September 19, 2018

রমজান উপলক্ষে চাঁদপুরে হাতে ভাজা মুড়ি পল্লীতে ব্যাস্ততা

chandpur picture 5এ কে অঅজাদ,চাঁদপুর : আর মাত্র একদিন বাকী মাহে রমজানের তাই চাঁদপুরে হাতে ভাজা মুড়ি শিল্পিদের ব্যাস্ততা অনেক বেড়েছে। পবিত্র মাহে রমজানে মুড়ির চাহিদা বেশি থাকায় হাতে ভাজা মুড়ি পল্লীগুলোতে ক্যামিকেল মুক্ত মুড়ি উৎপাদনের ধুম পড়েছে। অন্যদিকে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বিষাক্ত হাইড্রোজ মিশিয়ে মেশিনে তৈরি মুড়ি উৎপাদন করে বাজারজাত করছে। বর্তমানে মেশিনের তৈরী বিষাক্ত মুড়িতে বাজার সয়লাব হয়ে পড়েছে। রমজানে এসব বিষাক্ত মুড়ি খেয়ে অসুস্থ্য হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রমজান মাসে ইফতারীতে মুড়ির চাহিদা বেশি থাকে। এ কারনে চাঁদপুরের মুড়ি পল্লীগুলোতে বিষমুক্ত মুড়ি উৎপাদনে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে মুড়ি শ্রমিকরা। দিন রাত মুড়ি ভেজে এ শিল্পের শ্রমিকরা মুড়ি বিক্রি করেও ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না।
হাতে ভাজা মুড়ি উৎপাদনে খরছ একটু বেশী পরে। কিন্তু তাদের দাবী মেশিনে হাইড্রোজ মিশিয়ে মুড়ি উৎপাদন করে তা কম দামে বাজারে বিক্রি করায় হাতে ভাজা মুড়ির সঠিক মূল্য পাচ্ছেনা তারা।। অথচ তারা ১১মাস কাজ না থাকায় শুধুমাত্র রমজান মাসকে সামনে রেখে মুড়ি উৎপাদন করে তা বিক্রির পর পুরো বছর জীবন জীবিকা নির্বাহ করে। অন্যদিকে হাইড্রোজ মিশিয়ে বিষাক্ত মুড়ি উৎপাদনে এই রমজানে ব্যস্ত হয়ে পড়ে মেশিন মালিকরা। তারাও রমজান মাসে প্রতিদিন ২/৩হাজার কেজি মুড়ি উৎপাদনের পর গুদামজাত এবং বিক্রি করে।

এদিকে চাঁদপুর জেলার বেশ ক’টি গ্রামে হাতে ভাজা মুড়ির জন্য প্রসিদ্ধ থাকলেও যান্ত্রিক সভ্যতার ছোঁয়ায় এসব মুড়ি ভাজার সাথে জড়িত পরিবারের সংখ্যা ক্রমশই কমছে। কিন্তু ওইসব গ্রাম এখনও মুড়ি পল্লী হিসেবে খ্যাত হয়ে আছে। চাঁদপুর সদরের পালকান্দি, জাফরাবাদ, মতলব দক্ষিণের উপাদী, বোয়ালিয়া, কচুয়ার সাচারের দুর্গাপুর, হাজীগঞ্জের উচ্চংগা, ফরিদগঞ্জের আলোনিয়া গ্রামে মুড়ি ভাজা হচ্ছে এখনো। তবে একেবারেই কম। আজ থেকে দুই বছর আগেও রমজানকে সামনে রেখে এসব গ্রামের প্রায় শতাধিক পরিবারকে ব্যস্ত দেখা গেছে মুড়ি ভাজা ও বিপণনের কাজে। অথচ সেই পরিবারগুলি এখন তাদের পৈত্রিক পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় মনোনিবেশ করেছে।

chandpur picture 1

ফরিদগঞ্জের আলোনিয়া গ্রামের খগেস চন্দ্র দাস, জীবন চন্দ্র দাস জানান, এক সময় মুড়ি ভেজেই এ গ্রামের অধিকাংশ পরিবার ভালো অবস্থানে থাকলেও মেশিনে তৈরি মুড়ি বাজারে আসায় তাদের ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছে। তারপরও সেখানকার অর্ধশতাধিক পরিবার থেকে কমে বর্তমানে ১৮টি পরিবার তাদের পৈত্রিক ব্যবসা ধরে রেখেছে।

