September 23, 2018

যানজট কমান, তেলের দাম নয়!

সিরাজী এম আর মোস্তাক

যানজট বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে সবচেয়ে বড় বাধা। এর তুলনায় তেলের বর্দ্ধিত মূল্য কিছুই নয়। যানজট কমলেই দেশ উন্নত হবে। তখন তেলের বর্ধিত দাম আশির্বাদ স্বরূপ মনে হবে। তাই আগে যানজট কমানো উচিত। তেলের দাম নিয়ে সময় নষ্ট না করাই ভালো। যানজটে কী পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে, তা হিসাবাতীত। এ বিষয়ে কারো কোনো মাথা-ব্যাথা নেই। মাননীয় মন্ত্রী জনাব ওবায়দুল কাদের যানজট কমাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। আর ড. আনু মোহাম্মাদের ‘তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটি’ জ্বালানি তেলের দাম কমাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ফলে সরকার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তেলের দাম কমাতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু আমার পরামর্শ হলো, যানজটের ফলে সৃষ্ট মারাত্মক ক্ষতির দিকে একবার লক্ষ্য করুন এবং তা নিরসনে ব্যবস্থা নিন। অতঃপর তেলের দাম কমানো-বাড়ানো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিন।

বর্তমানে যানজট এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। যানজটের ফলে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা নষ্ট করছে। একটু লক্ষ্য করুন, এক লাখ ব্যক্তি যানজটের ফলে এক ঘন্টা সময় নষ্ট করলে, প্রত্যেকের এক ঘন্টা করে এক লাখ কর্মঘন্টা নষ্ট হয়। অথচ একজন ব্যক্তি তার সম্পুর্ণ চাকুরী জীবনেও এক লাখ ঘন্টা কাজ করেনা। কারণ, একজন ব্যক্তি বিরতিসহ একদিনে আট ঘন্টা কাজ করে। এতে মাসে সর্বোচ্চ ২৪০ ঘন্টা, বছরে ২৮৮০ ঘন্টা এবং ত্রিশ বছরের চাকরি জীবনে মোট ৮৬,৪০০ ঘন্টা কাজ করে। এভাবে প্রতি ঘন্টা যানজটে একাধিক ব্যক্তির পুরো কর্মজীবন নষ্ট হচ্ছে। তাদের সকলের কর্মঘন্টার মূল্যও সমান নয়। কারো কর্মঘন্টা শত শত শ্রমিকের কর্মঘন্টার চেয়েও বেশি মূল্যবান। অর্থাৎ প্রতি ঘন্টা যানজটে দেশের শত শত কোটি টাকা নষ্ট হচ্ছে। যানজট নিরসন ব্যতিত এ ক্ষতি কখনো পূরণ হবেনা।

পরিবহনের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। যে পরিবহন এক ঘন্টায় মাত্র এক লিটার তেলে গন্তব্যস্থলে পৌছায়, যানজটের কারণে তার সময় ও তেল উভয়ই ক্ষতি হয়। ধরুন, একটি লেগুনা চালক প্রতি ঘন্টায় ফার্মগেট থেকে নিউমার্কেটে এক লিটার তেলে তিনবার যাতায়াত করে। তিনবারে ভাড়া পায় নয়শত টাকা। যদি সে এক ঘন্টা যানজটে পড়ে থাকে, তাহলে কি এক ঘন্টায় তিনবার যাতায়াত বা নয়শত টাকা আয় করতে পারবে? বরং যানজটের ফলে আস্তে আস্তে গাড়ি চালাতে গিয়ে এক লিটার তেলও নিঃশেষ হবে। এতে সময়, তেল এবং আয় সবই গেল। যানজটের ফলে এভাবেই অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। তাই যানজট না থেকে যদি তেলের দাম আরো বেশি থাকতো, তাও সহ্য হতো। তাতে অন্তত দেশের কোষাগার সমৃদ্ধ হতো।

এভাবে রেলের অবস্থাও করুণ। তাতে যানজট নেই, আছে সময়ের অব্যবস্থাপনা ও অসাধুদের কারসাজি। উক্ত সময়জট ও কালো বিড়ালদের থাবার ফলে এ খাতে প্রতিবছর বড় অঙ্কের ভর্তুকী দেয়া হয়। ট্রেনগুলো সময়মত চললে, এটি লাভজনক খাতে পরিণত হতো। দেশের সর্বস্তরের মানুষ সুবিধা ভোগ করতো। যাত্রীগণ সময়মতো গাড়ী ধরতে রিক্সা ও অন্যান্য যানবাহন ব্যবহার করতো। ফলে সকল পেশার মানুষ কিছু না কিছু উপকার পেত। এতে সময় ও তেলের সঠিক ব্যবহার হতো। দুর্নীতি কমে যেতো।

সর্বনাশা এ যানজটের খুব বেশি কারণ নেই। তা নিরসন করাও কঠিন নয়। এজন্য প্রয়োজন- সচেতনতা ও আইনের সঠিক প্রয়োগ। ভিআইপিগণ (ঠবৎু ওসঢ়ড়ৎঃধহঃ চবৎংড়হ) যানজট সৃষ্টি করে ঠবৎু ওষষবমধষ চবৎংড়হ হন, তা বন্ধ করা উচিত। অসাধু ঠিকাদারগণ রাস্তা মেরামতের নামে অন্যায়ভাবে ইট, বালু, সিমেন্ট ও রড খায়, তাদের জবাবদিহী করা উচিত। রাস্তাগুলো ঠিকমতো মেরামত করা উচিত। এজন্য তেলের মূল্য কমানোর দরকার নেই। কারণ, বর্তমানে তেলের বর্দ্ধিত মূল্যের ফলেই (বিপিসি) বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের মতো ঘাটতি প্রতিষ্ঠানও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এটি দেশের উন্নয়ন বিশেষ।

অতএব সুস্পষ্ট হয় যে, যানজটের ফলে যে অসামান্য ক্ষতি হচ্ছে, তা তেলের দামের সাথে সম্পর্কিত নয়। যানজট না কমিয়ে তেলের দাম কমালে, দেশ ও দেশবাসী কারো কোনো কল্যাণ হবে না। পরিবহনের ভাড়া আরো বাড়বে,  কমবে না। তাই সরকারের উচিত- আগে যানজট কমানো, তেলের দাম নয়।

লেখকঃ সিরাজী এম আর মোস্তাক
এ্যাডভোকেট, ঢাকা জজ কোর্ট।
(ইহা লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত মত, প্রকাশক বা সম্পাদক দায়ী নহে)
দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন ডেরি/২৩ এপ্রিল ২০১৬

Related posts