November 21, 2018

যে কারনে মুখোমুখি মুহিত-তোফায়েল

ঢাকাঃ আসছে অর্থবছরের বাজেট ও নতুন ভ্যাট আইনের বাস্তবায়ন নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে সরকারের দুই প্রভাবশালী মন্ত্রী। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের প্রথম কার্য দিবস থেকেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রণীত নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করতে চান।
অন্যদিকে আরেক প্রভাবশালী মন্ত্রী বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ব্যবসায়ীদের আপত্তি আমলে নিয়ে সংশোধিত এ ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, বাজেটে ভ্যাট আইনের সংশোধনী ও বাস্তবায়ন নিয়ে দুই মন্ত্রণালয় থেকে দুই ধরনের সুপারিশমালা ও নির্দেশনা দিয়ে সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চিঠি এসেছে। সরকারের শীর্ষ দুই মন্ত্রীর দুই ধরনের সুপারিশমালা নিয়ে নতুন করে বিপাকে পড়েছে এনবিআর।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ভ্যাট আইন সংশোধনে নানা ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের আপত্তির পক্ষ নিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। মন্ত্রী আসছে বাজেটে ভ্যাট আইন সংশোধনের পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় বিদ্যমান সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার না করা, তৈরি পোশাক খাতে কর্পোরেট কর হার কমানো, আবাসনসহ অন্যান্য শিল্পে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ রাখার সুপারিশ জানিয়ে এনবিআরে চিঠি দিয়েছেন।

চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশের অর্থ দেশে রাখতে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যবসায়ীদের আয় সহজ শর্তে বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে। না হলে দেশ থেকে অর্থপাচার বেড়ে যাবে। দেশে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়াতে হবে। কঠোরতা কমাতে হবে। বিনিয়োগ বাড়ানো সরকারের সবচেয়ে অগ্রাধিকার বিষয়। এবার বাজেটে এমনভাবে রাজস্ব নীতি গ্রহণ করা উচিত যাতে অর্থপাচারের পরিবর্তে দেশে বিনিয়োগ লাভজনক হয়। শিল্পের বিভিন্ন খাতে সহজ শর্তে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে। আশা করি এনবিআর বিষয়টি ভেবে দেখবে।

এনবিআরে পাঠানো বাণিজ্যমন্ত্রীর চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের শর্ত হিসাবে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা যাবে না। প্রয়োজনে রাজস্ব আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত থেকে এনবিআরকে সরে আসতে হবে।

এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় দীর্ঘদিন থেকে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা আছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থায় সম্পূরক শুল্ক বহাল রাখা প্রয়োজন। ঢালাওভাবে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা হলে দেশীয় শিল্প হুমকির মুখে পড়বে।

জানা গেছে, নতুন ভ্যাট আইনের বিভিন্ন ইস্যুতে শুরু থেকেই ব্যবসায়ীদের আপত্তি রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ছকে প্রণীত ভ্যাট আইনের ৩২টি ধারা মানতে রাজি নন ব্যবসায়ীরা। তবে প্যাকেজ ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বহাল রাখা, ভ্যাটের সব্বোর্চ্চ হার ১৫ শতাংশ থেকে কমানোর মত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমর্থন নিয়ে এনবিআর অনড় রয়েছে।

এসব ধারা সংশোধন না করেই আসছে অর্থবছর থেকে সম্পূর্ণ ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে সরকারের অঙ্গীকার রয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। এরপ্রেক্ষিতে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের শরণাপন্ন হয়ে ব্যবসায়ীরা ভ্যাট আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা পরিবর্তনের পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান।
চিঠিতে বিষয়টি ইঙ্গিত করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, নতুন কর আরোপ বা করের হার বাড়ানোর চেয়ে কর দাতার সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। বাজেটের আকার বড় হচ্ছে। রাজস্ব আদায়ও বাড়াতে হবে। তবে রাজস্ব আদায় বাড়াতে গিয়ে করের ভার বাড়ানো যাবে না। এতে সৎ ব্যবসায়ীদের ওপর করের বোঝা বেড়ে যাবে।

এদিকে আসছে অর্থবছরের বাজেটের দিক নির্দেশনা দিয়ে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রণালয় থেকেও এনবিআরে চিঠি এসেছে। মুহিতের স্বাক্ষরিত এ চিঠিতে বলা হয়েছে বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এনে এনবিআরের নির্ধারণ করা উচিত আগামী অর্থ বছরে প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা কত হবে। শুধু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই হবে না লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এনবিআরকে প্রস্তুত হতে হবে এবং অঙ্গীকার থাকতে হবে।

এনবিআরে পাঠানো অর্থমন্ত্রীর এ চিঠিতে আরো উল্লেখ আছে আসছে অর্থবছরের প্রথম কার্যদিবস থেকে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করা হবে। নতুন এ ভ্যাট আইনে এক স্তরের ভ্যাট আর অনলাইনে ভ্যাট আদায় হলে রাজস্ব আদায় অনেক বেড়ে যাবে। আয়কর ও শুল্ক আইন সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব হলে এনবিআরের রাজস্ব আদায় বেড়ে যাবে। এক্ষেত্রে রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে এনবিআরের চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নেই বলেও আশ্বস্ত করেন অর্থমন্ত্রী।

মুহিতের চিঠিতি আরো বলা হয়েছে, আগামী অর্থ বছর থেকে ভ্যাট আইন সম্পূর্ণ বাস্তবায়নে সরকারের অঙ্গীকার রয়েছে। আয়কর এবং শুল্ক আইনের খসড়া প্রণয়নের কাজও শেষ করতে হবে অতি দ্রুত। আয়কর ও শুল্ক আইন দুটি আগামী অর্থবছরে চূড়ান্ত করতে চাই। যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন হবে।
এনবিআরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, নতুন ভ্যাট আইনের খসড়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। খসড়া বাস্তবায়নে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সম্মতিও দিয়েছেন। তবে বাণিজ্যমন্ত্রীর চিঠি পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর সুপারিশমালা অর্থমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী করণীয় অর্থমন্ত্রীই ঠিক করবেন।

Related posts