December 14, 2018

‘মেয়েরে হারাইছি এখন জামাইরেও হারানোর পথে,আমি ভালো থাকি কি করে?’

ঢাকাঃ  স্ত্রী হত্যার ঘটনায় পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও স্বীকারোক্তি নিয়ে এখন দেশজুড়ে আলোচনা। সবার প্রশ্ন প্রকৃত সত্য কি? পুলিশের দেয়া তথ্য মতে, কে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা? পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা কেউ খোলাসা করে কিছু বলছেন না। এ অবস্থায় বাবুল আক্তারের শ্বশুর সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোশারফ হোসেন বলেছেন, ‘আমি ১০০ পারসেন্ট নিশ্চিত, বাবুলের দ্বারা এ কাজ হয় নাই।’ পরিবারের কোনো সদস্যই বিশ্বাস করতে চান না বাবুল আক্তার তার নিজের স্ত্রী হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। তাদের অভিযোগ, স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সবাই এখন বাবুল আক্তারের পেছনে লেগেছে। এর নেপথ্যে ‘প্রফেশনাল জেলাসি’ বা অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে বলে মনে করছেন তারা। বাবুল আক্তারের শ্বশুর বলেন, এখন অবাঞ্চিত কথা নিয়ে বেশি ঠেলাঠেলি হচ্ছে। সে তো মাইনাসের লোক না। র‌্যাঙ্কে ছোট থাক, বড় থাক, তার ডিমান্ড ছিল। সবাই তাকে আদর-স্নেহ করতো। সবাই তারে নিজের ডিপার্টমেন্টে নিতে চাইতো। আইজিপিকে রিকোয়েস্ট করতো বাবুলকে আমাদের দেন। সেই প্রিয় লোকটা হঠাৎ করে সবার অপ্রিয় হয়ে গেল।

গতকাল বিকালে খিলগাঁওয়ের ভুইয়া পাড়ায় বাবুল আক্তারের শ্বশুরবাড়িতে বসে কথা হয় মোশারফ হোসেনের সঙ্গে। পুলিশের ওসি হিসেবে অবসরে যাওয়া মোশারফ হোসেনের চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ। বলেন, ‘মেয়েরে হারাইছি। এখন জামাইরেও হারানোর পথে। আমি ভালো থাকি কি করে?’ ‘বাবুলকে নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে সেই ধরনের খুন যদি হয়, আমি কি সাক্ষী রাইখা মারবো? আমার সোর্স দিয়া আমি মারবো? আমার বাসার সামনে আমার ছেলের সামনে আমি তারে মারাবো? এরকম কোনো তথ্য এই সাব-কন্টিনেন্টে আছে? এটা হয়তো সিনেমা-নাটকে আছে।’ ‘বাবুল আক্তারের সঙ্গে যদি তার স্ত্রীর ভালো সম্পর্ক না থাকতো তাহলে এই ১১ বছরে সে এইসব পজেটিভ কাজগুলো করতে পারতো?’ ‘একজন রিকশাওয়ালাও যদি রাতে তার বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে পরদিন সে কি ভালো করে রিকশা চালাতে পারবে? তাহলে এই যে বাবুর সার্ভিসের ১১ বছরের যে সাফল্য, এটা ঘরে বিবাদ থাকলে কোনোভাবেই হইতো না।’ তিনি বলেন, ‘বিয়ে হয়েছে ১৪ বছর পার হচ্ছে। এই ১৪ বছরে আমরা কখনও তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো ঝগড়া-বিবাদ বা খারাপ কোনো সম্পর্কের কথা শুনি নাই।’ ‘বাবুল যখন শিক্ষানবিশ। তখন সে সিক্স মার্ডারের একটা ঘটনা তদন্ত কইরা বাইর করছে। আর সেই লোক তার বউরে মারবে সোর্স দিয়া, টাকা দিয়া, মারার কৌশল আর তার মাথায় নাই। মারলোই ধরেন, তাইলে এই কৌশল সে নেবে? এইটা বিশ্বাসযোগ্য?’

