December 11, 2018

যেভাবে ডাকাত দেলুর উত্থান

রফিকুল ইসলাম রফিক, নারায়ণগঞ্জঃ  নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সিদ্ধিরগঞ্জের আইলপাড়া এলাকায় ডাকাত দেলোয়ার হোসেন ওরফে মাস্টার দেলুর আস্তানা থেকে সম্প্রতি অস্ত্র গোলা বারুদ ও হেরোইন উদ্ধার করেছে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। তবে এসময় কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি ডিবি পুলিশ। মাস্টার দেলু নারায়ণগঞ্জের চিহ্নিত ডাকাত ও কিলার হিসাবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় এক ডজনের বেশি মামলা রয়েছে।

ডিবির এসআই মাজহারুল ইসলাম জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এ এস আই ইব্রাহিমসহ সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে রোববার বিকেলে সিদ্ধিরগঞ্জ আইলপাড়া এলাকা খাদেজার ভাড়াবাড়িতে অভিযান চালিয়ে দুটি পিস্তল, ২৭ রাউন্ড গুলি, ১১টি ককটেল, ৩ শ ৩০ গ্রাম গান পাউডার ও ৬০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করা হয়। দেলোয়ার ওরফে মাস্টার দেলুকে গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা থানা এলাকার পুরো মাদক ব্যবসা দুইজন গডফাদারের নিয়ন্ত্রনে রয়েছে আদালতে স্বীকার করেছে ইতোমধ্যে মাদক সহ গ্রেপ্তারকৃত ৪জন যারা গ্রেপ্তার এড়াতে গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের উপর ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। ওই ৪জন এও বলেছেন, ওই দুইজন গডফাদারের নিয়ন্ত্রনে যে মাদক ব্যবসা হচ্ছে তা কয়েক কোটি টাকার। দুই গডফাদারের একজনের নাম দেলোয়ার হোসেন দেলু ওরফে মাস্টার দেলু ও অপরজন বাবু।

গত ১৫ ঢেব্রুয়ারী বিকেলে নারায়ণগঞ্জের দুটি ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে ওই চারজনের ১৬৪ ধারায় প্রদত্ত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা থানা এলাকার পুরো মাদক ব্যবসা দুইজন গডফাদারের নিয়ন্ত্রনে রয়েছে আদালতে স্বীকার করেছে ইতোমধ্যে মাদক সহ গ্রেপ্তারকৃত ৪জন যারা গ্রেপ্তার এড়াতে গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের উপর ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। ওই ৪জন এও বলেছেন, ওই দুইজন গডফাদারের নিয়ন্ত্রনে যে মাদক ব্যবসা হচ্ছে তা কয়েক কোটি টাকার। দুই গডফাদারের একজনের নাম দেলোয়ার হোসেন দেলু ওরফে মাস্টার দেলু ও অপরজন বাবু।

দেলুর বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন থানায় ডজনখানেক মামলা রয়েছে। সে নারায়ণগঞ্জের দুর্ধর্ষ ডাকাত দলের অন্যতম নেতা। ইতোপূর্বে সে গ্রেপ্তারের পর পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি ও আদালতে দেওয়া জবানবন্দীতে বেশ কয়েকটি দুর্ধর্ষ ডাকাতি ও হত্যাকান্ডের কথা স্বীকার করেছে।

