November 20, 2018

যেমন হবে ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়ক

506
ঢাকাঃ   সরকারের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার সড়ক পথে যোগাযোগ সহজ, দ্রুত, যানজটমুক্ত ও উন্নততর হবে।

এ প্রকল্পের আওতায় কুমিল্লার দাউদকান্দি টোল প্লাজা থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত ১৯২ দশমিক ৩০ কিলোমিটার দুই লেনের মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ চলছে। তিন হাজার ১৯০ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্পের কাজ চলছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে দুই লেনের মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীতকরণ ছাড়াও ২৩টি সেতু, ২৪২টি কালভার্ট, ৩টি রেল ওভারপাস, ১৪টি সড়ক বাইপাস (৩২ দশমিক ১৩৭ কিলোমিটার), ৩৩টি স্টিল ফুট ওভারব্রিজ, ৩৪ মিটার দীর্ঘ ২টি আন্ডারপাস, ৬১টি বাস স্টপেজ নির্মিত হবে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের কাজ শুরুর পর চার দফা সময় বাড়ানো হয়েছে ও ব্যয় বেড়েছে তিন দফা। এখন আবার চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ পঞ্চমবারের মতো প্রকল্পটির বাস্তবায়ন মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে এবং একই সঙ্গে চতুর্থ দফা ব্যয়ও বেড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাস্তবায়ন বিলম্বের কারণে স্বাভাবিকভাবেই প্রকল্পটির ব্যয় বাড়ছে। এ বিলম্বের জন্য চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো করপোরেশনকে দায়ী করেছে পরিকল্পনা কমিশনের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।

প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানো হলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের মূল কাজ আগামী মে মাসের শেষ সপ্তাহে শেষ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এর পরই চার লেন যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বুধবার সকালে মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পবিষয়ক সমন্বয় সভা শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই প্রকল্পের ফিনিশিং লেয়ারের কাজ শেষ হলে ফিনিশিং টাচ দিয়ে আশা করছি মে মাসের শেষ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী এই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক উদ্বোধন করবেন। চার লেনের ফিনিশিং লেয়ারের কাজ চলছে। ২৩ সেতু ও ২৪১ কালভার্ট নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে।

এদিকে, মঙ্গলবার চার লেনের এই প্রকল্পের মেয়াদ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন হয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায়। তার আগে এই প্রকল্পের মেয়াদ ছিল চলতি বছরের ৩০ জুন মাস পর্যন্ত। ২০০৬ সাল থেকে এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো সময় বাড়ানো হলো।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রকল্প এলাকায় ৫টি কবরস্থান, ১৬টি মসজিদ, ৪টি মন্দির নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে। ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে স্থানান্তর করা হয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের ১৯২ দশমিক ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে ১৭০ কিলোমিটারেরও বেশি কাজ শেষ হয়ে গেছে। গাছ লাগানো, সৌন্দর্য-বর্ধনসহ আনুষঙ্গিক কাজের জন্য বাড়তি কিছুটা সময় লাগবে।

দাউদকান্দি টোল প্লাজা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত এই চার লেন নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রথম অনুমোদনের চেয়ে বর্তমানে এই কাজের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪৪ শতাংশ।

প্রকল্পটির ব্যয় বারবার বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য বাস্তবায়ন বিলম্বের কথা বলা হয়েছে। আইএমইডি প্রকল্পটির বাস্তবায়ন বিলম্বের জন্য চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করেছে। সম্প্রতি প্রকল্পের প্রকৃত কাজ পর্যবেক্ষণ ও ব্যয় বিশ্লেষণ শেষে আইএমইডির প্রতিনিধি দলের দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, কোনও কারণ ছাড়াই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজে বিলম্ব করছে। বিলম্বের কারণ হিসেবে বৃষ্টি, সড়ক নির্মাণে প্রয়োজনীয় উপকরণের ঘাটতি, পাথর সংকট, অর্থ সংকট, মাটি সংকট ইত্যাদির দোহাই দিলেও এসব সমস্যা অনেকটা কেটে গেলেও ঠিকমতো কাজ করছে না চীনা প্রতিষ্ঠানটি। বারবার ব্যয় বাড়ানোর লক্ষ্যেই তারা এমনটি করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠানের এমন আচরণ কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। চীনা প্রতিষ্ঠানের এ কারসাজিতে সওজের সংশ্লিষ্টদেরও সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলেও আইএমইডির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। আইএমইডি তার প্রতিবেদনে আরও বলেছে, দ্রুত কাজ শেষ করার বিষয়ে সওজের যথেষ্ট অবহেলা ছিল। প্রকল্প মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের জানা থাকলেও বিষয়টি নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনও কথা বলা হয়নি এবং কোনও ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। এসব কারণে বারবার সময় ও ব্যয় বাড়িয়েও প্রকল্পটির কাজ শেষ করা যায়নি।

২০১৩ সালের জুনে আইএমইডির প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পটি যথাসময়ে শেষ করার জন্য পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও লোকবল নিয়োগ করা হয়নি। চীনা প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো করপোরেশন এক্ষেত্রে বেশি পিছিয়ে ছিল। চীনা প্রতিষ্ঠানটির প্রকল্পটি যথাসময়ে শেষ করার বিষয়ে যথেষ্ট আগ্রহ ছিল না।

এদিকে, সওজের একটি সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চার লেন প্রকল্পের কাজ অর্থ সংকট ও মাটির অভাবে দীর্ঘায়িত হয়েছে। একদিকে পাহাড় কাটার ক্ষেত্রে আদালতের স্থগিতাদেশ, অন্যদিকে অর্থছাড়ে দীর্ঘসূত্রিতা। সব মিলিয়ে ঘেরাটোপে অনেকটাই বন্দি হয়েছে সরকারের এই মেগা প্রকল্প। দেশের লাইফ লাইন হিসেবে বিবেচিত এ মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন অংশে মাটি ভরাটের কাজে বেশি সময় লেগেছে। গত কয়েক মাসে অর্থছাড় নিয়েও জটিলতা ছিল। অন্যদিকে, বর্ষা মৌসুমে রাস্তার কাজ করা খুব কঠিন। এ অবস্থায় ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো প্রকল্পে কাজ শেষ করা যায়নি। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয় এই প্রকল্পের কাজ।

এদিকে, কাজে ধীরগতির কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজটে প্রায়ই জনদুর্ভোগ চরমে ওঠে। শুরুতে কুমিল্লার দাউদকান্দি টোল প্লাজা থেকে চট্টগ্রামের সিটি গেট পর্যন্ত ১৯২ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীতকরণের জন্য ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হলেও পরে তা ৩ হাজার ১৯০ কোটি ২৯ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। প্রকল্পের অনুকূলে ২০১৪-১৫ অর্থবছর ৬৯৯ কোটি ৩২ লাখ এবং চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছর ৯১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি

Related posts