November 15, 2018

মূল্যায়িত হবে কি রাজপথে মার খাওয়া বিএনপি নেতারা?

জুম হোসেনঃ গত ১৯ মার্চ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে কাউন্সিলরা খালেদা জিয়াকে বিএনপির কমিটি গঠনের সর্বময় ক্ষমতা দিয়েছেন। ইতোমধ্যে মহাসচিব, যুগ্মমহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক পদে ১৮ জনকে মনোনয়ন দিয়েছেন দল প্রধান খালেদা জিয়া। এ ১৮ জনের মধ্যে না থাকলেও মূল্যায়নের জন্য খালেদা জিয়ার দিকে চেয়ে আছেন দলের আন্দোলন, সংগ্রামে থাকা নেতারা। ঘোষিত ১৮টি পদে নিজেদের নাম না দেখে তাদের কেউ কেউ আবার হতাশও হয়েছেন।

দলের জন্য রাজপথে থাকা নেতাদের মধ্যে বর্তমানে কারাগারে থাকা বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী। ২০১০ সালের ২৭ জুন বিএনপির ডাকা হরতালে শাহবাগ মোড়ে মিছিল করতে গিয়ে সবার সামনেই পুলিশ ও ছাত্রলীগের বেধড়ক পিটুনি খেয়েছেন। আন্দোলন-সংগ্রামেও থেকেছেন রাজপথে।

শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী দলের সাংগঠনিক সম্পাদক পদ প্রত্যাশী ছিলেন বলে জানিয়েছেন তার ঘনিষ্ঠজনরা। তবে ইতোমধ্যে ঘোষিত হওয়া এ পদে খালেদা জিয়ার মনোনয়ন না পেয়ে অনেকটা হতাশ হয়েছেন এ্যানী এবং তার অনুসারীরা। তবে সাংগঠনিক পদে জায়গা না হলেও দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে এ্যানীকে দেখতে চান তার অনুসারীরা।

দলের আরেক ত্যাগী নেতা হলেন সাবেক বিরোধী দলের চিফ হুইপ ও বিএনপির প্রচার সম্পাদক জয়নুল আবদিন ফারুক। মহাজোট সরকারের আমলে হরতালে পিকেটিং করতে গিয়ে সব চেয়ে বড় নির্যাতনের শিকার হন তৎকালীন বিরোধী দলের চিফ হুইপ বিএনপির প্রচার সম্পাদক জয়নুল আবদিন ফারুক। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে ২০১১ সালের ৬ জুলাই চার দলীয় জোটের ডাকা হরতালে সহকর্মীদের নিয়ে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে পিকেটিং করতে গেলে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন তিনি। (!) ওই সময় অনেককেই বলতে শোনা গেছে, ভবিষ্যতে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাবেন জয়নুল আবদিন ফারুক। জাতীয় কাউন্সিল হলে তার জন্য বড় পদ অবধারিত! কিন্তু এখন পর্যন্ত ঘোষিত ১৮টি পদে কোনোটিতে ঠাঁই হয়নি দলের জন্য রাজপথে রক্তঝরানো এই নেতার। অবশ্য এ নিয়ে কোনো খেদ নেই জয়নুল আবদিন ফারুকের। রোববার (১০ এপ্রিল) তিনি বলেন, ‘ম্যাডামের ওপর আমাদের আস্থা শতভাগ। যোগ্য ও সক্রিয় লোকদের তিনি মূল্যায়ন করবেন- এ বিশ্বাস আমাদের আছে। তাছাড়া পদের জন্য তো রাজনীতি করি না। রাজনীতি করি মানুষের জন্য, দলের জন্য। দলে কোনো পদ না থাকলেও বিএনপির জন্য কাজ করে যাবো’।