কে এই দেলু

বাবা মারা যাওয়ার পর ছোট এক ভাই ও মায়েকে নিয়ে সংসারের খরচ বহন করার তাগিদেই কোন কাজ না পেয়ে অবশেষে ফেনসিডিল ব্যবসায়ী হতে ডাকাতি কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে দেলোয়ার হোসেন দেলু। পাশাপাশি নিজে অস্ত্র তৈরীতে পারদর্শী থাকাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের আশীর্বাদ পেয়ে অল্প দিনেই গড়ে তোলে বিশাল বাহিনী। বনে যান দেলুর গড়ে তোলা ফাইভষ্টার বাহিনীর অধিকর্তা। তিনি যখনই গ্রেপ্তার হন তখনই তাকে ছাড়াতে তৎপর হয়ে উঠে একজন বিএনপি ও একজন ছাত্রদল নেতা। দেলু ডাকাত দলের নেতা হলেও দেশের শীর্ষ স্থানীয় অস্ত্র ব্যবসায়ীদের সাথে গভীর সখ্যতা এবং নিজেও অস্ত্র তৈরীতে সিদ্ধহস্ত থাকাতে রাজনৈতিক দলের নেতাদের কাছে সে একজন গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র মতে, মাত্র ১০ বছর বয়সে মুন্সীগঞ্জ থেকে স্বপরিবারে নারায়ণগঞ্জে চলে আসে দেলোয়ার হোসেন দেলু। তার বাবা জমির বেপরী ছিল একজন ছাগল ব্যবসায়ী। তিনি মুন্সীগঞ্জ থেকে ছাগল কিনে নারায়ণগঞ্জে এসে বিক্রি করতো। তাদের আদি নিবাস ছিল মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গী বাড়ী থানার আলদী গ্রামে। মুন্সীগঞ্জ ছেড়ে নারায়ণগঞ্জ আসার পর তারা প্রথমে চাঁদমারী বস্তিতে আশ্রয় নেয়। পরে সেখান থেকে চলে যায় তল্লাতে। এরই মধ্যে দেলু খানপুর বার একাডেমী স্কুলে ভর্তি হয়। কিন্তু লেখাপড়ার প্রতি তেমন কোন ঝোক না থাকাতে খুব বেশী দূর এগোয়নি তার লেখপড়া। দিন দিন জড়িয়ে পড়ে অপরাধ জগতে। প্রথমে দেলু এলাকার বখাটে ছেলেদের সাথে আড্ডা দিত। এর সাথে সাথে সে এলাকাতে বসেই নানা জাত মাদক গ্রহন করতো। এরই মধ্যে দেলুর বাবা মারা গেলে পুরো সংসারের দ্বায়িত্ব পড়ে দেলুর উপর। কিন্তু সংসারের বোঝা আর টানতে পারেনি দেলু। অগত্যা ছোট ভাই একটি গার্মেন্টসে কাজ শুরু করে। আর মা সখিনা বেগম বিভিন্ন বাসা বাড়ীতে ঝি’য়ের কাজ করতে থাকে।

এছাড়া সে এলাকার বড় ভাইদের নানা কাজ করে দেওয়ার কারনে প্রায়শই দেলু তার বড় ভাইদের জন্য বিভিন্ন এলাকা হতে ফেনসিডিল, মদ, গাঁজা সহ নানা প্রকার মাদকজাত দ্রব্য নিয়ে আনার কাজটি করতো। এতে করে তার ভাইয়েরা তাকে বখশিষ হিসেবে ১০/২০ টাকা দিত। আর এই টাকা দিয়েই দেলু নিজেও বন্ধুদের সাথে নিয়ে গাজাঁ সেবন করতো। এই রকম করতে করতে এক সময়ে জেলার অনেক শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর সাথে দহরম মহরম সম্পর্ক গড়ে উঠে দেলুর। এক পর্যায়ে দেলু জেলার বিভিন্ন এলাকা হতে ফেনসিডিল এনে শহরের খানপুর রেল লাইন এলাকাতে বিক্রি করতো। কিন্তু জেলার বিভিন্ন মাদক স্পট বিশেষ করে বন্দরের লাঙ্গলবন্দ, কুমিলার চান্দিনা প্রমুখ এলাকাতে ফেনসিডিলের দাম বৃদ্ধি থাকাতে দেলু চলে যেত আখাউড়া, রাজশাহী ও পাবনার বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকাতে। সেসব এলাকা হতে মাদক আনার পাশাপাশি দেলুর সাথে পরিচয় ঘঠে বেশ কয়েকজন অস্ত্র ব্যবসায়ীর।

এরই মধ্যে ফেনসিডিল ও অস্ত্র আনার সময় সে একাধিকবার বাক্ষ্রনবাড়ীয়া, আখাউড়া, কুমিলা ও সিরাজগঞ্জ এলাকাতে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়। কিন্তু প্রতিবারই সে ছাড়া পেয়ে যেত।
১৯৯৬ সালে সংসদ নির্বাচনের সময় দেলু বেশ কিছুদিন চুপসে যায়। উক্ত নির্বাচনের পূর্বে সে দেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা হতে প্রচুর সংখ্যক উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন অস্ত্র নিয়ে আসে। এদিকে পরিবারের সংসারের খরচের টাকা জোগান দিতে না পারাতে এক সময় দেলু নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। একেক সময় সে একেক স্থানে বসবাস শুরু করে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর দেলু চলে যায় নুরুল আমিন মাকছুদের (ইতোমধ্যে নিহত) অন্যতম ক্যাডার খানপুরের আফজাল বকে। এর আগে সে বেশ কিছুদিন খানপুরের ছাত্রদল নেতা জিল্লুর রহমান ভুলু (নিহত)’র নিয়ন্ত্রনে ছিল। আফজালের নিয়ন্ত্রনে থাকা সময়ে দেলু সদর থানার দক্ষিনা লের খানপুর, ব্যাংক কলোনী, হাজীগঞ্জ, ডনচেম্বার, তলা, পাঠানটুলী এলাকা নিয়ন্ত্রন করতো। সে সময় দেলু তল্লা এলাকার বেশ কয়েকজন বেকার যুবককে নিয়ে গড়ে তোলে বিশাল বাহিনী। আর এই বাহিনীকে নিয়মিত ডাকাতির প্রশিক্ষন দিত দেলু।

তল্লা এলাকার একটি বাড়ীতে বসে দেলু গভীর রাত অবধি তার বাহিনীকে প্রশিক্ষন দিত। মাদক ব্যবসা ছেড়ে অনেকটা বীরদর্পে শুরু করে ডাকাতি কার্যকলাপ। এক পর্যায়ে দেলু তার বাহিনীর নাম দেয় ফাইভষ্টার। উক্ত বাহিনী চালাতে বিশাল টাকার জোগান দেওয়ার জন্য দেলু নিজেই নেতৃত্ব দিয়ে শুরু করে ডাকাতি। ডাকাতি কাজে ব্যবহারের জন্য দেলু তার দলকে ২০/২২টি দেশীয় অস্ত্র বিশেষ করে পাইপগান ও কাটা রাইফেল দিয়ে দেয়। এসব অস্ত্র সে দেশের বিভিন্ন জেলা হতে আনতে গিয়ে বেশ কয়েকজন অস্ত্র তৈরীতে পারদর্শীর সাথে সখ্যতা হয়। তাদের কাছ থেকেই দেলু অস্ত্র তৈরীর কৌশল শিখে নেয়। দিন দিন দেলু নারায়ণগঞ্জের অপরাধ সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রন কর্তা বনে যেতে লাগলে সে জেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের নজরে চলে আসে। তারা নিজেরে আধিপত্য বিস্তার সহ নিজেদের দলকে ভারী করতে দেলুকে নিজেদের দলে নিয়ে নেয়। এক পর্যায়ে তাদের মদদ পেয়ে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে সে। আওয়ামীলীগ সরকারের ক্ষমতার শেষের দিকে দেলু চাষাঢ়া এলাকার বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসীর সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে।

২০০১ সালে জোট সরকার ক্ষমতা লাভের পর দেলুর পরিবার তল্লা ছেড়ে নগর খানপুর মসজিদ সংলগ্ন জনৈক লিটনের বাড়ীতে ভাড়ায় উঠে। এই বাড়ীতে বসেই দেলু বিয়ে করে। কিন্তু এর পরও সে নিয়মিত বাসায় থাকতো না। ডাকাতি কাজের জন্য দেলু জেলার বিভিন্ন এলাকাতে গিয়ে অবস্থান নিয়ে সেসব এলাকাতে গিয়ে বাসা ভাড়া করে থাকতো। বিএনপির সরকার ক্ষমতায় আসার পর তার মদদ দাতা আফজাল এলাকা ত্যাগ করলে দেলু চলে যায় নগর খানপুর এলাকার এক ছাত্রদল নেতার নিয়ন্ত্রনে। এরই মধ্যে সে খানপুর এলাকার আঃ কাদির মিয়ার ছেলে খোকনের সাথে সুম্পর্ক গড়ে তোলে। মাদক ব্যবসার ভাগ ভাটোয়ার নিয়েই দেলু নগর খানপুর এলাকার মামুন ও খানপুর সরদার পাড়াতে দেলু নামে একজনকে খুন করে। ২০০৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে ডিবি পুলিশ বেশ কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র সহ দেলু গ্রেফতার হয়। কিন্তু প্রভাবশালী মহলের বদৌলতে সে ফের ছাড়া পেয়ে যায়। শুরু করে আবারো ডাকাতি। সে জেলার যেখানে যা কাজ করতো তার কোন সময় বিপদ দেখা দিলেই নগর খানপুরের সেই ছাত্রদল নেতা তাকে সর্বাত্নকভাবে সহযোগীতা করতো।

উল্লেখ্য ওই ছাত্রদলের বাড়ীর পাশেই দেলু ভাড়া থাকতো। দেলু একজন ডাকাত দল পরিচালনার পাশাপাশি সে নিজে তার বাহিনী দিয়ে বেশ কয়েকটি হত্যাকান্ডের সাথে জড়িয়ে পড়ে। তার ডাকাত বাহিনী দিয়েই শুরু করে কিলিং মিশনের কাজ। গত ২০/০৬/২০০৫ ইং তারিখে বন্দরের হুমায়ূন বাশার কবীর হত্যাকান্ডের সে ছিল অন্যতম আসামী। সে উক্ত হত্যা মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পর ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি মোতাবেক জবানবন্দীও প্রদান করেছিল।  গত বছরের ১ এপ্রিল পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারও করেছিল।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন ডেরি/৩ মে ২০১৬

Related posts