December 18, 2018

যা যা থাকছে আধুনিক নগরী ঢাকায়

নাগরিক সেবা ও সুযোগ-সুবিধার দিক দিয়ে রাজধানী ঢাকাকে আধুনিক নগরীরূপে গড়ে তুলতে কাজ করছেন ঢাকার দুই নগরপিতা। ঘন জনবসতিপূর্ণ এ নগরীর বর্জ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য সময়োপযোগী কর্ম-পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন তারা। এরই মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার প্রধান সড়কে সোডিয়াম বাতির বদলে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী এলইডি সড়ক বাতি লাগানো, প্রতি ওয়ার্ডে সিসি টিভি ক্যামেরা বসানো, বিলবোর্ডের বদলে ডিজিটাল স্ক্রিন ডিসপ্লে স্থাপন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে সেকেন্ডারি স্টেশন তৈরি, গ্রিন ঢাকার জন্য ফুটওভার ব্রিজে ফুলের গাছ লাগানো, যানজট কমাতে বিভিন্ন পয়েন্টে ইউলুপ তৈরি এবং রিকশা লেন তৈরিসহ আরও ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।

এ ছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল ও উড়াল সেতু তৈরির কাজও চলছে সমানতালে। রাজধানীর কারওয়ানবাজার থেকে শাহবাগের দিকে যাওয়ার পথে রাতের সোডিয়ামের হলদে আলোর বদলে এখন চোখে পড়ে এলইডি বাতির সাদা উজ্বল আলো। সেই আলোতে ঝলমল করে ওঠে চারদিক। এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে লাগানো এলইডি বাতিতে এই পথ দিয়ে চলাচলকারীরা বেশ আনন্দিত। গত ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা সিটি দক্ষিণ করপোরেশনের উদ্যোগে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী এলইডি সড়ক বাতি লাগানো হয়। দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন জানান, পর্যায়ক্রমে রাজধানীর ৩২ হাজার সড়ক বাতির সবগুলোই এলইডি হবে। এরই মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক থেকে বিলবোর্ড সরিয়ে নিয়েছে। এর বদলে নতুন করে লাগানো হবে এলইডি বিলবোর্ড ও পোস্টার।

যানজট নিরসনে টঙ্গী থেকে সাতরাস্তা পর্যন্ত ২২টি ইউলুপ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের সামনের ইউলুপ তৈরির কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। এ ছাড়া নাগরিকদের নিরাপত্তায় প্রতিটি ওয়ার্ডে বসানো হচ্ছে সিসি টিভি ক্যামেরা। গুলশান-বারিধারা এলাকায় ইতিমধ্যে ১০০টি সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। আগামী জুলাইয়ের মধ্যে আরও এক হাজার ক্যামেরা বসানোর কথা। উত্তরে প্রাথমিকভাবে প্রতি ওয়ার্ডের জন্য ১০টি সিসি ক্যামেরা বরাদ্দ করা হয়েছে।

ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক জানান, সিসি ক্যামেরা থাকলে অপরাধী শনাক্ত করতে যেমন সুবিধা হবে, তেমনি এতে প্রতিটি ওয়ার্ডের অপরাধের পরিমাণ কমে যাবে। এ ছাড়া উন্নত বিশ্বের আদলে ঢাকাতেও ডিজিটাল ডিসপ্লের ব্যবহার শুরু হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ঢাকার শাহবাগ মোড়, বাংলামোটর, জিরোপয়েন্ট ও শেরাটন হোটেলের সামনে এই ডিজিটাল বিলবোর্ড বসানো হচ্ছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এতে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের প্রচারণা, ব্যবসায়িক বিজ্ঞাপন, জাতীয় খেলার সরাসরি সম্প্রচার ও বিশেষ দিবসের অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এই কাজে সহায়তা করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। ঢাকাকে বর্জ্য ব্যবস্থার হাত থেকে রেহাই দিতে নগরীতে ৭২টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন তৈরি করা হচ্ছে। এখানে স্প্রে ও ওয়াশ করার ব্যবস্থা থাকবে। এখান থেকে ময়লা ডাম্পিং স্টেশনে যাবে।