এ সময় বাবুলের শাশুড়ি বলেন, ‘বাবুর (বাবুল আক্তার) বয়স যখন ১১ বছর তখন থেকেই তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক। ওদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কখনও কোনো দাম্পত্য কলহের কথা শুনি নাই। এই রকম কিছু বলে নাই। আমি মা, কিছু হইলে তো আমারে বলতো।’ স্ত্রীর কথাটা টেনে নিলেন মোশারফ হোসেন। বললেন, ‘বাবুল যখন ঢাকায় জয়েন করতে আসছে তখন মেয়ে তার মায়েরে ফোন কইরা বলছে এই একমাস তারে ভালোমন্দ খাওয়াবা। তাইলে খারাপ সম্পর্ক হয় কেমনে?’

দোতালার ঘরে অবস্থান করছেন বাবুল আক্তার। গত শুক্রবার রাতে তাকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে টানা ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরদিন বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে বাসায় ফেরেন তিনি। এই ১৫ ঘণ্টা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি তিনি। যদিও বাবুল আক্তার নিজেও বলেছেন, তার সঙ্গে মামলার অগ্রগতি নিয়ে কথা হয়েছে। তবে খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঘটনার পারিপার্শ্বিকতাও তাই বলে। ডিবি কার্যালয় থেকে বাসায় ফেরার পর ঘরের ভেতরেই সময় কাটছে তার।

মোশারফ হোসেন বলেন, ‘তদন্ত ঠিক আছে কিনা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে পারবো না। তদন্তের দায়িত্ব যাদের দেয়া হইছে তারা কি করতেছে এইটা হলো মূল ব্যাপার। তদন্ত কর্মকর্তা বা তদন্ত তদারক কর্মকর্তা যদি স্বচ্ছ হয় তাহলে ঠিক আছে, আর তারা যদি ঠিক না হয় তাহলে তো অন্যকরম কিছু হবেই।’ তিনি বলেন, ‘তদন্ত সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা কেউ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নাই। কোনো কথা হয় নাই। কুশলাদি বা তথ্য সংগ্রহ কিছুই হয় নাই। বরং বাবুল আক্তার গোয়েন্দা কার্যালয় থেকে ফেরার পর নিরাপত্তার জন্য থাকা পুলিশও উইথড্র করে নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘যদি মনে করেন যাদের ধরছে তা সত্য হয় তাহলে তো ভালো। যদি ১০০ ভাগের জায়গায় ২০ ভাগও সত্য হয় তবুও পজেটিভ সাইন। এদের ধইরা বাকি ৮০ ভাগ সত্য উদ্ঘাটন করতে পারবো। মূল প্রশ্ন হলো হত্যার মোটিভটা কি? সে (মিতু) তো কারো আগে-পিছে ছিল না। তারে মারবো কেনো? এইটা বাইর করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘তদন্ত সংশ্লিষ্ট এই পুলিশ অফিসারেরা আমারে কোনো সহানুভূতিও দেখায় নাই। আমার বাসায়ও আসে নাই। তদন্তে যারা সংশ্লিষ্ট তারা আমার মেয়ের মৃত্যুর পর একজনও সহানুভূতি দেখায় নাই।’

চট্টগ্রামে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। তারা বাবুল আক্তারের সোর্স বলে খবরও বেরিয়েছে। প্রসঙ্গটি তুলে ধরে মোশারফ হোসেনের কাছে জানতে হওয়া হয় তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কি-না। মোশারফ হোসেন বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃতরা বাবুল আক্তারের সোর্স কিনা আমরা জানি না। বাবুলও আমাদের কিছু বলে নাই। অনেক পত্রিকায় আসছে যাদের মুখোমুখি করা হয়েছে তাদের সঙ্গে কিন্তু আসলে মুখোমুখি হয় নাই। এটা ভোগাস।’

মোশারফ হোসেন বলেন, আমরা আমাদের মেয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাবো। আমরা অ্যাপয়েনমেন্ট নেয়ার চেষ্টা করছি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলবো, যেন প্রকৃত সত্যটা বের করা হয়। কোনো নিরপরাধ লোককে যেন ফাঁসানো না হয়।মানব জমিন

Related posts