November 17, 2018

মৈত্রী এখন চোরাচালানীদের!

বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সরাসরি চলাচলকারী ঢাকা-কলকাতা মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেন

মহসিন মিলন,বেনাপোল প্রতিনিধিঃ   বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সরাসরি চলাচলকারী ঢাকা-কলকাতা মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনটি শুরু থেকেই নানা প্রতিকূলতা কাটিয়ে যখন লাভজনক অবস্থানে পৌঁছেছে ঠিক তখনই একটি অসাধু চক্র  এই ট্রেনটিকে চোরাচালানীদের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে।

কলকাতা-ঢাকাগামী ট্রেনের প্রায় প্রতি ট্রিপেই ভারত থেকে অবৈধভাবে কাপড়, তৈরি পোশাক, জুতা-স্যান্ডেল, ইমিটেশনের গহনাসহ নানা ধরনের জিনিসপত্র আসছে। কথিত লাগেজ পার্টি চক্রের সদস্যরা একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহার করে কাষ্টমস্ ও ইমিগ্রেশনের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে অবৈধভাবে এসব মালামাল নিয়ে আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ভারত থেকে চোরাইপথে এসব মালামাল আসায় আমদানি রফতানি বানিজ্য কমে গিয়ে সরকার হারচ্ছে কেটি কোটি টাকার রাজস্ব। অন্যদিকে দেশী শিল্প ক্রমান্বয়ে হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।

“দুই বাংলার বুকে মৈত্রী থাক সুখে” এই স্লোগানকে সামনে রেখে ইংরেজি ২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল বাংলা ১৪১৫ সালের ১লা বৈশাখ থেকে ভারত বাংলাদেশের মধ্যে চালু হয় একমাত্র যাত্রীবাহী ট্রেন “মৈত্রী এক্সপ্রেস”। বাংলাদেশ-ভারতের বন্ধুত্ব দৃঢ করতে উভয় দেশের মধ্যে রেলপথে সপ্তাহে ২দিন ঢাকা-কলকাতা ও কলকাতা-ঢাকা মৈত্রী এক্সপ্রেস নামে একজোড়া ট্রেন চলাচল শুরু হয়।

চলাচলের শুরু থেকেই এ ট্রেনটিতে উভয় দেশের যাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়ে। পরবর্তীতে গত্নব্যে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময়, বেশি খরচ ইত্যাদি অজুহাতে যাত্রী সংখ্যা কমতে থাকে। একসময় যাত্রীর সংখ্যা এত নিচে নেমে আসে যার কারনে উভয় দেশের রেলের লোকসানের পাল্লা ভারী হতে শুরু করে। এরপর উভয় দেশের রেলের লোকসান কমাতে যাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি করতে নেওয়া হয় নানামুখী পদক্ষেপ।

উভয় দেশের কাষ্টমস্ এর চেকিংয়ের সময় কমানোসহ নানা সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়। ফলে এ ট্রেনের যাত্রী সংখ্যা আবারও বাড়তে থাকে। নানা প্রতিকুলতা কাটিয়ে যখন ট্রেনটি লাভজনক অবস্থানে পৌঁছাতে শুরু করেছে ঠিক সেই সময় দর্শনা আত্নর্জাতিক রেলওয়ে ষ্টেশনে অবস্থিত কাষ্টমস্ ও ইমিগ্রেশনের একটি অসাধু চক্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে শুরু হয় নানা অনিয়ম। এক সময় যাত্রীর অভাবে ট্রেনের  বেশিরভাগ আসন খালি থাকলেও বর্তমানের চিত্র সম্পুর্ন তার উল্টো। প্রতিটি ট্রিপেই আসনগুলো থাকে পুর্ণ। টিকেট পেতে অনেক সময় লাগে। অভিযোগ আছে, কলকাতা থেকে ঢাকা পর্যন্ত শুধুমাত্র ভারত ও বাংলাদেশের কাষ্টমস ও ইমিগ্রেশন ছাড়া যাত্রাপথে আর কোন ঝক্কি-ঝামেলা না থাকায় চোরাচালানীরা তাদের ব্যাবসার সুবিধার্থে বেছে নিয়েছে এ রুট।

বিভিন্ন সময়ে বিজিবি পুলিশ চোরাচালানীদের মালামাল আটক করাতে বেবিয়ে এসেছে এসব তথ্য। যেখানে ভারত-বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা পর্যটনসহ নানা কাজে এ রুট দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যাতায়াত করে থাকে। সেক্ষেত্রে ভারত থেকে মৈত্রী ট্রেনে বাংলাদেশের দর্শনা  আত্নর্জাতিক রেলওয়ে ষ্টেশনে অবস্থিত কাষ্টমস্ ও ইমিগ্রেশন নামক ছাঁকনি পার হবার পরও বিভিন্ন সময়ে যাত্রাপথের নানাস্থানে পুলিশ বিজিবির চোরাচালানবিরোধী অভিযান রীতিমত প্রশ্নবিদ্ধ। এদিকে মৈত্রী ট্রেনের শুরু থেকেই পদ্মার দক্ষিণ পাড়ের চুয়াডাঙ্গা সহ ৭/৮টি জেলার মানুষের ঢাকা-কলকাতা মৈত্রী ট্রেনে ভ্রমণের জন্য যাত্রাপথে ভারতের প্রবেশমুখ দর্শনা ও ঈশ্বরদী ষ্টেশন থেকে যাত্রীর আসন বরাদ্দের দাবী জানিয়ে আসলেও অজ্ঞাত কারণে তা আজ পর্যন্ত তা পূরণ হয়নি। এ বিষয়েও বিরূপ মন্তব্য অনেকের। তারা বলেন, হয়তবা চোরাচালানীর বিষয়টি চাপা রাখতেই এ স্থানগুলোতে আসন বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে না।

ভারত বাংলাদেশ উভয় দেশের অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী, নেতৃস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গসহ অনেক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা এ ট্রেনে ভ্রমণ করলেও বিভিন্ন সময়ে যাত্রাপথে এ ট্রেনে বিজিবির চোরাচালান বিরোধী অভিযান সম্পর্কে কেউ মুখ খোলেন না। যেখানে কতিপয় যাত্রীবেশী চোরাচালানীর কারনে দুর্ভোগ পোহাতে হয় ট্রেনের সকল যাত্রীর। প্রসঙ্গতঃ ২০১০ সালের ১১আগষ্ট কলকাতা থেকে ছেড়ে আসা মৈত্রী এক্সপ্রেসটি রাজধানীর ঢাকার বনানী ষ্টেশনে পৌঁছালে র‌্যাব-১ এর সদস্যরা ষ্টেশনে অভিযান চালিয়ে ভারত হতে অবৈধভাবে আনা প্রায় কোটি টাকা মূল্যের ভারতীয় শাড়ী, থ্রিপিস ও ছোটদের পোশাকসহ ৯টি মাইক্রোবাস, ১টি ট্যাক্সিক্যাবসহ ১৫জনকে আটক করে।

১২ জুলাই দর্শনা আত্নর্জাতিক রেলষ্টেশনে কাষ্টমস্ কর্মকর্তারা কলকাতা থেকে ছেড়ে আসা মৈত্রী এক্সপ্রেসে যাত্রীদের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ ভারতীয় শাড়ি, থ্রী-পিস, পাঞ্জাবি, কসমেটিকস ও সিটিগোল্ডের গহনা জব্দ করে। ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল কলকাতা থেকে ঢাকাগামী মৈত্রী ট্রেনটি ঈশ্বরদী স্টেশনে পৌঁছালে একদল বিজিবি ট্রেনটি থামিয়ে ট্রেনের বিভিন্ন কামরায় প্রায় আধা ঘন্টাব্যাপী যাত্রীদের ব্যাগ ও মালামাল তল্লাশী করে ভারত হতে অবৈধভাবে আনা বিপুল পরিমান ভারতীয় মালামাল নামিয়ে নেয়। এসময় ট্রেনের যাত্রী ও ষ্টেশনে অবস্থানরত লোকজনের সাথে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে বিজিবি সদস্যরা ৩রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে ষ্টেশন ত্যাগ করে।

একই বছরের ১১জুলাই কলকাতা থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী মৈত্রী এক্সপ্রেসটি দর্শনা আšতর্জাতিক রেলওয়ে ষ্টেশনে পৌঁছালে বিজিবি’র নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট, ইমিগ্রেশন ও শুল্ক বিভাগ, ষ্টেশনমাষ্টার ও রেলওয়ে পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ টাস্কফোর্স মৈত্রী এক্সপ্রেসে অভিযান চালিয়ে ৫লক্ষ টাকার ভারতীয় শাড়ী ও কোরিয়ান সিগারেট আটক করে। এছাড়াও অতিরিক্ত মালামাল আনার কারনে যাত্রীদের কাছ থেকে শুল্ক বাবদ ৭৪হাজার টাকা রাজস্ব আদায় করে।

সর্বশেষ ২জানুয়ারি ২০১৬ শনিবার বেলা ১২টার দিকে দর্শনা আত্জার্তিক রেলস্টেশনে বেনাপোল শুল্ক ও গোয়েন্দা বিভাগ’র ডেপুটি কমিশনার এইচ এম শরিফুল হাসান এর নেতুত্বে  অভিযান চালিয়ে কলকাতা থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী মৈত্রী ট্রেনে তললাশী করে ট্রেনের ৩৭ জন পাসপোর্টধারী যাত্রীর কাছ থেকে নিয়ম বর্হিভূতভাবে ভারত থেকে আনা ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা মূল্যের এক হাজার ২০টি শাড়ি, ৬৮০টি থ্রিপিস, ৫৫৯টি শাল, ১২৫টি পাঞ্জাবি, ২৭০টি ওড়না, ৮৬টি লেহেঙ্গা, ২০ কেজি ইমিটেশনের গহনা, ১০ কেজি কসমেটিকস, ১৮০টি চশমা, মদ ও সিগারেটসহ বিভিন্ন ধরণের মালামাল জব্দ করে।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts