November 16, 2018

মোদি কাশ্মীর পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে নিতে বেলুচিস্তান নিয়ে কথা বলছেন!

দিল্লিঃ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কাশ্মীর পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশ্ববাসীর নজর অন্যদিকে নিতেই বেলুচিস্তান নিয়ে কথা বলছেন। তার এধরনের বক্তব্যকে বিতর্কমূলক বলেও মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। তারা আরো বলছেন, কোনো দেশের রাষ্ট্র প্রধান প্রকাশ্যে এমন বক্তব্য দিতে পারেন না। কাশ্মীরে পাকিস্তানের পরোক্ষভাবে প্রভাব থাকলেও তা কখনো প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি দেশটি। এছাড়া কাশ্মীরে ৪০ দিন ধরে কারফিউ ও সেনাসদস্যদের সঙ্গে নির্যাতনে ৭০ জনকে মেরে ফেলা হয়েছে যা প্রায় গণহত্যার শামিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপিকা ড. দিলারা চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এ ধরনের বক্তব্যের ফলে দেশটির আশেপাশে যেসব ছোট ছোট রাষ্ট্র আছে সেখানে বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে যা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রকাশ্যে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটানের মত ছোট রাষ্ট্রগুলো এ বক্তব্যের প্রতিবাদ করবে না তবে মনে মনে নিন্দা জানাবে। ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে এটি নতুন কোনো কৌশল নয়। ভারতের এ ধরনের হস্তক্ষেপ আগে থেকেই করছে কিন্তু প্রকাশ্যে নয়।

অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, ভারত মনে করছে কাশ্মীরে বিশৃঙ্খলার পুরো ঘটনাটি পাকিস্তান ঘটাচ্ছে। এ জন্য ভারতের মনোভাব এমন হয়েছে- পাকিস্তান ঘটাতে পারলে আমরাও বেলুচিস্তানে এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে পারি। প্রকৃতপক্ষে কাশ্মীরে যেসব ঘটনা ঘটছে তা সম্পূর্ণ পাকিস্তান ঘটাচ্ছে তা ঠিক নয়। তবে কাশ্মীরের ঘটনায় পাকিস্তানের কিছুটা ইন্ধন রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ভারত সরকারের নিয়মনীতি অনুযায়ী কাশ্মীরকে স্বায়ত্তশাসন দেয়ার কথা কিন্তু তা দেয়নি। কাশ্মীরে গণভোট দেয়ার জন্য জাতিসংঘ ও ওআইসি প্রস্তাব দিলেও ভারত তা মানছে না। আর কাশ্মীরের বিষয়ে আমরা কোনো মন্তব্য করতে চাই না। এটি পাকিস্তান ও ভারতের বিষয়।

এদিকে নিরপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশিদ এ প্রসঙ্গে বলেন, কাশ্মীরের অস্থিতিশীলতার পেছনে পাকিস্তানের বড় ভূমিকা রয়েছে। সেজন্য কাশ্মীরে ঘন ঘন সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। পাকিস্তানের ভেতরে পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান খাইবার নিয়ে আন্তর্জাতিক বিরোধ রয়েছে। কাশ্মীরের জন্য পাকিস্তান যদি মেধা ব্যয় করে তাহলে বেলুচিস্তানের জন্য ভারতও মেধা ব্যয় করবে। অর্থাৎ এটি হচ্ছে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মত।

তিনি বলেন, কাশ্মীর-বেলুচিস্তানে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে তা পাকিস্তান ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এরপরেও অন্যদেশে পাকিস্তানের কিছু ভূমিকা রয়েছে। যেমন বাংলাদেশে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা রয়েছে। তারা এদেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা চালাচ্ছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যেও পাকিস্তানের বিষয়ে যথেষ্ট ক্ষোভ আছে। সেইদিক থেকে বিবেচনা করলে বেলুচিস্তানের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বাংলাদেশের জনগণ বেলুচিস্তানের দিকেই সমর্থন জানাবে। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানের উপরে চাপ আরো বেশি সৃষ্টি হবে। দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতায় পক্ষে এটি প্রাথমিকভাবে কাজ করবে না। আন্ত-রাষ্ট্রীয় সম্পর্কে কিছুটা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে।

মোদির বেলুচিস্তান নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা ভারতের বিজেপি সরকারের নতুন পররাষ্ট্রনীতির কৌশল হতেই পারে। বেলুচিস্তান স্বাধীন হওয়ার জন্য ভারত যদি সমর্থন করে সেক্ষেত্রে পাকিস্তান-ভারত সম্পর্কে পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব ফেলবে। ভূ-রাজনীতির এটি একটি নতুন কৌশলে মনে করেন আব্দুর রশিদ।

তিনি বলেন, কাশ্মীরে অস্থিতিশীলতার পেছনে পাকিস্তানের হাত রয়েছে এ ব্যাপারে ভারতের কাছে যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ আছে। ভারত শাসিত কাশ্মীরে গণভোটের আয়োজন করলেও সমস্যা সমাধান হবে না। কারণ পাকিস্তান ভারতের মধ্যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে সবসময় কাশ্মীরের ইস্যুটি ব্যবহার করে। তবে দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠলে সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে বলে আশা করেন আব্দুর রশিদ।

কাশ্মীরে সমস্যা সৃষ্টির জন্য পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি সবচেয়ে বেশি দায়ী এমন মন্তব্য করে আব্দুর রশিদ বলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ১৫ আগস্ট যে বক্তব্য দিয়েছেন তা আগ্রাসী মনোভাব প্রকাশ করে না। আগ্রাসী মনোভাব তখনি হয় যখন একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। তবে পাকিস্তানের যে পররাষ্ট্রনীতি তা আফগান নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যথেষ্ট হুমকিদায়ক। কারণ পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি আফগান ও তালেবানদের সমর্থন করে। সেক্ষেত্রে আফগান জনগণ বেলুচিস্তানের জনগণের পক্ষে দাঁড়াবে তা স্বাভাবিক। অন্যদেশের অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপের ব্যাপারে পাকিস্তান পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তন করতে হবে। যা রাজনৈতিক সমাধান খোঁজার পক্ষে কাজ করবে। অর্থাৎ পাকিস্তান, কাশ্মীর ও বেলুচিস্তানে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে আনতে পারে।

তিনি বলেন, বেলুচিস্তানের জনগণ যদি স্বাধীনতা চিন্তার পক্ষে থাকে সেখানে বাংলাদেশসহ অন্যদেশের জনগণ সমর্থন দিতেই পারে। যেমন আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার জন্য অন্য দেশের জনগণ সমর্থন করেছে।

বেলুচিস্তান ইন্সটিটিউটের প্রেসিডেন্ট ও সিইও মালিক সিরাজ আকবর মোদির ওই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে নিশ্চিত হয়েছে বেলুচিস্তানে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রিত গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ এন্ড এনালাইসিস উইংস (র) এর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তারাই বেলুচিস্তানে কলকাঠি নাড়ছেন।

Related posts