্যাগ শিপ এবং সেনিয়াং ডেশট্রয়ার।

রাশিয়ার সাথে এই ড্রিল চলার সময় ৩মাস পর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ১৬-২১ নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য যৌথ ড্রিল সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি।গোপন রাখা হয়েছিলো বিষয়টি।আমেরিকান মেরিনযোদ্ধারা চীনা বন্দরে প্রবেশের মুখে এসে দাঁড়ালে প্রায়ই ৭০জনের চীনা পিপলস আর্মির মেরিনরা ওয়েলকাম ইউ এস নেভী ডেষ্ট্রয়ার ইউএস এস ষ্টেথেম টু সাংহাই “Welcome US Navy Destroyer USS Stethem to Shanghai.”  বলে সাদরে অভিবাদন জানায়।

প্রশ্নাতীতভাবে বলা যায়, আমেরিকা চীনের সাথে এই এলায়েন্স গড়েছে রাশিয়া- চীন জোটের তলদেশে  বড় আকারের ফাটল দেখানোর জন্যে। কাজটি হয়ে গেছে মনে হয়।ক্ষমতার লড়াই এমনটাই হয়।রাশিয়ার উপর নির্ভরশীল মিত্রদের জন্যে এই সংবাদ কোন কারণেই সুখকর নয়।রাশিয়ার প্রধান মিত্র ভারত কি ভাবছে জানিনা।এদেশ অবশ্য আমেরিকার সাথেও মিত্রতায় আছে আবার চীনের সাথেও আছে।

তবে চীন-মার্কিণ মিত্রতা যদি উষ্ণতায় পোঁছে,তখন বড় দুই মিলে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধির জন্যে ঘোড়ার মতো পেছনের পায়ে সম্ভাব্য শত্রুর বিষয়ে সিদ্ধান্তে যায় কিনা সেই সন্দেহ করা অমূলক নয়।কেননা বাস্তবতা হলো,দূর্বলের ঘরে বেশী দামী সম্পদ রাখতে নেই।বিপদ ঘোরাঘুরি করে।

আমেরিকান বিদেশ নীতিকে বলা যায়, “হুমকি-সহযোগীতার কৌশল নীতি” বা “threaten-cooperate strategy”. আমেরিকা cross-cutting সম্পর্ক পলিসিতে চলছে চীনের সাথে।সে রাশিয়াকে চীন থেকে সরাতে বদ্ধপরিকর।অর্থাৎ আমেরিকা চীনকে বাধ্য করছে আমেরিকার সহযোগীতায় অবস্থান নিতে।এক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য রাশিয়াকে দূর্বল রাখা।

এদিকে চীনের ভেতর এখন দুই বিভক্ত শক্তি পাশাপাশি মাথা তুলে প্রতিযোগীতা করছে।আমেরিকার পক্ষে এখন বিশাল রাজনৈতিক ও ব্যাবসায়ী কম্যুনিটি হয়ে গেছে।যেমন চাইনিজ একাডেমী অব সোস্যাল সায়েন্স (CASS)হচ্ছে আমেরিকার সাথে চীনের বন্ধুত্বের পক্ষের গ্রুপ।এদিকে পাকিস্তানকে চীন এবং আমেরিকা যেভাবে শক্তিশালী করছে,তাতে ভারতের জন্যে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।যা বাংলাদেশে ও প্রভাব ফেলতে পারে।এসব বিষয় আঞ্চলিক অসহিষ্ণুতা চরমে নিয়ে যাবার পরিস্থিতি তৈরী করছে।(পরবর্তীতে চলবে)।

(লেখক আবু জাফর মাহমুদ বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক)
দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts