September 19, 2018

রাজনীতিতে ‘নতুন মেরুকরণ’ নিয়ে গুঞ্জন

সরকার বিরোধী আন্দোলন থেকে বিএনপির ‘আপাতত’ সরে আসা, পৌরসভা নির্বাচনের পর দলটির ‘নীরবে’ ফল মেনে নিয়ে চুপচাপ থাকা এবং সর্বশেষ ৫ জানুয়ারি নয়াপল্টনের সমাবেশে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সমঝোতাধর্মী বক্তব্যকে ঘিরে একধরনের রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে রাজনীতিতে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে সবাই মিলে রাজনীতিকে এগিয়ে নেয়ার আহ্বান এবং খালেদা জিয়াসহ বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মামলাসমূহের বিচার কাজে হঠাত্ কিছুটা হলেও গতি কমিয়ে আনা ও কয়েকজন জামিন পাওয়ায় সেই রহস্যের ঘনত্ব বেড়েছে। এরমধ্যেই দেশের ভেতরে-বাইরে আওয়ামীলীগ-বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ কয়েক নেতার যোগাযোগের ঘটনা এই রহস্যকে আরও গভীরতা দিয়েছে।

রাজনীতির নেপথ্যের খবরাখবর রাখার চেষ্টা করেন কিংবা রাজনীতির অলি-গলিতে ঘোরাঘুরি করেন, এমন দু’একজন জানালেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা সম্প্রতি লন্ডনে সেখানে বসবাসরত বিএনপির হাইপ্রোফাইল এক নেতার সঙ্গে চা-চক্রে বসেছিলেন। এই চা-চক্রটি ‘হঠাত্ দেখা’ ধরনের বা আকস্মিক ছিল না। পূর্ব যোগাযোগের ভিত্তিতে সময়-ক্ষণ নির্ধারণ করেই এর আয়োজন করা হয়। এই আয়োজনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন ওই উপদেষ্টার এক আত্মীয়, যিনি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। চা-চক্রের আয়োজন করে দিয়ে বিএনপির ওই নেতা এখন থাইল্যান্ডে অবস্থান করছেন।

রাজনৈতিক এই চা-চক্রের খবর এখন শুধু তিন-চারজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এক কান, দুই কান করে এই খবরের বিস্তৃতি ঘটেছে। আওয়ামীলীগ-বিএনপির দায়িত্বশীল দুই নেতার ওই বৈঠকের আলোচনার বিষয় সম্পর্কেও কিছু আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

সূত্রের দাবি, আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল একাদশ সংসদ নির্বাচন। প্রধানমন্ত্রীর ওই উপদেষ্টা বিএনপির হাইপ্রোফাইল নেতাকে জানান, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই, বর্তমান সরকারও সেই পথে আর পা বাড়াতে রাজি নয়। সবার অংশগ্রহণে আগাম নির্বাচন চাইলে সংবিধানের বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যেই হতে হবে। বড়জোর নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এসব বিষয়ে সমঝোতা হলে ফলাফলও মেনে নেয়ার মানসিকতা থাকা অপরিহার্য। বিএনপির পক্ষ থেকে এবিষয়ে সায় পাওয়া গেলে বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে।

সূত্রমতে, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার এসব বক্তব্যের জবাবে লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির আলোচিত নেতা বলেছেন, ‘আন্দোলন নয়, সবার অংশগ্রহণে দেশে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনই তাদের মূল দাবি। এক্ষেত্রে আগের কাঠামোর মত পুরোপুরি নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালও তারা চাচ্ছেন না। সরকারের পক্ষ থেকে অবাধ নির্বাচনের নিশ্চয়তা পাওয়া গেলে সমঝোতার বিষয়ে বিএনপি এগিয়ে আসতে রাজি আছে।’

বিএনপির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলের সাংগঠনিক অবস্থা, দলীয় প্রধানসহ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার গতি-প্রকৃতি, স্থানীয় ও ভূ-রাজনীতির গতিধারাসহ সবকিছু মিলিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে চাচ্ছে দলটি। মোটামুটি অবাধ নির্বাচন হলে প্রয়োজনে বিরোধীদলে বসতেও তেমন আপত্তি নেই। মূলকথা, নির্বাচনটি হতে হবে গ্রহণযোগ্য। বিএনপির এই নেতারা আরও জানান, সামগ্রিক পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় দলটি এখন সংসদে ফিরতে চায়। সরকার গঠনের সুযোগ পেলে ভালো, তা না হলে অন্তত বিরোধী দল হিসেবে হলেও সংসদে যেতে চায় দলটি। এক্ষেত্রে অন্তত দল বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে আপাতত রক্ষা পাবে বলে মনে করছেন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব।

সর্বশেষ প্রাপ্ততথ্যে জানা গেছে, আওয়ামীলীগ ও বিএনপির দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধির এসব আলোচনা শুধু চা-চক্রেই সীমাবদ্ধ নেই। সময়ে-সময়ে এর অগ্রগতি নিয়ে তারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। উভয়ে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিষয়টি অবহিতও করছেন। অবশ্য উপদেষ্টা যে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করছেন, সেটি প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে করছেন কি-না সেটি অবশ্য স্পষ্ট নয়। তবে বিএনপি নেতার আলোচনার বিষয়ে দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অবগত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে। দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যেই একেবারে গোপনে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে এসব আলোচনা বা যোগাযোগ চললেও এটি প্রথমবারের ঘটনা নয়। এর আগেও দু’একবার দল দুটির কয়েক নেতার মধ্যে এরকম অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তা হয়েছে। বিশেষ করে কয়েক মাস আগে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী কথা বলেছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানের সঙ্গে। আরেকটি সামাজিক অনুষ্ঠানে বিএনপির এক নেতার সঙ্গে কথা বলেছিলেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী। পরে অবশ্য মতিয়া চৌৗধুরী ও গওহর রিজভী দু’জনই বিষয়টি ‘সৌজন্য আলোচনা’ বলে গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেন। যদিও গওহর রিজভী তখনই গণমাধ্যমকে বলেছিলেন ‘দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে তো আলোচনা হতে পারে, তাছাড়া আমি যে আলোচনা করেছি সেটি প্রধানমন্ত্রীকেও অবহিত করেছি।’ ধারণা করা হচ্ছে, পর্দার অন্তরালে এখন যে যোগাযোগের কথা বা ‘লন্ডন মিশন’ নিয়ে রাজনীতিতে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে, সেটি সম্ভবত গওহর রিজভীর ভাষায় ওই ‘অনানুষ্ঠানিক বা সামাজিক’ আলোচনারই ধারাবাহিকতা। যে ধারাবাহিকতার ফলশ্রুতিতেই বিএনপিও আন্দোলনের পথে আপাতত পা বাড়াচ্ছে না।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/মেহেদি/ডেরি

Related posts