chandpur picture 4

চাঁদপুর সদরের পালকান্দি এলাকার মরণ পাল, সুশিতল পাল, বঙ্কা পাল, রেনুবালা পাল, বাসন্তি পালসহ অন্যরা আরো কয়েকটি মুড়ি ভাজা পরিবার জানান, এখানকার মুড়ি ভাজার উপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের অধিকাংশ শিক্ষিত হয়ে অন্য পেশায় নিয়োজিত রয়েছে। বর্তমানে যারা আছে, তারা বিভিন্ন স্থান থেকে ঘিঘজ, ভুসিয়ারা ও টাপি ধান কিনে এনে তা সিদ্ধ করে মুড়ি ভাজার কাজ করছেন। এসব ধান চালের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় ও অন্যান্য আনুষাঙ্গিক খরচ বেশি পড়ায় হাতে ভাজা মুড়ি বিক্রি করে খুব একটা লাভ হচ্ছে না। হাজীগঞ্জের উচ্চংগা গ্রামের ১০টি পরিবারের শতাধিক সদস্য মুড়ি ভাজা ও বিক্রির সাথে জড়িত। সরজমিনে গিয়ে দেখা যায় সুমন পাল তার পরিবারের ৫ সদস্যকে নিয়ে মুড়ি ভাজায় ব্যস্ত। তিনি জানান, মুড়ি ভাজার সাথে প্রায় ১৫ বছর ধরে কাজ করছেন। বর্তমানে মুড়ি ভেজে তেমন একটা লাভ হয় না। কেননা লাকড়ি, লবণ, ধানের দাম, যাতায়াত খরচ সব মিলিয়ে বেশি একটা লাভ থাকে না। তিনি আরও জানান, তাদের বাড়ির অধিকাংশ পরিবারেরর সদস্যরা বিভিন্ন চাকরি করায় এখন তারা মুড়ি ভাজা বন্ধ করে দিয়েছে। বর্তমানে উচ্চংগা গ্রামের অভিনাশ পাল, পিযুস পাল, যুবরাজ পাল, মতলব উপাদি গ্রামের প্রাণকৃষ্ণ পাল, শংকর পাল, উত্তম পাল, সিবু পাল, লেদা ফকির বাড়ির কালু ফকিরের পরিবারের সদস্যরা মুড়ি ভেজে কোন রকম জীবন-যাপন করছেন। এদের অধিকাংশ জানায়, সারা বছর তাদের হাতের ভাজা মুড়ি যতটুকু চলে রমজান আসলে হাতে ভাজা মুড়ির কদর ও চাহিদা একটু বেশি থাকে। মেশিনে ভাজা মুড়ির দাম হাতে ভাজা মুড়ির চেয়ে কিছুটা কম থাকায় ক্রেতা সাধারণ মেশিনের ভাজা মুড়ি কেনেন বেশি। রমজান মাসে হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা একটু বেশি থাকায় এসময় লাভও হয় ভালো।
কচুয়ার সাচার এলাকার দুর্গাপুর গ্রামে যারা একসময় মুড়ি ভাজতো সেই পাল বংশীয়দের ২/৩টি পরিবার যাই আছে কেউই এখন আর মুড়ি ভাজার সাথে জড়িত নেই। মুড়ি ভাজার সাথে জড়িতরা জানান, বাজারে হাইড্রোজ দিয়ে মেশিনে ভাজা মুড়ি স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বিষয়টির প্রতি স্বাস্থ্য বিভাগের নজর দেয়া প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন। তারা আরও জানান, হাতে ভাজা মুড়িতে যেহেতু ক্যামিকেল দেয়া হয় না খেতেও সুস্বাদু তাই হাতে ভাজা মুড়ি খেতে ক্রেতাদের সচেতন করা প্রয়োজন। তা ছাড়া হাতে ভাজা মুড়ির সাথে জড়িতদের চালসহ অন্যান্য আনুষাঙ্গিক ক্রয়ে যদি ভর্তুকি কিংবা সহজ শর্তে ঋণ দেয়া হয় তাহলে মুড়ি ভাজা ও বিপণনে আরো গতি আসবে বলে তারা জানান।
চাঁদপুর জেলা মার্কেটিং কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, বর্তমানে চাঁদপুর জেলায় ৭টি বৈধ তালিকাভুক্ত কারখানায় মেশিনে মুড়ি ভাজা হচ্ছে। এছাড়া আরও ৩/৪টি অবৈধ মুড়ি ভাজার কারখানা রয়েছে। চাঁদপুরে প্রতি মাসে প্রায় ১০টন মুড়ি ভাজা হচ্ছে।
এদিকে কেমিক্যাল মিশ্রিত লোকাল চাল দিয়ে ভাজা মুড়ি এখন বাজার দখল করে আছে। এসব মুড়ির বেশিরভাগ চাঁদপুরের বাইরে চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, শরিয়তপুরসহ কুমিল্লায় সরবরাহ করা হয়ে থাকে।

Related posts