November 16, 2018

ময়মনসিংহের ভালুকায় সিজার করাতে এসে প্রসূতির মর্মান্তিক মৃত্যু

bhaluka-pic-05-10-2016
ময়মনসিংহ ব্যুরো  :: ময়মনসিংহের ভালুকা পৌরসদরের তাহমিনা জেনারেল হাসপাতাল এন্ড ডায়গনিস্টিক সেন্টারে সিজার করাতে এসে ডাক্তারের ভুল অপারেশনের কারনে মঙ্গলবার (৪ অক্টোবর) রাতে মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে আছমা আক্তার (২২) নামে অনাসের্র ছাত্রী এক প্রসূতি মায়ের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ক্লিনিকের পরিচালক মোতাহার হোসেনকে আটক করেছে।

জানাযায়, মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার সাতেঙ্গা গ্রামের আলী আকবর মানিকের স্ত্রী আছমা খাতুনের প্রসব ব্যথা দেখা দিলে তাকে তাহমিনা জেনারেল হাসপাতাল এন্ড ডায়গনিস্টিক সেন্টারে তার পরিবারের লোকজন নিয়ে আসেন। ক্লিনিকের মালিক ডা: মোশারফ হোসেন রোগীর স্বজনদের বলেন, জরুরী ভিত্তিতে তাঁর অপারেশন লাগবে। রোগীর অভিভাবকরা অপারেশনের অনুমতি দিলে মঙ্গলবার রাতে ১০টার দিকে আছমার সিজার করা হয়। ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্্েরর মেডিকেল অফিসার ডা: আবু মোহাম্মদ কায়কোবাদ প্রসূতিকে অজ্ঞান করান ও ডাঃ মোশারফ হোসেন অপারেশন করেন। সিজারে আছমা মেয়ে সন্তানের জন্ম দেন।

অপারেশনের পর আছমার রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় মোশারফ হোসেন পরপর দুই বার অপারেশন করে বলে রোগীর আতœীয় স্বজনরা অভিযোগ করেন। পরে ক্লিনিকের লোকজন আছমার আতœীয় স্বজনকে বলেন জরুরী ভিত্তিতে এম্বোলেন্স আনার জন্য। আছমাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাপাতালে নেয়ার পর ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন।  এ ঘটনায় ডা: আবু মোহাম্মদ কাইকুবাদ এর মোবাইল নম্বর বন্ধ থাকায় তাদের সাথে যোগাযোগ করা যায়নি। ক্লিনিকের পরিচালক মোতাহার হোসেন রিপন ও ডাঃ মোশারফ হোসেনের মোবাইলে বারবার কল করলেও ফোন রিসিভ করেন নি। আছমা আক্তার উপজেলার ধীতপুর গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসর প্রাপ্ত সেনা সদস্য আবু তালেব মৃধার মেয়ে। নবজাতক শিশুটি সুস্থ্য আছে। চলতি বছরের জানুয়ারী মাসে আলী আকবর মানিকের সাথে আছমার বিয়ে হয়। আছমা আক্তার গফরগাঁও সরকারী বিশ^বিদ্যালয় কলেজে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। এ ঘটনায় নিহতের পিতা আবু তালেব মৃধা ডাঃ মোশারফ হোসেনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও দুই জনের নামে ভালুকা মডেল থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। ২০০৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত ডা: মোশারফের হাতে অন্তত ১০জন রোগী মারা গেছে। ভালুকা মডেল থানার ওসি (তদন্ত)বলেন, নিহতের পিতার অভিযোগের প্রেক্ষিতে আছমার লাশ তার বাবার বাড়ি থেকে উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ভালুকা মডেল থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ক্লিনিকের পরিচালক মোতাহার হোসেনকে আটক করেছে।

প্রসঙ্গত, ভুল অপারেশনের কারনে এ নিয়ে ক্লিনিকটিতে বেশ কয়েক জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। ২০০৫ সালের ৫ নভেম্বর উপজেলার বাটগাঁও গ্রামের এসএসসি পরীক্ষার্থী দিলরুবাকে এপেডিসাইটিস এর অপারেশন করার সময় ওটিতেই তিনি মারা যান। এ ঘটনায় দিলরুবার, বাবা আব্দুল বাছেন সরকার বাদী হয়ে তাহমিনা জেনারেল হাসপাতাল এন্ড ডায়গনস্টিক সেন্টারের মালিক ডা: মোশারফ, তার স্ত্রী তাসলিমা আক্তার মুক্তা ও তার ভাই মোতাহার হোসেন রিপনকে আসামী করে মামলা করেন মামলানং ১০২/০৮। মামলাটি অদ্যাবধি আদালতের বিচারধীন রয়েছে। ২০১২ সালের ১৮ আগস্ট আপারেশন করতে গিয়ে ওই ডাক্তারের হাতে উপজেলার হবিরবাড়ি ইউনিয়নের বড় কাশর গ্রামের রতন মিয়ার অন্তঃস্বত্ত্বা স্ত্রী শরীফা আক্তার ওরফে পারভীন(২০) এর মৃত্যু হয়। একই বছরের ১৮ জানুয়ারী বর্তা গ্রামের  বাবুল মিয়ার স্ত্রী অন্তঃস্বত্ত্বা সুমা আক্তার(২১) কে ডা: মোশরফ হোসেন সিজার করায় তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।

উপজেলার ভান্ডাব গ্রামের শফিকুল ইসলামের স্ত্রী রেজিয়া খাতুন(৪০) কে গত ২১ জানুয়ারী ২০১৩ইং রাতে তাহমিনা জেনারেল এন্ড ডায়গনিস্টিক সেন্টারে ডা: মোশারফ হোসেন গর্ভপাত ঘটায়। অসম্পুন্ন গর্ভপাতে রক্তক্ষরণের কারনে মারা যান। ভুল অপারেশন করায় ২০১৫ সালে ২৯ অক্টোবর সকালে উপজেলার জামিরদিয়া খন্দকারপাড়া এলাকার নেছার উদ্দিনের স্ত্রী তানজিনা আক্তার (২৪) নামে এক প্রসূতি মায়ের ডা: মোশারফের হাতে মারা যায়। ডা: মোশারফ হোসেনের বিরুদ্ধে এলাকবাসীর হাজারো অভিযোগ, অপকর্মের জন্য তিনি সরকারী চাকরি হারান।

এ ছাড়াও এ ক্লিনিকে অপারেশ করতে এসে এপর্যন্ত বেশ কয়েকজন রোগী মারা গেছে। পরে নিহত রোগীদের অভিবাবকদেরকে ম্যানেজ করে পার পেয়ে যায়। ডা: মোশারফের পরিবার নি¤œবৃত্ত পরিবারের সন্তান হওয়া সত্বেও এ ক্লিনিকটি করে বর্তমানে ঢাকায় উত্তরা বহুতল বিশিষ্ট বাড়ি, ভালুকা সদরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের জমি সহ কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন।

Related posts