রাজধানীর বিশ্বরোড ও আগারগাঁওসহ আরও কয়েকটি এলাকায় এখন এই স্টেশন নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। এতে একদিকে যেমন রাস্তার ওপর ময়লা ফেলা কমবে তেমনি দুর্গন্ধও কমে যাবে। দক্ষিণ ঢাকাতেও ৫৭টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণ হচ্ছে। আর দক্ষিণে প্রতিটি ওয়ার্ডে ২০০টি করে ডাস্টবিন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যানজট থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে রাজধানীতে চলাচলকারী বিভিন্ন বাস কোম্পানির সংখ্যাও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিচ্ছেন উত্তরের মেয়র আনিসুল হক। নতুন বাসগুলো হবে আধুনিক ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। এ ছাড়া গ্রিন ঢাকা গড়ে তুলতে নগরীর ফুট ওভারব্রিজে ও রাস্তার পাশে সিঙ্গাপুরের মতো শহরের প্রবেশপথে ফুলের গাছ লাগানো হবে। ধানমন্ডি ও পান্থপথের ফুট ওভারব্রিজে এরই মধ্যে ফুল গাছ শোভা পাচ্ছে। ঢাকার পার্কগুলোতে সবুজায়নের সঙ্গে প্রজাপতি ও কাঠবিড়ালি পার্ক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

একই সঙ্গে বিমানবন্দর সড়কের সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শুরু হচ্ছে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনে এ বছরের শুরু থেকেই সড়ক হকার মুক্ত করার কাজ করছে। এ ছাড়া প্রয়োজনে ডিএসসিসি ২৪/৭ হটলাইন খোলা এবং ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিমের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে সড়কের পাশে ঝুলে থাকা বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট টিভির ক্যাবলসহ অনান্য তার মাটির নিচে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ডিজিটাল সিগন্যাল মেনে গাড়ি চলাচল শুরু হয়েছে। উন্নত করা হচ্ছে দক্ষিণের ড্রেনেজ ব্যবস্থাকেও।

এদিকে নতুনবাজার ফুটওভারব্রিজ থেকে গুলশান শাহজাদপুরে সুবাস্তু টাওয়ারের দিকে যেতে হাতের বাম পাশের সড়কে প্রায় আট ফুটের মতো জায়গা দড়ি টেনে, প্লাস্টিকের খুঁটি বসিয়ে রিকশার জন্য পৃথক লেন তৈরি করা হয়েছে। এতে এই পথে চলাচলকারী সব যান্ত্রিক গাড়ির চালকরা আগের চেয়ে দ্রুতগতিতে যাত্রী পরিবহন করতে পারছেন। আপাতত পরীক্ষামূলক হলেও এটি সফল হলে সিটি করপোরেশনসহ অন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে আরও ব্যাপ্তি নিয়ে সড়কের উভয় পাশে এক লেন পদ্ধতি চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান ডিএমপির এডিসি ট্রাফিক (উত্তর) হুমায়রা পারভীন।

শিক্ষাবিদ, গবেষক, প্রকৌশলী এবং সাবেক তত্ত্ববধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, ঢাকার আধুনিকায়নে বর্তমানে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে তা সেকেন্ডারি পর্যায়ের। আমি মনে করি, ঢাকার যানবাহন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে হবে। বিশেষ করে ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবস্থা উন্নত করতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের নিয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে কাজ করতে হবে। মেয়ররা যদি রাস্তা থেকে হকার উচ্ছেদ করতে পারেন তাহলে সেটি হবে ঢাকাকে সুন্দর নগরী হিসেবে গড়ে তোলার পথে কার্যকর পদক্ষেপ। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ফার্মগেট এলাকার দখলকৃত জায়গা উচ্ছেদ করতে পারলেই এই এলাকার ৩০ শতাংশ যানজট কমে আসবে।

Related posts