এদিকে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে চার দলীয় জোট ঘোষিত হরতাল-অবরোধের সময় নয়াপল্টন কার্যালয় ও এর আশাপাশে হাতে গোনা যে ক’জন নেতাকে দেখা যেতো, তাদের মধ্যে ছিলেন সাবেক ছাত্রনেতা বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নাজিম উদ্দিন আলম। আন্দোলন সংগ্রামের প্রথম দিকে তরুণ এই নেতা নয়াপল্টন সড়কে রায়টকার ও জলকামানের সামনে বুক পেতে দিয়ে বলেছেন, ‘চালাও গুলি। নব্বইয়ে স্বৈরাচারী সরকারের গুলি খেয়েছি, মরি নাই। এখন গুলি করে মেরে ফেলো!’ ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে চার দলীয় জোটের ডাকা হরতালে গাবতলীতে পিকেটিং করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন নাজিম উদ্দিন আলম। দীর্ঘদিন তাকে দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে হয়। ওই ঘটনার পর বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে তাকে নিয়োগ দেন খালেদা জিয়া। (!)

সূত্রমতে, এবারের কাউন্সিলে বিএনপির এই তরুণ নেতা দলের যুগ্ম মহাসচিব পদ আশা করেছিলেন। এরই মধ্যে ৭ যুগ্ম মহাসচিবের নাম ঘোষণা হয়েছে, যেখানে তার নাম নেই। তারপরও আশা ছাড়েননি তিনি, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখায় দল তাকে মূল্যায়ন করবে, আর দল প্রধান অবশ্যই যোগ্য নেতাদেরকে যোগ্যস্থানে বসাবেন এমনটিই তার বিশ্বাস। দলে কোনো পদ না থাকলেও বিএনপির জন্য কাজ করে যাবেন তিনি।

দলের জন্য এ ত্যাগী নেতা ভোলা-৩ (লালমোহন-তজুমদ্দিন) আসনের উপ-নির্বাচনে দলের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এর নির্বাচন পরিচালনা পর্ষদের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হাতে নির্যাতিত হন। এ নির্যাতনের ফলে প্রায় তিন মাস ধরে চিকিৎসা নিতে হয়েছে তাকে।

তার অনুসারীরা বলছেন, কাউন্সিলের পর দলের যুগ্মমহাসচিব প্রত্যাশী ছিলেন নাজিম উদ্দিন আলম। তবে ঘোষিত হওয়া যুগ্মমহাসচিব পদে ঠাই না হলেও হতাশ নন তিনি। তার বিশ্বাস, খালেদা জিয়া অবশ্যই তাকে মূল্যায়ন করবেন।

বিএনপির ৫ নারী সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হীরা, নীলোফার চৌধুরী মনি, এ্যাড. সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়া, রেহেনা আক্তার রানু ও শাম্মি আক্তার রাজপথে ছিলেন সক্রিয়।

এছাড়া মহিলা দলের সভাপতি নূরে আরা সাফা, সাধারণ সম্পাদিকা শিরিন সুলতানা, ও নারী নেত্রী হেলেনা জেরিন, ঢাকা মহানগর মহিলা দলের সভানেত্রী সুলতানা আহমেদ, ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী আবুল বাশার, চট্টগ্রামের গোলাম আকবর খন্দকার, বগুড়ার ভিপি সাইফুল, জয়পুরহাটের মজহার হোসেনের মতো নেতারাও মূল্যায়নের জন্য তাকিয়ে আছেন দল প্রধান খালেদা জিয়ার দিকে।

গত ৫ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে দলে মূল্যায়নের দাবিকে যৌক্তিক করে তুলেছেন বর্তমান কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান, সেলিমা রহমান, অর্থনীতি বিষয়ক সম্পাদক আবদুস সালাম, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সহ তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবিব।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সক্রিয় ও ত্যাগি নেতারাই পদ পাবেন। তবে পদের চেয়ে নেতার সংখ্যা বেশি হওয়ায় সবার প্রত্যাশা হয়তো পূরণ হবে না। আমরা বিশ্বাস করি, কাঙ্ক্ষিত পদ না পেলেও দলকে যারা ভালোবাসেন, দলের জন্য তারা কাজ করে যাবেন’।

Related posts